প্রধান মেনু

ইবলিস আদমকে সিজদা করল না কেন

হাদিস বলছে ‘ইন্নাল্লাহা খালকা আদামা আলা সুরাতিহি’ অর্থাৎ সৃষ্টি করিয়াছেন প্রভু আদমকে তাহার আপন সুরাতে। অর্থ এই যে আলমে মেসলে (উপমার জগতে) আদমের যে সুরাত ছিল তা খোদার সেফাত থেকে। খোদা কথা বলেন, দেখেন, শুনেন, ধরেন এবং আরশে অবস্থান করেন। এসব চিন্তা করলে একটি মানুষ আকার চিন্তায় আসে না কি? নিশ্চয়ই আসে।

যখন আদমের মধ্যে এসব চিন্তাগুণ পাওয়া যায় তখন বুঝতে হবে যে তা খোদা থেকে প্রাপ্ত। বাস্তবিক আদমের কোনো গুণ নেই। আদম সেই পরমার্থেরই মেসাল হয়ে মেসাল যে আলমে মেসালে ছিল যার নাম বাতেনি আদম। সেই রূপই এক উপমামণ্ডিত হয়ে আলমে নাছুতে সৃষ্টি হয়েছে, যার নাম প্রকাশ্য আদম। পূর্বে আদমের মধ্য হতেই আলমে মেসালে সেই রূপ ক্ষীণ আকারে স্ত্রী রূপে এক ওজুদ তৈয়ার হইল যার নাম হাওয়া। এ দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই অংশ বটে।

কিন্তু রূপে প্রথমটি হইতে এটি অধিক হইল কারণ আদম যখন সম্পূর্ণ গুণের অধিকারী হইয়া ছিল তখন তারই মধ্যে হইতে লইয়া এক উজ্জ্বল নমুনা কায়েম করা হইল। কাজেই মনমুগ্ধকর অধিক হইল এবং সেই বিশ্বব্যাপী অস্তিত্ব প্রকাশের মাত্রাও ওই খানে অধিক পরিমাণে দেখা গেল।

দ্বিতীয় সুরাত যখন অতি জাঁকজমক আনন্দদায়ক এবং মনমুগ্ধকর আকারে প্রকাশ হইল তখন আদম বেহেশত রূপে গ্রহণ করিল। খোদা আদেশ করিলেন সর্ব প্রকার আরাম ইহা হইতে গ্রহণ করিবে কিন্তু ওই বেহেশতে যে এক রকম ফলদায়ক বৃক্ষ আছে তাহার নিকট যাইবে না। আর বেশি বলিতে চাই না।

খোদা যদি উৎকৃষ্ট রূপে দেখা যায় তাহা হইলে আহছানে তাকভিমের চেয়ে শ্রেষ্ট রূপে আর দেখা যাইতে পারে না। কারণ ওই আয়াতে বোঝা যায় যে, আল্লাহর সৃষ্টিত পদার্থের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রূপই ইনছান সাব্যস্ত হইল। উহার ওপরে কোনো রূপ হইতে পারে না। উহার ওপরে রূপশূন্য তাই শূন্যতা অনুভব হয় না। এক নিরাকার অবস্থায় যাহা চিন্তায় আসে না আমার সঙ্গে তাহার কি সম্বন্ধ তাহা চিন্তা গোচর নহে। এখন বুঝিবার বিষয় এই যে ইনছানের ওপর শিক্ষণীয় কিছুই নহে।

কাজেই বুঝিতে হইবে যে ইনছান প্রধান জিনিস, ওই জিনিসটি শুধু দেহ নহে উহার পূর্ণ গুণ লইয়া গঠিত হইয়াছে। তাহার গুণ কী? উহার গুণ উলুহিয়াত (ঐশ্বরিক গুণ) যাহা কোরআনে আসিয়াছে। ‘না ফাক তো ফিহেমের রুহ’ অর্থাৎ আদমের মধ্যে আমার রুহ হইতে ফুঁকিয়া দিলাম।

ইহাতে বোঝা যায় যে আসল হইতে কিঞ্চিত দিলেন। যাহাতে আদম জীবিত হইল, যেমন এক বৃহৎ আলো হইতে সামান্য অগ্নি লইয়া অন্য প্রদীপে জ্বালানো হয় ওই ক্ষুদ্র প্রদিপ আলো হইল। ‘আ বাদশাহে আজম দাস্তোবুদ মহকম পুশিদ্যা দালকে আদম নাগাহ বরবারে আমাদ’ অর্থাৎ আল্লাহ ওই সময় ফেরেশতাগণকে সেজদা করিতে বলিলেন, ইবলিস সেজদা করিয়াছিল না। তাহার সেজদা না করিবার কারণ ছিল এই যে সে খোদার জবরদস্ত আশেক।

সে মাশুকের জন্য যাহা নির্ধারিত করিয়া রাখিয়া ছিল তাহা সে অন্য কাহাকেও (আদমকে) দিতে রাজি ছিল না। যদিও তাহার সর্বস্য নাই হইয়া যাক তবুও সে প্রেমের অনুরাগে সেজদা করিতে প্রস্তুত ছিল না। বজে হলে এক্সে খবত সেজদায়ে আদমনামি গঞ্জাদ, মিঞানে আশেকো মাশুক ছায়াহাম নামি গঞ্জাদ। অর্থাৎ প্রেমের আইন অনুসারে আদমের সেজদার এক উন্মাদনা সদৃশ্য কার্য ছাড়া আর কিছুই হয় কি?

কারণ প্রেমিক ও পেমাস্পদের মধ্যে ছায়া একটি কণ্টকবিশেষ কাজেই ইবলিশের মতো জবরদস্ত আশেক যে সাততলা আসমান জমিন সেজদা করিয়া ভরিয়া ফেলিয়াছিল সুচ পরিমাণ স্থানও বাকি ছিল না, সে নিজের মাহবুবকে ছাড়িয়া আদমকে কি করিয়া সেজদা করিতে পারে?

আদমকে ওই জাতেপাক আসন বানাইল যথা ‘কোলুবিল মুমিনিনা আরশুল্লাহি তায়ালা’ অর্থাৎ মুমিনের দিল আল্লাহর আরশ। ওই অবস্থা হইতে ইবলিশ যাহাতে আদমের আওলাদকে নিুস্তরে নিক্ষেপ করিতে পারে তাহার আদেশ খোদার নিকট হইতে চাহিয়া লইল। যদি ইবলিশ আদমের আওলাদকে অসৎ পথে ধাবিত করিয়া কলুষিত করিতে পারে তাহা হইলে পাক জাতের আপন আর থাকে না। নিজের আপন বানাইয়া যথা ইচ্ছা তথায় লইয়া যাইতে পারে এমনকি চিতায় জাহান্নামে নিয়া নিক্ষেপ করিতে পারে।

শয়তান আদমের সন্তানকে কুপথে ধাবিত করিবার এবং তাহাকে নিজের আপন বানাইবার ক্ষমতা লইল বটে কিন্তু খোদা আবার বলিলেন তুমি গুরুতর ক্ষমতা লইলা বটে কার্য ক্ষেত্রে যাইয়া দেখ আদমের সন্তানগণের মধ্যে এমনও আমার খালেছ বান্দা আছে যাহাকে তুমি বিন্দুমাত্র সরাইতে পারিবে না।

যথা কোরআনে আসিয়াছে ‘লাইছা লাহু মোলতানুল আলাল মোখলেছিনা’ অর্থাৎ আমার খালেস বান্দার ওপরে সে জয়ী হইতে পারিবে না। তখন ইবলিশ বলিল বেশ যাহাকে পারি তাহাকে কী করিব? তখন খোদা বলিল সেখাসে সে জানে আর তুমি জান। তখন ইবলিশ বলিল আমি তাহাকে কিছুতেই তোমার নিকট আসিতে দিব না। খোদাও সম্মত হইল এবং বলিল যে খালেছ নয় কৃত্রিম এবং ভণ্ড তাহাকে তুমি কিছুতেই আসিতে দিও না আবার খোদা বলিল আমি দয়ালু এবং দাতা, তুমি যদি না আসিতে দাও তাহা হইলে দোষ নিন্দা তো লোকে আমার দিকে ফেলিবে তখন ইবলিশ বলিল মাহবুব যদিও তোমার হুকুম অমান্য করিয়াছি তবুও তোমার ভালোবাসাকে প্রাণ হইতে ত্যাগ করিতে পারি নাই।

যত নিন্দা যত দোষ, তুমি পাক থাকিয়া এ গোলামের ঘাড়ে ছাড় যদিও লাঞ্ছনা ভোগ করিয়াছি আরও লাঞ্ছনা নিন্দা আমি উঠাইতে তৈয়ার আছি, কিন্তু মাহবুব যাহাতে নিন্দনীয় না হয় সে জন্য প্রস্তুত আছি। সচরাচর কে তাহার হেরেমে কিবরিয়ায়ীতে ঢুকিতে না দিবার কারণ এই যে তাহা হইলে ওই দরবারের কদর এবং মান মর্যাদা থাকে না আল্লাহর রাস্তায় পয়গম্বর পীর আউলিয়াগণ এত যে রেয়াজত মোশাক্কাত করিয়া তাহার দরবার পাইবার অধিকার হইয়াছে তাহারও কোনো মূল্য থাকে না।

কৃত্রিম অকৃত্রিমের কোনো পরিচয় থাকে না। ভালোবাসা না বাসা, মুমিন, কাফের, মোনাফেক কিছুর মধ্যেই কিছুর প্রভেদ থাকে না। কাজেই শয়তানের ঘাট এড়াইতে পারিলে সে মানুষ। খোদা বলিতেছে হে আমার বান্দাগণ যদি খালেছ হইয়া আমার নৈকট্য লাভ করিতে চাও তাহা হইলে চেষ্টা কর মোজাহেদা কর। শয়তানের সঙ্গে জেহাদ ঘোষণা কর। যাহা কোরআনে আসিয়াছে। যাহেদু ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় জয়ী হইবার জন্য চেষ্টা কর। ‘লা তাকনাতু মির রহমাতিল্লাহ’ আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ হইও না। শয়তানের ওপর খেয়াল কর আমি তোমার সাহায্য করিব।

লেখক : মাওলানা আবুল হাসান আবদুল কুদ্দুস, ইমাম জয়নাল আবদীনের ৩৮তম বংশধর। ১৯৫৪ সালে লেখা তার ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে এ লেখাটুকু সংগ্রহ করেছেন তার মুরিদ শেখ আবদুল খালেক ইবনে তালেব।

অনুবাদকের প্রাচীন ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।