প্রধান মেনু

আটঘরিয়ার কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী

১৯৭১ সাল। আটঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ থেকে ৭ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী। সবার কাছে মুহাম্মদ নামে পরিচিত। বয়স তেরো বছর অতিক্রম করলেও চৌদ্দ বছর পূর্ণ হয়নি। এমন সময় দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চ কালোরাত থেকে শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাকান্ড। নিরীহ বাঙালীকে হত্যা করছে পাকিস্তানীরা। মানুষ হত্যা, মা-বোনের সম্ভ্রমহানি আর সাধারণ মানুষের বাড়ীঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় কিশোর মুহাম্মদ আলীর মনে শুরু হয় দ্রোহ। বিক্ষুব্ধ মনে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে। গোপনীয়তা রক্ষা করে তার কয়েকজন সহপাঠী এবং বন্ধুর সাথে পরামর্শ করেন । কয়েকজন এমন সিদ্ধান্তে সাড়া দেন। বাবা-মার একমাত্র পুত্র সন্তান মুহাম্মদ আলী তার বাবাকে বলে সে ভারতে যেতে চায়। দেশে থাকলে পাকিস্তানী সৈন্যরা মেরে ফেলতে পারে বরং পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিলে জীবনটা রক্ষা পাবে। তার এমন কথায় বাবা-মা সম্মত হয়।

এরপর শুরু হয় কিশোর মুহাম্মদ আলীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার গল্প। আটঘরিয়ার মানুষ মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলীকে চেনেন। তবে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার গল্প খুব কম মানুষই জানেন। কেমন করে কিশোর মুহাম্মদ আলী ভারতে গেলেন, কেমন করে মুক্তিযোদ্ধা হলেন, কোথায় কোথায় যুদ্ধ করলেন – সে সব কথা জানলে পাঠক নিশ্চিত শিহরিত হবেন। তাঁকে নিয়ে বলা এই সব গল্পের মধ্যে আছে চমকপ্রদ ইতিহাস।

মে মাসের শেষে কোন একদিন কিশোর মুহাম্মদ আলী ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে বের হলেন। সাথে তার সহপাঠী বাল্যবন্ধু আটঘরিয়া পৌরসভার উত্তর চক গ্রামের কালাম এবং বরুলিয়া গ্রামের খোয়াজ উদ্দিন। দলের আরেক সদস্য পাবনা সদর উপজেলার গাঁতি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস। সবার মধ্যে কুদ্দুস হলো অন্য ৩ জনের মধ্যে বড়। সে আটঘরিয়ার দেবোত্তরে লজিং থেকে পড়াশুনা করতো। তখন সে নবম শ্রেণীতে পড়তো। সবার কাছে যথাসামান্য টাকা পয়সা থাকলেও মুহাম্মদ আলী নিয়েছিলেন মায়ের ব্যবহৃত অল্প পরিমাণ সোনা এবং রুপার অলংকার। সাথে টাকা পয়সা যতটুকু ছিল তার থেকে বেশী ছিল মনোবল। অদম্য মনোবল নিয়ে ৪ জন রওয়ানা দিয়ে ২ দিন পর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি গিয়ে পৌঁছান।

জলঙ্গি থেকে নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা ট্রানজিট ক্যাম্পে উপস্থিত হন। কেচুয়াডাঙ্গা ট্রানজিট ক্যাম্পটি ছিলো পাবনা জেলার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট করার অন্যতম ক্যাম্প। সেখানে মুহাম্মদ আলী সহ ৪ জন উপস্থিত হলে অনেকে তাদের নিরুৎসাহিত করেন। এত ছোট বয়সী ছেলেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট করার সম্ভাবনা কম। এছাড়া ক্যাম্পে থাকা এবং খাবার এর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তাদের সাথে যাওয়া আবুল কালাম এবং খোয়াজ উদ্দিন কয়েকদিন পর দেশে ফিরে যান। তখন থেকে যান মুহাম্মদ আলী এবং আব্দুল কুদ্দুস। বেশ কয়েকদিন পর মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংএ পাঠানোর জন্য একটি দল বাচাই করার সময় আব্দুল কুদ্দুস সিলেক্ট হন। কিন্তু মুহাম্মদ আলীর কম বয়স হওয়ার কারনে বাদ পড়ে। মুহাম্মদ আলীর শত অনুরোধেও সিলেকশন বোর্ডের মন গলাতে পারে না। সিলেকশন বোর্ডের জনৈক সদস্য মুহাম্মদ আলীকে দেখে বলেছিল, তোমার থেকে অস্ত্রের ওজন বেশী। তুমি মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য উপযুক্ত এখনাে হও নাই । যাইহোক মুহাম্মদ আলী বাদ পড়লেন আব্দুল কুদ্দুস ট্রেনিংএ চলে গেলেন।

মুক্তি পাগল মুহাম্মদ আলীর যে মুক্তিযোদ্ধা হতেই হবে। সে কিছুতেই ব্যর্থ হতে রাজী নয়। প্রয়োজনে বছরের পর বছর সে অপেক্ষা করবে। তবুও সে মুক্তিযোদ্ধা হবে। ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিভিন্নজনকে সে ধরপাকড় শুরু করলো। কাকুতি মিনতি আর অনুরোধে কারোর মন গলাতে পারছে না। একপর্যায়ে রিক্রুটের সাথে জড়িত পাবনা পুলিশ লাইনের আর আই আবুল খায়ের তাকে আশ্বাস দিলেন, তুমি একমাস অপেক্ষা করো। পরের ব্যাচে তোমাকে নেওয়া হবে। যথারীতি একমাস পরের ব্যাচে মুহাম্মদ আলীকে সিলেক্ট করা হলো। বন্ধু আব্দুল কুদ্দুস ট্রেনিং শেষ করে চলে আসেন। আর মুহাম্মদ আলী ট্রেনিংএ জন্য রওয়ানা হন।

দার্জিলিং জেলার পানিঘাটায় মুহাম্মদ আলীর ট্রেনিং শুরু হয়। প্রায় মাসব্যাপী ট্রেনিং সফলভাবে শেষ করে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার তরঙ্গপুর ৭ নং সেক্টর হেড কোয়ার্টারে যোগ দেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিষেক হয়। এরপর চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে একাধিক যুদ্ধে অংশ নেন। উল্লেখ্য চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত এলাকায় ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেন এবং মুহাম্মদ আলী সেখানে এক যুদ্ধে আহত হন। সীমান্ত এলাকায় কয়েক মাস কাটিয়ে নভেম্বর মাসের শেষ দিকে নিজ জেলা পাবনায় প্রবেশের সুযোগ পান।

চাটমোহর উপজেলার নরাইখালী গ্রামের এম, আই চৌধুরীর নেতৃত্বে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল নভেম্বর মাসের শেষ দিকে আটঘরিয়া ও চাটমোহর উপজেলায় প্রবেশ করে। সেই দলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দলটি আটঘরিয়া উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে অবস্থান গ্রহন করার পর একটি দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হয়। দলের ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে রবি গোস্বামী, অজিদ এবং গোবিন্দ ছুটি নিয়ে তাদের পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য চাটমোহর গুনাইগাছা এলাকায় যাবার কথা বলে বের হবার পর তিনজনই নিখোঁজ হন। এই ঘটনায় চাটমোহর উপজেলার অন্য মুক্তিযোদ্ধারা সন্দেহ করেন, ঐ তিন মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডার এম আই চৌধুরী ষড়যন্ত্র করে হত্যা করেছে এবং তাদের লাশ গুম করা হয়েছে।

এরপর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম আই চৌধুরী তার দলে ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আট জনের সাথে স্থানীয় প্রায় ৩০/৪০ জন তরুণ ও যুবককে প্রশিক্ষণ প্রদান করে দলভুক্ত করে। তাঁরা চাটমোহর উপজেলার কামালপুর গ্রামে রাজাকার বাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে প্রায় ৮/১০ জনকে হত্যা করে এবং তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। বামনগ্রামে সেনাবাহিনীকে বহনকারী ট্রেনে আক্রমণ করে। ডিসেম্বর মাসে আটঘরিয়া থানা ভবন আক্রমণ করে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও চাটমোহর থানা মুক্ত হয় ২০ ডিসেম্বর। সেদিন সেখানে সংঘটিত হয় আরেকটি দুঃখজনক ঘটনা। চাটমোহর উপজেলার অন্য মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম আই চৌধুরীকে আটক করে। তার দলের ৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা এবং গুম করার অপরাধে তাঁকে অভিযুক্ত করে। পরে এম আই চৌধুরীর দুই ভাই এবং ভগ্নিপতি সহ মোট ৪ জনকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করে।

এই ঘটনার পর আটঘরিয়ার কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী নিজ উপজেলায় ফিরে আসেন এবং আটঘরিয়া থানা ভবনে অবস্থানরত আনোয়ার হোসেন রেনু এবং মোন্তাজ আলীর গ্রুপের সাথে যোগ দেন। ২০ ডিসেম্বর থেকে ২৯ জানুয়ারী পর্যন্ত আটঘরিয়া থানা ভবনে অবস্থান করে সকল মুক্তিযোদ্ধা একসাথে ৩১ জানুয়ারী ঢাকা স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পন করেন। এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করার মত। সেই ঘটনাটি হলো কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী সহ যে ৪ জন কিশোর একসাথে ভারতে গিয়েছিল তাদের মধ্যে ফিরে আসা ২ জনের ১ জন খোয়াজ উদ্দিন দেশে এসে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। তার পরিনতি ঘটে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে মুলাডুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। আর একসাথে ভারত যেয়ে প্রথম ব্যাচে সিলেক্ট হওয়া মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসের সাথে দেখা হয় ২০ ডিসেম্বর আটঘরিয়া থানা ভবনে। সেই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস এর পরিনতি ঘটে বড় নির্মম এবং মর্মান্তিক। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে দেবোত্তর বাজার থেকে একদল চিহ্নিত সশস্ত্র ক্যাডার তাঁকে প্রকাশ্যে অপহরণ করে। সেখান থেকে পাবনা শহরের একটি ক্যাম্পে এনে হত্যা করে তাঁর লাশটি চিরতরে গুম করা হয়।

আটঘরিয়ার সর্বকনিষ্ঠ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর কথা লিখতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক অনেক কথা বলতে হলো। হয়তো আরো অনেক কথা বলা যেতো। মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় এইসব যোদ্ধারা সদ্য স্বাধীন দেশে কি পরিমাণ ভোগান্তির মুখে পড়েছে তা কল্পনার বাইরে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী সেও এই ভোগান্তি থেকে বাদ পড়েন নাই। সদ্য স্বাধীন দেশে তাঁকেও জেলখানায় থাকতে হয়েছে। তবে সে অবশ্যই সৌভাগ্যবান যে, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম আই চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসদের মত অকালে তাঁর জীবনটা যায়নি।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী আটঘরিয়া পৌরসভার বিশ্রামপুর গ্রামের বাসিন্দা। পিতা – মৃত আব্দুল মালেক এবং মাতা মোছাঃ চান ভানু। বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ১৯৮৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রুপালী ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন। স্ত্রী, তিন ছেলে ও নাতী-নাতনী নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর এফ এফ নাম্বার ৭৭৪৫. সে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতাপ্রাপ্ত। পরিশেষে তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
( সমাপ্ত)

লেখক পরিচিতি –

আমিরুল ইসলাম রাঙা
প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন সদস্য
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব
পাবনা।
৩০ জুন ২০২০