প্রধান মেনু

অযত্নে এক শহীদের সমাধি–আমিরুল ইসলাম রাঙা

আটঘরিয়া উপজেলার বেরুয়ান গ্রামের দক্ষিনে এক জনাকীর্ণ স্থানের এই কবরটি দেখলে কেউ বলতে পারবেনা কবরটি কার? কি তার পরিচয়? দেখলে যেকোন মানুষ ভাববে এটি একটি সাধারন কবর। কোথায় চিহৃ বা উল্লেখ নাই কবরে শায়িত এই মানুষটি কে? বছরে নিদিষ্ট দুটি দিবসে এই কবরে দুই একজন আসে শ্রদ্ধা জানাতে। কোন সময় তাও আসেনা। চারদিকে জঙ্গল এবং অাগাছায় পুর্ণ। সেখানে যাবার মত কোন রাস্তা নাই। এমন একটি স্থানে বড় অযত্ন-অবহেলা-অনাদরে শায়িত আছেন এদেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এক বীর যোদ্ধা।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের মধ্যে কয়েক হাজার শহীদ আছেন যারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এই কয়েক হাজার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে কয়েক শত আছে যারা ছিলেন অসীম সাহসী শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধা। যারা দেশের জন্য বীরের মত জীবন দান করেছেন। এই কবরে তেমনি একজন অসীম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা অযত্নে – অবহেলায় অবহেলিত অবস্থায় যুগ যুগ ধরে শায়িত আছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলায় মাত্র ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তারমধ্যে একজনের বাড়ী এই জেলার বাইরে। আর একজন জেলার বাইরে চাঁপাই নবাবগঞ্জের রোহনপুরে শহীদ হন। বাঁকী চারজন যোদ্ধা এই উপজেলায় সংঘটিত দুইটি যুদ্ধে শহীদ হন।
এই কবরে শায়িত আছেন সেই চারজন শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধার একজন। তিনি হলেন আটঘরিয়া উপজেলার বেরুয়ান গ্রামের সুর্যসন্তান শহীদ আবুল কাশেম। তিনি ছিলেন চার সন্তানের জনক। দলের মধ্য বয়স্ক মুক্তিযোদ্ধা। এমন বয়সের যোদ্ধা শতজনে একজন ছিলেন না। শুধু তাই নয় এমন সাহসী যোদ্ধা ছিল শতজনে একজন।

৭১ এর ৬ ই নভেম্বর জেলার মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধ হয় আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের বংশিপাড়া নামক স্থানে। সেইযুদ্ধে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। শহীদ আবুল কাশেম তাঁদের মধ্য একজন। মাত্র ৫০ গজ দুরত্বে পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে সম্মুখ সমরে প্রায় দুই ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধ হয়েছিল। সেই ভয়াবহ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর দলপতি ক্যাপ্টেন তাহের সহ প্রায় ২০ জন সৈন্য হতাহত হন।কালের সাক্ষী বলে – সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং অংশগ্রহনকারী সকল মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁদের বীরত্বের জন্য রাষ্ট্রীয় পদকে ভুষিত করা উচিত ছিল।দুর্ভাগ্য এই জাতির। যাদের আত্মত্যাগে স্বাধীনতা পেলাম তাঁদের অবদানকে আমরা মুল্যায়ন করতে পারলাম না।

আজ শহীদদের অবদান যেমন একাকার ঠিক তেমনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মান ও একাকার করে ফেলা হয়েছে। শহীদদের প্রাপ্য মর্যাদা যেমন সঠিকভাবে করা হয়নি তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সন্মানটুকু যথাযথ ভাবে দেওয়া হয়নি। শহীদ আর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এক হতে পারেনা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান হবে সকল শহীদের উর্ধে। তাঁদের পরিবারকে অধিকগুন সন্মানী দেওয়া প্রয়োজন। সেইসাথে সকল শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নূন্যতম বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা দরকার। তেমনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির প্রশ্নে ভিন্নতা থাকা প্রয়োজন ছিল। ভারতীয় ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা একই কাতারে থাকতে পারেনা। উচিৎ ছিল, ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এ গ্রেড ভূক্ত করে দিগুন ভাতা সহ বেশী সুযোগ সুবিধা প্রদান করা। অথচ পরিতাপের বিষয় যে মুক্তিযোদ্ধা নিজের জীবনকে বাজী রেখে ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে নয়মাস যুদ্ধ করে যে সন্মানের অধিকারী এবং যিনি স্থানীয়ভাবে অংশ নিয়ে যুদ্ধ করে বা না করেই একই সন্মানের অধিকারী হয়েছেন ।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বলতে গেলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। কি তামাসা চলছে এ যাবতকাল। স্বাধীনতার এত বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার তামাশা চলছে। এ কাজ যেন শেষ হবার নয়। মুক্তিযোদ্ধা বেড়েই চলছে। কমানোর কোন লক্ষণ নাই। অথচ জাতীর দাবী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করা নয় তাদের সংখ্যাকে ছাটাই করা হোক। সকল ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ দেওয়া হোক। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হোক। আমাদের মনে করা উচিৎ একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার অপরাধ একজন রাজাকারের অপরাধ থেকে কোন অংশেই কম নয়। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের উচিৎ একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যাবার পর গার্ড অব অনার দেবার চেয়ে তাঁর জীবতদশায় বেশী দরকার অনার করার । সরকারের উচিৎ অতি দ্রুত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চুড়ান্ত করা। তাঁদের ভাতা বৃদ্ধি সহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করা। ভূমিহীন এবং গৃহহীনদের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল স্থাপন সহ তাঁদের পরিবারকে অধিক সুবিধা প্রদান করার ব্যবস্থা করা।

অনাগত ভবিষ্যত বলছে–এই বীরেরা একদিন তাঁর ন্যায্য সন্মান মর্যাদা অর্জন করবেই। তবে তাঁদের কাছে পাবেন – যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি এবং তার সাথে কোন সম্পর্ক নাই –তারাই দিবেন এই বীরদের সন্মান ? আমার বিশ্বাস এই লেখার সাথে সংযুক্ত ছবি একদিন কালো ছবি হবে এবং সেদিন এই বীরের সমাধি রঙ্গীন আলোকসজ্জায় ঝলমল সমাধিতে রুপ নিবে ! ! ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত এই বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ হবে। মেহনতি জনতার জয় হবে। শহীদ স্মৃতি অমর হবে। জয় বাংলা – জয় বঙ্গবন্ধু।