প্রধান মেনু

আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়া

পাবনার ক্ষুদ্র এক উপজেলার নাম আটঘরিয়া। পাবনা জেলা গঠনের একশত বছর পর আটঘরিয়া থানা গঠিত হয়। ১৯২৮ সালে আটঘরিয়া থানা গঠনের পর এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি করা হয়। ১৯৩৪ সালে ১১ বিঘা জমির উপর থানা ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯৬২ সালে আটঘরিয়ার দেবোত্তরে থানা সার্কেল অফিসারের অফিসসহ প্রশাসনিক অফিস আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে থানাকে উন্নীত করে আটঘরিয়া উপজেলা গঠণ করা হয়। উল্লেখিত তথ্যমতে আটঘরিয়া থানা স্থাপন করা হয়েছে ৯২ বছর পূর্বে আর উপজেলা গঠিত হয়েছে ৩৭ বছর আগে।

আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়া নিয়ে লিখতে হলে বলতে হবে আমার জন্মের ২৫ বছর পূর্বে আটঘরিয়া থানা গঠিত হয়েছিল । ১৯ বছর পূর্বে আটঘরিয়া থানা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল । আমার জন্মের ৯ বছর পর আটঘরিয়া থানা কাউন্সিল এবং ৩০ বছর পর আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদ গঠিত হয় । ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আটঘরিয়া উপজেলার বেরুয়ান গ্রামে আমার জন্ম। বাবা সাহাদত আলী এবং দাদা আয়েজ উদ্দিন মোল্লা। আমার বাবা সাহাদত আলী ছিলেন সড়াবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সড়াবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল প্রায় ১০ গ্রামের মধ্যে একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর বাবা ছিলেন নিজ গ্রাম এবং পাশের গ্রামগুলির মধ্যে একমাত্র মেট্রিক পাশ। সেখানে শিক্ষকদের মধ্যে আরেকজনের বাড়ী ছিল এই বেরুয়ান। উনার নাম আবদুল ওয়াহেদ। অন্য শিক্ষকরা বেশীর ভাগ বাইরের ছিলেন । শিক্ষকদের মধ্যে অনেকে ছিলেন আন্ডার মেট্রিক। এমনকি ফাইভ পাশ শিক্ষকরাও শিক্ষকতা করতেন।

আমার দাদা আয়েজ উদ্দিন মোল্লা ছিলেন চাঁদভা ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রথমে প্রেসিডেন্ট এবং পরে চেয়ারম্যান। আটঘরিয়া থানার পুলিশ স্টেশন ও আটঘরিয়া গ্রাম ছিল, চাঁদভা ইউনিয়নের অধীনে। ইউনিয়ন কাউন্সিলের অফিস, পোস্ট অফিস, ইউনিয়ন পর্যায়ের সমস্ত অফিস ছিল চাঁদভায়। তৎকালীন সময়ে চাঁদভা ছিল থানার মধ্যে বড় ব্যবসাকেন্দ্র । খরস্রোতা রত্নাই নদীর পাড়ে গড়ে উঠা চাঁদভা গ্রাম হলো অত্র অঞ্চলের প্রাচীন জনপদ। প্রায় আড়াই শত বছর আগের জমিদার চন্দ্র নাথ সেন এর বাড়ী প্রমাণ করে চাঁদভার প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা। এছাড়া অত্র এলাকায় প্রচুর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন বসবাস করতেন। নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠা তাঁতশিল্প ছিল জেলার মধ্যে প্রসিদ্ধ। চাঁদভা থেকে নদীপথে পাবনা জেলা শহর, ঢাকা এবং কলকাতায় অবাধে বানিজ্য নৌকা চলাচল করতো। এক কথায় বলা যায়, আটঘরিয়া থানা এলাকা এবং দেবোত্তর থানা সদর থেকে চাঁদভা হাট বেশী সমৃদ্ধ এবং প্রসিদ্ধ ছিল।

আমার বাল্যকালের একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত আটঘরিয়ার গ্রামের বাড়িতে থেকেছি। সড়াবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করে ১৯৬৪ সালের শুরু থেকে পাবনা শহরে বসবাস শুরু করি। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, বড় দুই ভাইয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শেষ করার পর মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহনের জন্য পাবনা শহরে যেতে হয়। তখন আটঘরিয়া থানায় কোন হাইস্কুল ছিলো না। আমাদের এলাকার বেশীর ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর পড়াশুনা থেকে ঝরে পড়তো। সচ্ছল আর অতি উৎসাহী কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের ৬/৭ মাইল দুরে ঈশ্বরদী থানার দাশুড়িয়া স্কুলে পড়াতো। কিছু ছেলে পাবনা শহরে বা আশেপাশের গ্রামগুলিতে লজিং থেকে পড়াশুনা করতো। এলাকার অনেক ছেলে ১০/১২ মাইল সাইকেল চালিয়ে পাবনা শহরে গিয়ে পড়তো। এমন সময়ে হাইস্কুলে পড়া ছাত্রের সংখ্যা এত কম ছিল যে, কোন গ্রামে ছিল আবার পাঁচ গ্রামে একজনও ছিলো না। ৬০ এবং ৭০ সালের মধ্যে আটঘরিয়া এবং পার খিদিরপুরে দুইটি জুনিয়র হাইস্কুল স্থাপন করা হয়। আটঘরিয়া থানার সামনে জুমাইখিরী গ্রামের মফিজ উদ্দিনের উদ্যোগে একটি জুনিয়র হাইস্কুল চালু হয়। মফিজ উদ্দিন ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা হেডমাষ্টার। যিনি আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে ঝরেপড়া ছাত্র এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করা ছাত্র সংগ্রহ করে আটঘরিয়া জুনিয়র হাইস্কুল চালু করেন। এই গুণী শিক্ষানুরাগী ফসলের মৌসুমে বাড়ী বাড়ী গিয়ে ধান, চাউল ফসল সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় মিটাতেন। কালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া এই শিক্ষাবীদ ১৯৭২ সালে আটঘরিয়া থানায় প্রথম কলেজ স্থাপন করে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ৬০ এর দশকে প্রথম জানতে পারি মাজপাড়া ইউনিয়নের সোনাকান্দর গ্রামের অধ্যাপক ইদ্রিস আলীর কথা। যিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষক ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তিনিই পার খিদিরপুর হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ৬০ এর দশকে দেবোত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ খানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়, দেবোত্তর জুনিয়র হাইস্কুল ( বর্তমানে যেটা দেবোত্তর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়)।

ছোটবেলায় পাবনা জেলার মানচিত্র আর ভারতবর্ষের মানচিত্র দেখলে মনটা খুব খারাপ হয়ে যেতো। ভারতবর্ষের মানচিত্রে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান যা আজকের বাংলাদেশের অবস্থান দেখে মনের কাছে প্রশ্ন করতাম, এমন আকাঁ-বাঁকা করে পূর্ব পাকিস্তান বানানোর কি দরকার ছিল? এতবড় ভারতবর্ষে গোল আকৃতির বড়-সড় করে পূর্ব পাকিস্তান বানালে ক্ষতি কি হতো? অনুরূপ আটঘরিয়া থানার মানচিত্র নিয়েও শিশুমনে প্রচন্ড ক্ষোভ ছিল। এত লম্বা করে ৫ ইউনিয়নের এই ছোট আটঘরিয়া বানানোর কি দরকার ছিল? কে ঐ ইংরেজ বেনিয়াদের বলেছিল, তুমি আটঘরিয়া থানা বানাও। মনে মনে ভাবতাম নিশ্চয় কোন মাতাল ইংরেজ কর্তা চোখ বন্ধ করে দুর্গাপুর থেকে লক্ষীপুর পর্যন্ত ৩০ মাইল লম্বা আটঘরিয়ার সীমানা করেছিলেন। কেন ৫ টি ইউনিয়ন এবং কম জনসংখ্যা নিয়ে আটঘরিয়া থানা বানিয়েছিলেন? এই জেলার অনেক থানা ১০/১২ টা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। তাহলে আটঘরিয়া থানা এমন হলো কেন? এমন অদ্ভুত এবং অসামঞ্জস্য ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা এক প্রান্তের মানুষের সাথে অন্য প্রান্তের কোন যোগাযোগ ছিল না। স্বাধীনতার পর আটঘরিয়ার বাঐখোলা গ্রামের এক বৃদ্ধের কাছে জেনেছিলাম, তিনি কোনদিন আটঘরিয়া বা দেবোত্তর দেখেনি। অনেক মানুষের কাছে শুনেছি, তাঁরা কোনদিন পাবনা শহরে যায়নি। এসবই ছিল বাস্তব ঘটনা।

আটঘরিয়া নিয়ে বলতে গেলে মনে পড়ে থানার একটি বিরাট অংশ ছিল নিম্নঅঞ্চল। লক্ষীপুর, একদন্ত এবং দেবোত্তর ইউনিয়ন ছিল চলনবিলের অংশ বিশেষ। বিরাট অঞ্চল জুড়ে জলমগ্ন থাকতো। বর্ষাকালে পানিতে বেশীর ভাগ তলিয়ে যেতো। পানি নেমে গেলে বছরে একটি ফসলের আবাদ হতো। কোন বছরে অকাল বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতো। মানুষের চলাচলের জন্য কোন রাস্তা ছিলনা বরং বর্ষা এলে একমাত্র নৌকা নিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে মানুষ চলাচল করতো। সেই সব ডিঙি নৌকায় দুরে যাওয়া সম্ভব ছিলোনা। আটঘরিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত চলাচলের জন্য একমাত্র ভরসা ছিল নৌকা। এই কারনেই হাট-বাজারগুলিয় নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। আটঘরিয়ার প্রধান নদীগুলির মধ্যে চন্দ্রাবতী নদীর পাড়ে খিদিরপুর বাজার, রত্নাই নদীর পাশে দেবোত্তর, আটঘরিয়া ও চাঁদভা বাজার গড়ে উঠে। চিকনাই নদীর পাড়ে গোড়রী বাজার। ইছামতি নদীর পাড়ে একদন্ত, শিবপুর, শ্রীপুর এবং লক্ষীপুরে হাট-বাজার গড়ে উঠে।

স্বাধীনতার আগে আটঘরিয়া থানায় বেশ কিছু খ্যাতিমান মানুষ ছিলেন। যারা রাজনীতিতে , সামাজিকতায়, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক মনের গুনীজন ছিলেন। আটঘরিয়া থানার লক্ষীপুর ইউনিয়নের বাঐখোলা গ্রামে আধ্যাত্মিক ও ধার্মিক ব্যাক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা ইয়াকুব আলী ( রঃ)। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ছিলেন, লক্ষীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, বাউল সাধক ও সংগীতশিল্পী, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সৈন্যদের হাতে নিহত শহীদ এম এ গফুর। রাজনীতিতে আটঘরিয়া থানার একদন্ত ইউনিয়নের ডেঙ্গারগ্রামের মুসলিম লীগ নেতা ডাঃ তোফাজ্জল হোসেন যিনি মুসলিম লীগের পাবনা জেলার অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। থানা মুসলিম লীগের আরেক নেতা ছিলেন একদন্ত ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শিবপুরের জহির উদ্দিন। দেবোত্তর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ খান ছিলেন আটঘরিয়া থানার মুসলিম লীগের প্রধান নেতা। এলাকায় তিনি সৎ এবং জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। যিনি আটঘরিয়া থানার প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র দেবোত্তরে প্রতিষ্ঠার প্রধান রুপকার। উনার প্রতিপক্ষ ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান ফনি। চাঁদভা ইউনিয়নে তৎকালীন প্রধান দুই নেতা ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান যথাক্রমে আয়েজ উদ্দিন মোল্লা এবং সদর উদ্দিন প্রামানিক। মাজপাড়া ইউনিয়নের প্রধান দুই নেতা ছিলেন, সাবেক চেয়ারম্যান মফিজ উদ্দিন মন্ডল এবং আব্দুল জব্বার মিয়া।

১৯৬২ সালে আটঘরিয়া থানা কাউন্সিল স্থাপনের সময় দেবোত্তর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ খান, চাঁদভা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন আমার দাদা আয়েজ উদ্দিন মোল্লা, মাজপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন মফিজ উদ্দিন মন্ডল, একদন্ত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন জহির উদ্দিন। লক্ষীপুরের চেয়ারম্যান ছিলেন ডাঃ সিরাজুল ইসলাম।। উল্লেখিত চেয়ারম্যানগন ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ। ছোটবেলায় দাদার সাথে গরুর গাড়ীতে চাঁদভা, আটঘরিয়া এবং দেবোত্তর যেতাম। আমরা বড় তিনভাই যথাক্রমে নজরুল ইসলাম রবি ( অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল), কামরুল ইসলাম ফুটু ( বীর মুক্তিযোদ্ধা) এবং আমি। আমাদের তিন ভাইয়ের বয়সের ব্যবধান ছিল চার বছর। ছোটবেলায় তিন ভাই একসাথে কখনো আমি ছোট বলে একাই দাদার সফরসঙ্গী হতাম। দাদার সাথে গরুর গাড়ীতে বলা যায় প্রায় সপ্তাহে চাঁদভা হাটে যেতাম। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার, চৌকিদার এবং দাদার ভক্তদের আদর আপ্যায়নের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পরে ৫৫ বছর আগে চাঁদভা হাটে গিয়ে হারান চাচার দোকানে মিষ্টি খাওয়ার কথা। খিদিরপুর হাটের রহিম চাচার রসগোল্লার স্বাদ এখনো অনুভব করি। আর দেবোত্তর হাটে আসতে চাওয়ার কারণ ছিল, চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ খান দাদার আপ্যায়ন। মনে হতো আমার আপন দাদার চেয়ে উনি বেশী আদর করতেন। দেবোত্তর হাটের পেনু চাচার দোকানে নানা রকম খাবার খেতাম। সেসব খাবার আর উনাদের আপ্যায়ন বড় হয়েও পেয়েছি।

১৯৬২ সালে থানা কাউন্সিলের অফিস দেবোত্তরে হওয়ার পিছনে কয়েকটা বিষয় উল্লেখ করা যায়। এক, দেবোত্তর ছিল থানার মধ্যবর্তী স্থানে । দেবোত্তর ছিল উচু সমতল ভুমি এবং সহজে বিরাট পরিমাণ জমিদাতা পাওয়া গিয়েছিল । প্রায় সব চেয়ারম্যান দেবোত্তরকে সমর্থন করেছিল। দেবোত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ খান মুসলিম লীগের নেতা হওয়ার সুবাদে স্থান নির্বাচন সহজ হয়। এছাড়া আমার জানামতে সেই সময় আটঘরিয়া অঞ্চলে থানা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করার জোরালো দাবী ছিলোনা। যা ১৯৮৩ সালে উপজেলা পরিষদ কার্যালয় স্থাপনের বিষয় তীব্র প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেই বিষয়ে পড়ে উল্লেখ করবো। আমার এখনো মনে পড়ে দাদার সাথে দেবোত্তরে এসেছিলাম। এখন যেটা উপজেলা পরিষদ সেখানে কয়েকটি বাড়ী ছাড়া বিরাট এলাকা ছিল ফসলী মাঠ। তখন বিনা বাঁধায় দেবোত্তর থানা কাউন্সিল স্থাপনের স্থান নির্ধারন হয়। এখন যেটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবন, সেই জায়গায় বাড়ী ছিল আফাজ চাচার। যে আফাজ চাচা দেবোত্তর থেকে উচ্ছেদ হয়ে পাবনা শহরে মক্তব এলাকায় বাড়ী করেন এবং স’মিল এর ব্যবসা করতেন।

স্বাধীনতার আগে আটঘরিয়া থানায় কোন পাকা রাস্তা ছিলো না। থানা সদর থেকে পশ্চিমে খিদিরপুর বাজার হয়ে পারখিদিরপুর পর্যন্ত মাটির রাস্তা ছিল। পার খিদিরপুর থেকে মুলাডুলি যাতায়াতের রাস্তা সেটাও চিকন সরু ছিল। দেবোত্তর থেকে উত্তরে আটঘরিয়া থানা পর্যন্ত উচু মাটির রাস্তা ছিল। আটঘরিয়া হাট থেকে পশ্চিম উত্তরদিকে চাঁদভা পর্যন্ত সড়ক ছিল। রত্নাই নদীর উপরে ব্রীজ না থাকায় বর্ষাকালে নৌকায় পারাপার হতো। সেখানে ব্রীজ হয়েছে ১৯৮৪ সালে। রত্নাই নদীর উপরে রাধাকান্তপুর ব্রীজ হয়েছে ১৯৬০ সালের দিকে। নদীর বেশীর ভাগ স্থানে নৌকায় মানুষ পারাপার হতো। আটঘরিয়া উত্তরে বর্তমান চাটমোহর রাস্তায় মানুষ শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে চলাচল করতো। বর্ষায় নৌকা নিয়ে চলাচল করতে হতো। আটঘরিয়া থানায় সচ্ছল পরিবারে চলাচলের প্রধান বাহন ছিল নৌকা। শুষ্ক মৌসুমে মহিষ অথবা গরুরগাড়ীর উপর মানুষ নির্ভরশীল ছিল। বর্ষা মৌসুমে রাস্তাঘাট এত খারাপ হতো যে গাড়ী দুরের কথা পায়ে হেঁটে চলাও দুষ্কর ছিলো। আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়ার রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কথা এখনও মনে পড়ে। আমাদের গ্রামে দুই স্থানে ভয়াবহ গর্ত ছিলো। বেরুয়ান মহিলা কলেজের সামনে একটা বিরাট অংশ জুড়ে গর্ত ছিল । এলাকায় যেটাকে মধুর গাড়ে (গর্ত) বলা হতো। এই গর্তে গরু মহিষের গাড়ী আটকা পড়ে অনেক মানুষ নাজেহাল হতো। বেরুয়ানের দক্ষিণ অংশে ছিল বালুর গাড়ে ( গর্ত)। এই রাস্তায় ভয়ে মানুষ গাড়ী নিয়ে যেতো না। দেবোত্তর এবং রাধাকান্তপুরের মাঝখানে ছিল ভয়াবহ গর্ত। আমার নানার বাড়ী একদন্ত ইউনিয়নের ডেঙ্গারগ্রাম। বছরে অনেকবার যেতো হতো। কয়রাবাড়ী থেকে পাটেশ্বর হয়ে সুতিরবিল পাড়ি দেওয়া কি কঠিন ছিল তা ভাবতে এখনো শিউরে উঠতে হয় । আমার বাল্যকালে বেশী যাওয়া হতো ভরতপুর এবং কামালপুরে । এই দুই গ্রামে ছিল দুই দাদীর বাড়ী। তবে জীবনে প্রথম গ্রামের বড়দের সাথে পায়ে হেঁটে চাটমোহর যাওয়ার কথা এখনো মনে আছে । সকালে ভাত খেয়ে বড়দের সাথে দলবেঁধে হাটতে হাটতে হাঁপানিয়া-রতিপুর-বাঁচামারা-দিলালপুর- পাঁচুড়িয়া হয়ে সেই বিরাট বিল পাড়ি দিয়ে মথুরাপুর হাটে যাওয়ার স্মৃতি এখনো মনে আছে। ৫৫/৫৬ বছর আগে পাঁচুড়িয়ার সোনাই মল্লিকের বাড়ী দেখা এবং মথুরাপুর হাটে গিয়ে সোনাই মল্লিককে নিয়ে লেখা কবিতা কেনার কথা এখনো মনে আছে। চাটমোহরে রেল লাইন আর রেলগাড়ী চলা দেখে যে শিহরণ জেগেছিল সেটা ভোলার নয়। জীবনে প্রথম চাটমোহর, ঈশ্বরদী আর পাবনা শহর দেখার অনুভূতি এখনো মনে গেঁথে আছে।

আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়া থানা নিয়ে লেখায় ৯২ বছরের আটঘরিয়াকে নিয়ে ৩ ভাগ করে যদি লেখি তাহলে ১ম ভাগের ৩০ বছরের আরো কিছু তথ্য লেখার দরকার। যে বিষয়গুলি অনেকের জানা দরকার। আটঘরিয়া থানার বেশীর মানুষ খুব অভাবী ছিলেন। একটি গ্রামে ১/২ টা পরিবার সচ্ছল ছিল। যেনারা সারাবছর বাড়ীর চাউলের ভাত খেতেন। আর ৯৭ ভাগ পরিবারে ছিল অভাব। কারো ৬ মাস, কারো ৯ মাস চললেও আষাঢ়, শ্রাবন এবং ভাদ্র মাসে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিতো। অভাব অনটনের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে এখনো কষ্ট লাগে। আগের ৯০/৯৫ ভাগ মানুষ সরকারী রেশনের উপর নির্ভরশীল ছিল। রেশনে পাওয়া আটা আর আতপ চাউল ছিল খাবার। গ্রামের গরীব মানুষের প্রধান খাবার ছিল ভূট্টা বা গমের আটার রুটি। অভাবী ছাড়া সচ্ছল মানুষ খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। আজ এই লেখাটি এই প্রজন্মের যারা পড়বে – তাদের বিশ্বাস করা কঠিন হবে এদেশের মানুষ কত দুখী ছিল। বর্তমানে গ্রামে অভাবী মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থায় মাটির সড়ক পাওয়া কঠিন। অতীতের নৌকা, গরুগাড়ীর জায়গা দখল করেছে ইঞ্জিনবাহী বাহন। অটো, নসিমন,করিমন, সিএনজি এখন সর্বত্র। এখন গ্রামের অশিক্ষিত পরিবারে অসংখ্য উচ্চ শিক্ষিত সন্তান গড়ে উঠছে। শিক্ষায় ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে। আজ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ এর আলোতে আলোকিত।

সময়ের সাথে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্র পরিবর্তনের সাথে কিংবা সরকার পরিবর্তনে ক্ষমতা, নেতৃত্ব এসবই পাল্টে যায়। এদেশে দুইবার দেশভাগে গোটা সমাজ পাল্টে গেছে। প্রথমবার বড় পরিবর্তন হয়েছে ১৯৪৭ সালে এবং দ্বিতীয়বার বড় পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙ্গে হলো পাকিস্তান। ১২ শত মাইল দুরের অবিভক্ত বাংলা ভেঙ্গে হলো পূর্ব পাকিস্তান। ৪৭ সালে এবং ৬২ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় লক্ষ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগ করতে হলো। এপাড়ে হিন্দু ওপারে গেলো। ওপারের মুসলমানেরা এপাড়ে আসতে হলো। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যা শিকার হলো। হাজার হাজার মানুষ সম্পদ হারালো। এর বিরুপ প্রভাব পড়ে আটঘরিয়া থানাতেও। আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়ার অনেক গ্রাম যেমন দেবোত্তর, আটঘরিয়া, চাঁদভা, উত্তর চক, গোড়রী, মিয়াপাড়া, সড়াবাড়িয়া, নাগদহ, কদমডাঙ্গা, খিদিরপুর, লক্ষীপুর, শ্রীপুর, একদন্ত এলাকা থেকে হাজার হাজার হিন্দু পরিবারকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। অনুরুপ হাজার হাজার মুসলিম পরিবার ওপাড় থেকে এপাড়ে এসে বসতি স্থাপন করে।

এছাড়া স্বাধীনতার আগে ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পরিবার আটঘরিয়া অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। ঐসব অঞ্চলের মানুষের আসার প্রধান কারন ছিল, তাঁদের জমিজমা অধিক মূল্যে বিক্রি করে আটঘরিয়া এলাকায় কম দামে বেশী জমি ক্রয় করতেন। আমাদের এলাকায় খুব ভাল জমি ১শত টাকা বিঘায় পাওয়া যেতো। ৭০/৮০ টাকাতেও পাওয়া যেতো। ১৯৬২ সালে আমার দাদা ৩০ বিঘা জমি ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করে পাবনা শহরে পৌনে এক বিঘার বাড়ী ২৭ শত টাকায় ক্রয় করেছিলেন। আরেকটি বিষয় যেটা আমার শোনা ছিল এবং কিছু ছিল দেখা ঘটনা। ৬০ এর দশকে ঢাকা অঞ্চল থেকে যখন আটঘরিয়া অঞ্চলে মানুষ আসা শুরু করে তখন দেবোত্তর ইউনিয়ন সহ বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয় অধিবাসীরা দলবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তারা কোনভাবেই ঢাকাইয়া লোকদের কাছে জমি বিক্রি করবেন না। তখন চাঁদভা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন আমার দাদা। আমার দাদা এবং তাঁর সমর্থকরা সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা ঢাকা থেকে আসা লোকদের কাছে জমি বিক্রি করবেন। কারন হিসেবে বলা হয়েছিল বাইরে থেকে আসা লোকদের কাছে জমি বিক্রি করলে অনাবাদি জমি চাষাবাদ বেশী করা যাবে। কাজের মানুষ বেশী পাওয়া যাবে। এছাড়া আরেকটি প্রধান কারন ছিল, ভোটার, সমর্থক বেশী হলে এলাকায় নেতৃত্ব দেওয়া সহজ হবে। এরপর দেখা গেলো চাঁদভা ইউনিয়ন এবং মাজপাড়া ইউনিয়নে ঢাকা থেকে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষ বসতি স্থাপন করেন। আমাদের এলাকায় আধ লাহি নামক এক ব্যক্তি সেই সময় অর্ধ লক্ষ টাকা নিয়ে পাশের বাগবাড়ীয়া গ্রামে বসতি করেছিলেন। অর্ধ লক্ষ টাকার মালিক হওয়ায় তাঁর আসল নাম হারিয়ে গিয়ে অাধ লাহি নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। আরেকটি পরিবার আমাদের এলাকায় অজগুবি ঢাকালে নামে পরিচিতি লাভ করেন। সেটার কারন হলো পরিবারটি একরাতে বাড়ীঘর বানিয়ে বসতি স্থাপন করলে এলাকার মানুষজন অজগুবি ঢাকালে নামে নামকরণ করেন।

স্বাধীনতার আগে আটঘরিয়ার রাজনীতি নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে ধারণা দিতে চাই। পাকিস্তানের ২৩ বছর শাসনকালে ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত জেনারেল আইয়ুব খান ১০ বছর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জেনারেল আইয়ুব খান তার ১০ বছর শাসনকালে বেশীরভাগ সময় সামরিক আইনের আড়ালে রাজনৈতিক দলগুলি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ভাসানী দল থেকে বের হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি – ন্যাপ গঠন করেন। তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করলে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁর শাসনকালে আওয়ামী লীগের উপর কঠোর এবং নির্মমভাবে নির্যাতন। শেখ মুজিবুর রহমানকে একাধিকবার কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সর্বশেষ ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ঘোষণা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর শেখ মুজিবুর রহমান সহ ৩৫ জন বাঙালী সামরিক ও বেসামরিক অফিসারকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা চালান। এমতাবস্থায় ১৯৬৮-৬৯ সালে এদেশের ছাত্র জনতা তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। গণআন্দোলনের তীব্রতায় ১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারী আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয়। ঐদিন শেখ মুজিবুর রহমান সহ সমস্ত বন্দী মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়। এরপর পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের দাবী করা হয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করে সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং ১৭ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন এর তফসিল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের আগে ভাসানী ন্যাপ নির্বাচন বর্জন করে। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য ( এমএনএ) হিসেবে পাবনা সদর – আটঘরিয়া – ঈশ্বরদী আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান, মোঃ আমজাদ হোসেন, জামায়াতে ইসলামী থেকে মাওলানা আব্দুস সোবহান এবং মোজাফফর ন্যাপ থেকে সেলিনা বানু প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ( এমপিএ) হিসেবে আটঘরিয়া – ঈশ্বরদী আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান এডভোকেট আমিন উদ্দিন, জামায়াতে ইসলামী থেকে মাওলানা খোদা বক্স খান, মুজাফফর ন্যাপ থেকে আবদুল হালিম চৌধুরী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হন মোঃ ইউসুফ আলী। দলীয় প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীক, জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লা, মুজাফফর ন্যাপ কুড়ে ঘর মার্কা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আমজাদ হোসেন এবং প্রাদেশিক পরিষদে এডভোকেট আমিন উদ্দিন নির্বাচিত হন। নির্বাচনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেন। তখন রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কোন দল সংগঠিত ছিলোনা।

আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে সংগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও নির্ধারিত সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। ২ মার্চ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ভাষন দেওয়ার পর গোটা দেশে স্বাধীনতার দাবীতে আন্দোলন শুরু হয়। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং বিরোধী দলের নেতা জুলফিকার আলি ভূট্টো ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করতে থাকেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঢাকা ত্যাগ করলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা অপারেশন সার্চলাইট নামে অপারেশন শুরু করে। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় নীরিহ মানুষকে হত্যা করা। ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে পাকিস্তানী সৈন্যরা নেমে পড়ে। ২৬ মার্চ পাবনা শহর থেকে আটঘরিয়া – ঈশ্বরদীর নির্বাচিত সংসদ সদস্য এডভোকেট আমিন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। ২৭ মার্চ থেকে পাবনায় সবস্তরের জনগন পাকিস্তান সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। ২৯ মার্চ পাবনায় অবস্থানরত সমস্ত পাকিস্তান সৈন্যদের হত্যা করে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা মুক্ত থাকে। পাবনায় সংগঠিত প্রতিরোধ যুদ্ধে আটঘরিয়ার সংসদ সদস্য এডভোকেট আমিন উদ্দিন এবং আটঘরিয়া থানার দারোগা আব্দুল জলিল শহীদ হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে আটঘরিয়ার মানুষ অনেক গৌরব উজ্জ্বল ভূমিকা রাখেন। আটঘরিয়ায় ২২ অক্টোবর বেরুয়ান যুদ্ধ , ৬ নভেম্বর বংশিপাড়া যুদ্ধ, ১১ ডিসেম্বর থানা আক্রমণ করার ঘটনা ইতিহাসে খোদাই করে লিপিবদ্ধ আছে।

আটঘরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সংক্ষেপে লিখতে চাই। কারন আটঘরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এযাবত অনেক লেখালেখি হয়েছে। অনেকে ইতিহাস লিখেছেন কিংবা স্মৃতিচারন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া শীর্ষ পর্যায়ের বীরেরা এখনও বেঁচে আছেন। আজকের প্রজন্ম হয়তো প্রকৃত অনেক ঘটনা জানেনা। আমার স্মৃতিতে আমি কিছু বিষয়ে উল্লেখ করতে চাই। মুক্তিযুদ্ধে আটঘরিয়ায় বেশ কয়েকটি দল ছিল। এদের মধ্যে আটঘরিয়ার আনোয়ার হোসেন রেনু, ঈশ্বরদীর ওয়াছেব আলী, পাবনার নয়নামতির শাজাহান আলী, রাধানগরের আবদুল মান্নান গোড়া, চাটমোহরের এম, আই চৌধুরী এবং আটঘরিয়ার চাঁদভার মন্তাজ আলীর নেতৃত্বধীন দলগুলি আটঘরিয়া এলাকায় যুদ্ধকালীন সময়ে কাজ করেছে। কেউ আটঘরিয়ায় অবস্থান করেছেন আবার কোন দল সীমান্ত এলাকায় কাজ করেছেন। এদের মধ্যে বেরুয়ান যুদ্ধে অংশ নেন, আটঘরিয়ার আনোয়ার হোসেন রেনু এবং পাবনার শাজাহান আলী। উক্ত যুদ্ধে আনোয়ার বাহিনীর তোয়াজ উদ্দিন এবং হায়দার আলী শহীদ হন। বংশিপাড়া যুদ্ধে আনোয়ার হোসেন রেনু এবং ঈশ্বরদীর ওয়াছেব আলীর গ্রুপ অংশ নেন। উক্ত যুদ্ধে আনোয়ার বাহিনীর আবুল কাশেম এবং আব্দুল খালেক শহীদ হন। উক্ত যুদ্ধে ওয়াছেব বাহিনীর আট জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আটঘরিয়া থানা আক্রমণ করেন, চাটমোহরের এম, আই, চৌধুরী এবং মন্তাজ আলীর গ্রুপ। উক্ত যুদ্ধে দুই জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। আটঘরিয়ার মন্তাজ আলীর বাহিনী চাঁপাই নবাবগঞ্জের মহদীপুর সীমান্তে যুদ্ধ করার সময় তাঁর দলের তোতা মিয়া শহীদ হন। তবে আটঘরিয়া থানায় যুদ্ধকালীন সময়ে আনোয়ার হোসেন রেনু থানা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আটঘরিয়া মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের তালিকাও দীর্ঘ। যুদ্ধকালে পুর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে আদম মালিকের মন্ত্রী সভায় শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন, পাবনা আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ইসাহাক আলী। যিনি আটঘরিয়া থানার সড়াবাড়িয়া ঈদগাহ মাঠে দুই ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন। জামায়াতের সাবেক আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাঁথিয়া থানায় জন্মগ্রহণ করলেও স্বাধীনতার আগে আটঘরিয়া থানার শিবপুর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। আটঘরিয়া থানার ধলেশ্বর গ্রামের মাওলানা বেলাল হোসেন যুদ্ধের সময় ঢাকায় পড়াশোনা করতেন এবং সে আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় স্বাধীনের পর আটক হয়ে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত জেলখানায় বন্দী ছিলেন। দেবোত্তর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার মোল্লা যুদ্ধের সময় পাবনায় আল মুজাহিদ বাহিনীর সদস্য ছিলেন। সে পাবনায় মুসলিম লীগ নেতা ক্যাপ্টেন জায়েদীর সহযোগী ছিলেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে জেলে যান, দেবোত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহেদ খান। তিনি আটঘরিয়া থানা শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন। যদি উনি যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। উনার দুই ছেলে যথাক্রমে শহীদুল্লাহ খান বাদশা এবং হাবিবুল্লাহ খান বুল্লা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। স্বাধীনতার পর মাজপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার মিয়া যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে জেলখানায় ছিলেন। আটঘরিয়া থানা শান্তি কমিটির সম্পাদক আবু বক্কার বাক্কু কেরানী, শান্তি কমিটির সদস্য রুস্তমপুর গ্রামের মাওলানা আব্দুল লতিফ এবং একদন্ত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহির উদ্দিনকে যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করেছিল। এছাড়া শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে লক্ষীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ডাঃ সিরাজুল ইসলাম, একদন্ত ইউনিয়নের মাওলানা রিয়াজ উদ্দিন, চাঁদভা ইউনিয়নের কুষ্টিয়াপাড়া গ্রামের সদর উদ্দিন, বাঁচামারা গ্রামের সাহাজ উদ্দিন মোল্লা, দেবোত্তর ইউনিয়নের ধলেশ্বরের আমির উদ্দিন, বেলদহ গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে দেশ স্বাধীন হলো। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হলো। দেশ, সমাজ, নেতৃত্বের আমুল পরিবর্তন হলো। স্বাধীনতার পর আটঘরিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা বিশেষ করে আনোয়ার হোসেন রেনু এবং মন্তাজ আলীর বাহিনী আটঘরিয়া থানায় অবস্থান নেন। আনোয়ার হোসেন রেনু’র একটি গ্রুপ দেবোত্তর এবং আরেকটি গ্রুপ একদন্ত বাজারে অবস্থান গ্রহন করেন। প্রায় দেড় মাস মুক্তিযোদ্ধারা থানা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতেন। স্বাধীনতা বিরোধী এবং সমাজের অপরাধী শ্রেনীর মানুষদের আটক করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলতে থাকে। কাউকে ধরে এনে বিচার করে হত্যা করা হতো। অপরাধ লঘু হলে জেলে পাঠানো বা মুক্তি দেওয়া হতো। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। ৩১ জানুয়ারী ঢাকা স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধুর কাছে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিলেন। একদিকে যুদ্ধবিধ্বংস দেশ পুনর্গঠন শুরু হলো। অন্যদিকে লুঠপাট, দখলবাজী আর হানাহানি ছড়িয়ে পড়লো। মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দিলেও অসংখ্য অস্ত্র রয়ে যায় অপরাধীদের কাছে। ব্যক্তিগত শক্রতা, পারিবারিক শত্রুতা এবং সামাজিক শত্রুতায় অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা খুন হওয়া শুরু হয়। অবৈধ অস্ত্র দিয়ে সামাজিক অপরাধ করার মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

স্বাধীনতার পর আটঘরিয়ায় প্রথম বিবাদ শুরু হয় ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে। আটঘরিয়া থানায় একটি হাসপাতাল স্থাপনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেবোত্তর এবং আটঘরিয়া এলাকায় তুমুল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুই পক্ষ ব্যাপক তোড়জোড় এবং ধরপাকড় শুরু করে। এমন একটি সময়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে জাসদ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি জাসদের পক্ষ অবলম্বন করি। এখানে আরেকটি কথা সবার জানার জন্য বলে রাখি তাহলো মুক্তিযুদ্ধের আগে একমাত্র শহীদুল্লাহ খান বাদশা ছাড়া বাঁকী কেউ সরাসরি রাজনীতি করতেন না। স্বাধীনতার পরেও কেউ করতেন না। শহীদুল্লাহ খান বাদশা স্বাধীনতার আগে ছাত্রলীগ করতেন এবং এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদে সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পরে চাকুরী নিয়ে এলাকার বাইরে চলে যান। এদিকে স্বাধীনতার পর আমি পাবনা থেকে সাপ্তাহিক ইছামতি পত্রিকা বের করতাম এবং আমি পত্রিকার সম্পাদক ছিলাম। পাবনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে ব্যাপক কোন্দল ছিল। একপক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন মোঃ নাসিম এবং আরেক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন রফিকুল ইসলাম বকুল। আমি রফিকুল ইসলাম বকুলের পক্ষের একজন কর্মী। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে জাসদ প্রতিষ্ঠা হলে আমি ঐ দলে যোগ দেই। অন্যদিকে শহীদুল্লাহ খান বাদশা চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আটঘরিয়ায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে আটঘরিয়া থানা কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি হন আজিজুর রহমান ফনি এবং সাধারন সম্পাদক হন শহীদুল্লাহ খান বাদশা। ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন দাশুড়িয়ার মহিউদ্দিন আহম্মদ। জাসদ থেকে আটঘরিয়ায় প্রার্থী ঠিক করার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়। আমরা কয়েকজন জাসদ নেতাকর্মী আটঘরিয়ার গোকুলনগর গ্রামে আনোয়ার হোসেন রেনু’র বাড়িতে গেলাম। উনি স্বাধীনতার আগে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। সেই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। স্বাধীনের পর আবার পড়াশোনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমরা তাঁর বাড়ীতে গিয়ে নির্বাচনে জাসদ থেকে প্রার্থী করার প্রস্তাব দিলে, প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। পরে উনি বলেন যদি নমিনেশন নিশ্চিত করা হয় তাহলে সে রাজী। এরপর উনাকে নিয়ে আমি এবং উনার ভাগ্নে আলতাফ রাতেই গফুরাবাদ থেকে ট্রেনে ঢাকা রওয়ানা দেই। যথারীতি ঢাকা গিয়ে জাসদ অফিসে হাজির হলে একবাক্যে নেতারা সম্মত হয়। উনাকে প্রথম পছন্দ করার কারণ হলো উনি মুক্তিযুদ্ধকালীন আটঘরিয়া থানা কমান্ডার ছিলেন।এছাড়া মুজিববাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতে প্রশিক্ষন গ্রহনের কারনে প্রায় সব নেতাই উনাকে চিনতেন। আরেকটি কারন হলো আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঈশ্বরদী থানায় বাড়ী । সেই ক্ষেত্রে আটঘরিয়ার একমাত্র প্রার্থী হিসেবে আঞ্চলিক ভোটারের সমর্থন পাবেন। আনোয়ার হোসেন রেনু ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নমিনেশন নিশ্চিত করে আমরা আটঘরিয়ায় ফিরে এলাম।

১৯৭৩ সালের প্রথম সপ্তাহে নমিনেশন জমা দেওয়া হলো। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন মহিউদ্দিন আহম্মদ, ন্যাপের কুঁড়েঘর মার্কায় প্রার্থী হলেন আব্দুল হালিম চৌধুরী এবং জাসদের মশাল মার্কায় দাঁড়ালেন আনোয়ার হোসেন রেনু। যথারীতি নির্বাচনী প্রচারনা শুরু হলো। পরিবেশ কোন প্রার্থীর জন্যে সুখকর ছিলোনা। ঈশ্বরদীতে জাসদের কোন নেতাকর্মী বাড়িতে থাকতে পারতেন না । মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির প্রায় সব নেতা জাসদে শরীক হলেও ঈশ্বরদী থেকে সবাই পলাতক ছিলেন। আনোয়ার হোসেন রেনুর পক্ষে মুলাডুলিতে একটি জনসভা করা সম্ভব হয়েছিল। তাছাড়া আমাদের নির্বাচনী প্রচারনা আটঘরিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। নির্বাচনে আমরা আটঘরিয়ার প্রায় প্রতিটা গ্রামে গিয়েছি। খিদিরপুর, আটঘরিয়া, দেবোত্তর, একদন্ত, লক্ষীপুরে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জনসভা করেছি। জনগনের সমর্থন দেখে মনে হয়েছে আমরা জয়লাভ করবো। ৭ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আওয়ামী লীগের মহিউদ্দিন আহম্মদ নির্বাচিত হলেন । নির্বাচনের ১৪ দিন পর ২১ মার্চ রাতে আমার গ্রামের বাড়ী বেরুয়ান থেকে রক্ষীবাহিনী আমাকে আটক করে। আমাকে তাঁরা আটক করে গোকুলনগরে আনোয়ার হোসেন রেনুর বাড়িতে অভিযান চালায়। তাঁকে না পাওয়ায় আমাকে পাবনা মেন্টাল হাসপাতাল চত্বরে রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে আনা হয়। সেখানে আমার উপর অমানুষিক নির্যাতন করে ২২ মার্চ আটঘরিয়া থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। ২৩ মার্চ যোগাযোগ মন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী দেবোত্তর এসে রুপালী ব্যাংকের শাখা উদ্বোধন করেন। উপরে উল্লেখিত সেই হাসপাতাল স্থাপনের স্থান নির্ধারন নিয়ে মন্ত্রীর মধ্যস্থতায় আটঘরিয়ায় হাসপাতাল এবং দেবোত্তরে রুপালী ব্যাংক দেওয়া হয়েছিল।

২৩ মার্চ মন্ত্রীর কর্মসূচী শেষ হওয়ার পর আমাকে পাবনা জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমি জেলে যাবার ১ মাসের মধ্যে আনোয়ার হোসেন রেনুর শ্বশুর মাজপাড়া গ্রামের ডাঃ নওশের আলী, ভগ্নিপতি মকবুল খাঁ ( ল্যাব এইডের ডাঃ লুৎফর রহমানের বাবা), তাঁর ভাই মোজাম্মেল খাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে দেওয়া হয়। এর ৩/৪ মাস পরে আনোয়ার হোসেন রেনু তাঁর ৬ জন সহযোগী সহ চাটমোহর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে পাবনা জেলে আসে। আনোয়ার হোসেন রেনুর সাথে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন গোকুলনগরের আব্দুস ছাত্তার, সারুটিয়ার জহুরুল ইসলাম, মিয়াপাড়ার মিয়ার উদ্দিন সহ আরো দুইজন। ধৃত ছয়জনের মধ্যে ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম নির্বাচনে দেবোত্তর ইউনিয়নে বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় শহীদুল্লাহ খান বাদশা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অন্য চেয়ারম্যানরা হলেন, চাঁদভা ইউনিয়নে তোয়াজ উদ্দিন প্রাং, মাজপাড়ায় মফিজ উদ্দিন মন্ডল, একদন্তে আবদুল জব্বার ও লক্ষীপুর গফুর সরকার।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের আবার পরিবর্তন আসে। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় । আটঘরিয়াতেও নেতৃত্বের পালাবদল হয় । আমি এবং আনোয়ার হোসেন রেনু সহ আটক জাসদের বন্দীরা জেলখানা থেকে মুক্তি পেলাম। বিশেষ এক পরিস্থিতির কারনে আমাকে জাসদ রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে হলো। জিয়ার শাসনকালে জাসদ এবং আওয়ামী লীগ ছিল সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ দল। এই দুই দলের নেতাকর্মীরা তখন ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়। ৭৫ সালের পর আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুর রহমান ফনিকে আর্মীরা আটক করে পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে ( পাবনা ক্যাডেট কলেজ) এনে ভয়াবহ নির্যাতন করে। সেই সময়ে শামসুর রহমান শরীফ ডিলু সহ অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আটক করে নির্যাতন করা হয়েছিল। আর্মীর সেই ভয়াবহ নির্যাতনে আজিজুর রহমান ফনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে নাই। পরে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে উনি মৃত্যুবরণ করেন। সে সময়ে শহীদুল্লাহ খান বাদশা সহ অন্য নেতাকর্মীরা পলাতক থাকেন। ১৯৭৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । দেবোত্তর ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, আব্দুস সাত্তার মোল্লা, চাঁদভা থেকে ইশারত আলী, মাজপাড়া থেকে আহম্মদ আলী খান, একদন্ত থেকে রেফাজ উদ্দিন এবং লক্ষীপুর থেকে ডাঃ সিরাজুল ইসলাম। এদের মধ্যে আব্দুস সাত্তার মোল্লা স্বাধীনতার আগে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ করতেন। ডাঃ সিরাজুল ইসলাম মুসলিম লীগ করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। ইশারত আলী এবং রেফাজ উদ্দিন কোন রাজনীতি করতেন না। মাজপাড়ার আহম্মদ আলী খান জাসদ সমর্থক ছিলেন এবং উনি আমার সাথে জেলে ছিলেন। ১৯৭৮ সালে সামরিক সরকার প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ দিলে আটঘরিয়া থানা আওয়ামী লীগ পূনর্গঠন করা হয়। একদন্তের আবদুল জলিল মাষ্টার সভাপতি এবং শহীদুল্লাহ খান বাদশা সাধারণ সম্পাদক হন। ঐ একই সালে জেনারেল জিয়া বিএনপি গঠন করার সময় সাবেক এনএসএফ নেতা এডভোকেট শাজাহান আলী ও চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার মোল্লা, ইশারত আলী এবং আবদুল কুদ্দুস মোল্লা বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহনের চেষ্টা করেন । অবশেষে লক্ষীপুর ইউনিয়নের বাঐখোলা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মুন্সী সভাপতি এবং চেয়ারম্যান ইশারত আলী সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭৮ থেকে ৮০ সালের মাঝে বেশ কিছু ঘটনা আছে সেটা সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৮ সালে আমার উদ্যোগে আটঘরিয়া প্রেসক্লাব গঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের ২য় সংসদ নির্বাচনে আটঘরিয়ার অবসরপ্রাপ্ত সার্কেল অফিসার ( সিও) আজাহার আলীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাড় করানো হয়। সেই নির্বাচনে দেবোত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার মোল্লা এবং আমি সার্বক্ষনিকভাবে প্রচার অভিযানে ছিলাম। উক্ত নির্বাচনে, বিএনপি থেকে আব্দুল বারী সরদার ( ধানের শীষ), আওয়ামী লীগের শামসুর রহমান শরীফ ডিলু ( নৌকা), জাসদের লুৎফর রহমান মাষ্টার ( মশাল), ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল গফুর ( স্বতন্ত্র) নির্বাচন করেন। নির্বাচনে বিএনপির আব্দুল বারী সরদার নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে দেবোত্তর স্কুলের সভাপতি মমতাজ আলী খানকে বাদ দিয়ে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা সভাপতি নির্বাচিত হন। দেবোত্তর স্কুলকে বালিকা বিদ্যালয়ে পরিনত করে পাইলট স্কুলে পরিবর্তন করেন । এরপর থানা সদর দেবোত্তরে ছেলেদের কোন পড়াশোনার সুযোগ ছিল না। ১০ বছর পর ১৯৮৮ সালে আমার উদ্যোগে দেবোত্তর কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আরেকটি বিষয় সবার জানা দরকার ১৯৭৯ সালে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লাকে সভাপতি এবং আমাকে সহ সভাপতি নির্বাচিত করে পাট চাষী সমবায় সমিতি করা হয়েছিল। সমিতির অন্য সদস্য ছিলেন ধলেশ্বরের আজিমুদ্দিন খাঁ, বরুলিয়ার আজিজ খান, বেরুয়ানের সাদেক আলী বিশ্বাস ও তোরাব আলী, সড়াবাড়িয়ার ইউসুফ মৃধা ও আজাহার আলী মৃধা ও কয়রাবাড়ীর নূর মোহাম্মদ। আমাদের নিজস্ব তহবিলের সাথে ব্যাংক একটি বড় অংকের টাকা ঋন দেয়। আনন্দ এবং দুঃখের ইতিহাস হলো উক্ত সমিতি বাংলাদেশের পাট মন্ত্রনালয় থেকে শ্রেষ্ঠ সমিতির স্বীকৃতি পেয়েছিলো । তাঁর পুরস্কার হিসেবে সমিতির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস মোল্লাকে সরকারী খরচে দক্ষিণ কোরিয়া সফর করানো হয়েছিল। দুঃখের বিষয় দুই বছরের মধ্যে সমিতির সভাপতি বনাম বাঁকী সদস্যদের দ্বন্দ্ব নিয়ে মামলা মোকর্দ্দমা হয়ে জেল হাজতের মধ্যে দিয়ে মডেল সমিতিটির বিলুপ্তি ঘটে।

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সময়কালে আটঘরিয়ার রাজনীতিতে আরেক দফা চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটে। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহন করেন। ৮৩ সালে আটঘরিয়া থানা থেকে উপজেলায় উন্নীত হয়। প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগ দেন মোজাফফর রহমান চৌধুরী । ১৯৮৩/৮৪ সালে আটঘরিয়া উপজেলায় নুতন অফিস আদালত স্থাপন নিয়ে দেবোত্তর ও আটঘরিয়ার মধ্যে আরেক দফা দলাদলি হয় । শেষে উপজেলা পরিষদ কার্যালয় দেবোত্তরে স্থাপিত হয়। এরশাদ শাসনামলে আটঘরিয়ার রাজনীতিতে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। স্বাধীনতার পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুল্লাহ খান বাদশা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ইশারত আলী জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। এরপর আটঘরিয়া উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন ইশারত আলী এবং সাধারন সম্পাদক হন শহীদুল্লাহ খান বাদশা। এরশাদ সরকারের সময়ে বিএনপির দুঃসময়ে দলের হাল ধরেন চাঁদভা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল হক। একসময় একদন্ত ইউনিয়নের ডেঙ্গারগ্রামের এড. শাহজাহান আলী পাবনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ইশারত আলী। ১৯৯০ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন রেনু উপজেলা চেয়ারম্যান হন। দুইবারই আমার ভাই কামরুল ইসলাম ফুটু প্রতিদ্বন্ধিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন খায়রুজ্জামান বাবু ( লাঙ্গল), আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন শামসুর রহমান শরীফ ডিলু ( নৌকা), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন মাওলানা নাসির উদ্দিন ( দাঁড়িপাল্লা) এবং জাসদ রব গ্রুপের প্রার্থী ছিলেন পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস ( মশাল)। বিএনপি উক্ত নির্বাচন বয়কট করেছিল । যথারীতি নির্বাচনের দিনে ঈশ্বরদীর কয়েকটি কেন্দ্রে গোলযোগ হলে ঐসব কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায় । অমিমাংসিত ফলাফলে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা নাসির উদ্দিন সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন । নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন, আওয়ামী লীগের শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। জাসদের পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস তৃতীয় এবং জাতীয় পার্টির খায়রুজ্জামান বাবু ছিলেন ৪র্থ অবস্থানে। স্থগিত কেন্দ্রে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে মাওলানা নাসির উদ্দিনের বিজয় ছিল নিশ্চিত। স্থগিত কেন্দ্রের সমস্ত ভোট জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হলেও তাঁকে জেতানো সম্ভব ছিলোনা। পরবর্তী সময়ে অদৃশ্য শক্তির কারসাজিতে ভোট নামক প্রহসনে সমস্ত ভোট কেটে পাঞ্জাব আলী বিশ্বাসকে দিয়ে বিজয়ী করা হয়েছিল। আইনগত সেটা বিজয় হলেও নৈতিকভাবে সে বিজয় হলো প্রশ্নবিদ্ধ। সেই সংসদ ১ বছর কয়েক মাস বহাল ছিল। পুনরায় ১৯৮৮ সালে আবার নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টির মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন । তিনিও ছিলেন ১ বছর কয়েক মাসের এমপি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ১৯৭৩ সালের এমপি মহিউদ্দিন আহম্মদ, ১৯৭৯ সালের এমপি আব্দুল বারী সরদার, ১৯৮৬ সালের এমপি পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস, ১৯৮৮ সালের এমপি মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস দেড়/দুই বছর এমপি ছিলেন। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৫ দিনের এমপি আছেন। আইনে তাঁরাও বৈধ এমপি। আমার এক পরিচিত বন্ধু ১৫ দিনের এমপি হওয়ায় লজ্জায় কখনো সাবেক এমপি লেখেন না। আমাদের দেশে রাজনীতির ইতিহাসে দুঃখজনক আরেকটি অধ্যায় হলো পদ-পদবী এমনকি ক্ষমতার লোভে নেতাদের দলবদল আর নীতি বদলের ঘটনা। আমাদের আটঘরিয়ার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের একাধিকবার দলবদল করার নজির আছে। এমন নেতা আছেন যিনি ২ বছরে ৪ বার দল বদল করেছেন ।

উল্লেখ্য এরশাদ সরকারের সময় শহীদুল্লাহ খান বাদশা জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলে তাঁর ভাগ্নে এডভোকেট আব্দুল হান্নান শেলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম রতন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অনুরূপ এরশাদ সরকারের সময় ইশারত আলী বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা চাঁদভা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল হক বিএনপির সভাপতি হন। সাধারণ সম্পাদক হন একদন্ত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউল হক রানা। আমার জানামতে বিএনপিতে কোন একসময় বেরুয়ান গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আলী বিশ্বাস সভাপতি ছিলেন। আটঘরিয়ায় রাজনীতিতে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা এবং শহিদুল ইসলাম রতন এর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এই কমিটি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি শহিদুল ইসলাম রতন এবং সাধারন সম্পাদক আব্দুল গফুর মিয়া নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালে সাবেক সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা মৃত্যুবরন করেন। আরেকটি তথ্য যোগ করতে চাই, মুক্তিযুদ্ধের সময় আটঘরিয়ায় অঞ্চলে দায়িত্ব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার চাটমোহরের ইসাহাক আলী ওরফে এম,আই চৌধুরী স্বাধীনতার চারদিন পর ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর কতিপয় মুক্তিযোদ্ধার হাতে ৩ ভাই ও ভগ্নিপতি সহ খুন হন। ১৯৭৪ সালে ঈশ্বরদীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ওয়াছেব আলী প্রতিপক্ষ দলের হাতে খুন হন। ১৯৭৬ সালে আটঘরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মন্তাজ আলী অজ্ঞাত ব্যক্তিদের হাতে মালিগাছায় খুন হন।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন হলে আটঘরিয়া উপজেলায় আবারও নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচন নিয়ে একটি তথ্য উপস্থাপন করি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে হাবিবুর রহমান হাবিবকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল। উক্ত নির্বাচনে বিএনপির সিরাজুল ইসলাম সিরাজ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঐ নির্বাচনে আরেকটি চমক ছিল, জাসদ ইনু গ্রুপ থেকে মশাল মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন আজকের দেশখ্যাত চিকিৎসক ল্যাব এইড হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জন ডাঃ লুৎফর রহমান। ৯১ এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ থেকে হাবিবুর রহমান হাবিব বিএনপিতে যোগ দেন। ৯৬ সালের নির্বাচনে শামসুর রহমান শরীফ আওয়ামী লীগের নমিনেশন ফিরে পান। নির্বাচনে প্রথমবারের মত এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে মোট ৫ বার এমপি হয়েছেন । ২০১৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ৫ বছরের অধিককাল মন্ত্রী ছিলেন। এই মহান নেতা গত কয়েকদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ উনার বিদেহী আত্মাকে শান্তিতে রাখুন। উনাকে জান্নাত নসিব করুন। আগামী শত বছরে উনার মত আর কোন ভাগ্যবান নেতা জন্ম হবে কিনা জানিনা। যিনি ৫ বার এমপি হবেন আর ৫ বছর মন্ত্রী থাকবেন।

আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়া লেখার শেষ কথায় আমার কথা বলে সমাপ্ত করবো। আমি ১৯৭৫ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতি থেকে দুরে ছিলাম। ২০০৬ সালের ২৮ মে থেকে আবারো আমি আমার ভগ্নপ্রায় দলটির সাথে জড়িয়ে পড়েছি। ১৪ বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে রাজনীতি শুরু করেছি। রাজনীতি করতে গিয়ে জেলজুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনো কোন নির্বাচনে অংশ নেইনি। জীবনে নির্বাচন করবো এমন আশা এখনো করিনা। আরেকটি অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করতে চাই আমি যখন ৭ম শ্রেণীতে পড়ি তখন স্কুল বার্ষিকীর জন্য কবিতা লিখেছিলাম ” ভাগ্য বিড়ম্বনা “। মনে ছিল কত আশা – থাকিবো একসনে, খেলিবো দু’জনে – পারিনি তাহা ভাগ্যের দোষে এসেছিল সব ছদ্মবেশে। এটাই জীবনের প্রথম লেখা। আর শেষ লেখা হলো আজকে আমার স্মৃতিতে আটঘরিয়া। জীবনের সব লেখা একত্রিত করলে হয়তো শতখানা বই হতো। আজকের যুগে আমি সেই লেখক যার লেখা কোন বই প্রকাশ হয়নি। হয়তো একদিন কেউ বলবে, যার লেখা কোন বই নাই – সে লেখক হয় কি করে? রাজনীতি নিয়ে এমনি কথা কেউ বলতে পারে – যে চেয়ারম্যান, মেম্বার বা এমপি হতে পারেনি, যে ব্যক্তি নির্বাচন করে নাই সে রাজনীতিবীদ হয় কেমন করে? যাই হোক দীর্ঘদিনের ঘটনা দীর্ঘ আকারে প্রকাশ করতে গিয়ে ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতে পারে। অনেক বিষয় হয়তো উল্লেখ করা যায়নি। অনেক বিষয়ে অনেকের নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি। আবার অনেক বিষয়ে সঠিক ইতিহাস বা ঘটনাটুকু বলতে চেয়েছি। প্রতিহিংসায় কাউকে ছোট করতে চাইনি। জ্ঞানতঃ মিথ্যাভাবে কোন ঘটনা উপস্থাপন করি নাই। আমার লেখায় কিছু বাদ পড়লে কিংবা ভুল করলে নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে সঠিকভাবে আবার কেউ তুলে ধরবেন। মনের অব্যক্ত অনেক কথা সবার সামনে তুলে ধরতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। আমার জন্মভূমি – আমার পূন্যভূমি ৯২ বছরের আটঘরিয়া দিন দিন বেড়ে উঠছে আর ৬৭ বছর বয়সী আমি দিন দিন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছি।
( সমাপ্তি)

লেখক পরিচিতি –

আমিরুল ইসলাম রাঙা
প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন সদস্য
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব
পাবনা।
৩ মে ২০২০