প্রধান মেনু

করোনা কালের জীবন ধারা- ৪৮

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলা বিহার উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ১৮১ বছর পর বিশিষ্ট নাট্যকার শচীন সেন গুপ্ত ১৯৩৮ সালে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাটক রচনা করেন। পলাশী যুদ্ধের দিনকয়েক আগে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মুখ দিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। তার শ্যামল প্রান্তরে আজ রক্তের আলপনা। জাতির সৌভাগ্য সূর্য আজ অস্তচলগামী। শুধু সুপ্ত সন্তান শিয়রে রোদুদ্যমান জননী নিশাবসানের অপেক্ষায় প্রহর গণনায় রত। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে, কে শোনাবে জীবন দিয়েও রোধ করবো মরণের অভিযান।’
এই দীর্ঘ সংলাপটি বাংলার মানুষের মর্মমূলে আজো অবিরত ক্ষত সৃষ্টি করে চলেছে। বৈশি^ক করোনাভাইরাসের কবলে পড়ে বিনা চিকিৎসায় লাখো লাখো মানুষ অকাতরে নিজেদের অমূল্য জীবন বিসর্জন দিলেও তার কোন প্রতিকারের পথ এ পর্যন্ত কোন দেশই আবিষ্কার করতে পারেনি। বিশে^র অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ৮ মার্চ তারিখে অদৃশ্য শক্তিধর মারণব্যাধী করোনাভাইরাস আক্রমণ করার পর থেকে এপর্যন্ত ২ হাজার ৭০৯ জন মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন এবং প্রতিদিনই প্রাণহাণির ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু তার কোন প্রতিকার বা প্রতিরোধের পথ খোলা নেই। এর কোন প্রতিষেধক নেই নেই কোন প্রতিকারের ব্যবস্থা। সারা বিশ^ যেন আজ থমকে গেছে। থমকে গেছে বাংলাদেশ।
বিশ^ সাস্থ সংস্থা হু বলেছে করোনাভাইরাস থেকে পুরোপুরি মুক্তি হয়তো আর কোনদিনই মিলবেনা। গত ১৪ মে বিবিসি এমন আশঙ্কার খবর প্রচার করেছে। বিবিসির খবর অনুযায়ী তাই গোটা বিশ^কে এই রোগটির সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচা শিখতে হবে বলে জানিয়েছে ওই সংস্থাটি। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি নির্দেশক মাইকেল রায়ান বলেছেন, ‘‘ এই প্রথমবার একেবারে নতুন একটি ভাইরাস মানুষের শরীরে বাসা বেধেছে, প্রবেশ করেছে। তাই এর থেকে এখনই যে রেহাই পাবো তার ঠিক নেই বা কবে বিজয়ী হবো তার অনুমান করাও কঠিন।’’ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, এই মহামারি দীর্ঘায়ীত হবে যা, তিন চার বছর ও থাকতে পারে। এই কথা বলে তিনি সামালোচিত হয়েছিলেন।
এই খবর প্রচারের পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে। তবে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কোন সময়ই আশার কথা শুনিয়েছে। তিনি বরাবর জাতীকে সাহস যুগিয়ে আসছেন। প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের হাত থেকে দেশবাশীকে রক্ষার জন্য হেন কোন পথ ও পন্থা নেই যা তিনি অবলম্বন করেননি। লকডাউন, জোনে বিভাজন পূর্বক লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেসনসহ মানুষের অভাবের দিনে খাদ্য-দ্রব্য ও নগদ অর্থ সহায়তা তিনি করেছেন। করোনাকালেই মানুষ আমফানের কবলে পড়ে বহুমাত্রিক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মখিন হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তা কঠোর হস্তে মোকাবিলা করেছেন। সেসময় সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে লাখ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থান করে দেওয়াসহ তাদের মুখে আহার তুলে দেওয়া এবং আমফান পরবর্তী পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা এসবই তিনি করেছেন। এরই মাঝে নতুন করে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ এর মত দেশের প্রায় ১৩ টি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রতিবেশি বন্ধু রাষ্ট্র ভারত, বাংলাদেশের উজানের গজলডোরের সবকটি গেট খুলে দেওয়ায় প্রবল ¯্রােত ও পানি এবং তার সাথে উজানের ঢল ও ভারি বর্ষণে দেশের সব নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। নিজেদের অতি আদরের বাসস্থান ছেড়ে নিরূপায় হয়ে গবাদি পশুসহ বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রসহ নিরাপদ স্থানে ঠাঁই করে নিয়েছে। বানের পানিতে ভেসে গেছে রাস্তাঘাট ও হাজার হাজার মাছের খামার। অনেক জেলায় বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ। ডুবে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ক্ষেত- খামার ও ধানের বীজতলা। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে দুর্গত এলাকার মানুষ।আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে।
ভৌগলিক অবস্থান, ভূতাত্তিক গঠন ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বাংলাদেশ বিশে^র সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এদেশের মধ্য দিয়ে ছোট বড় প্রায় ২শ ৩০ টি নদী বয়ে গেছে। মূলত এজন্যই অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বাংলাদেশে বন্যার প্রকোপ বেশি। তাছাড়া বাংলাদেশে উজানে ভারত কর্তৃক গঙ্গা বা পদ্মা নদীর উপর পশ্চিম বঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় ১৯৬১ সালে ৭ হাজার ৩শ ৫০ ফুট ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ পূর্বক ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল হতে তা চালু করার ফলে বাংলাদেশে পানি সমস্যাসহ অকাল বন্যা দেখো দেয়।
বন্যার পাশাপাশি বলতে গেলে নদী ভাঙ্গন একটি চিরাচরিত নিয়ম। এদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ড নামে একটি বোর্ড আছে। এই বোর্ড সারা বছর কি কাজ করে তা স্পষ্ট-স্পষ্টি প্রতিয়মান না হলেও বন্যার সময় নদী ভাঙ্গন শুরু হলে হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রে বিির্ণত রাবনের মধ্যম ভ্রাতা যিনি ৬ মাস ঘুমাতেন এ্ং ৬ মাস জেগে থাকতেন। ঘুম থেকে জাগাতে হলে তার কানের কাছে ঢাক- ঢোলসহ বিভিন্ন ধ্বনির ব্যবস্থা করতে হতো। ঘুম থেকে জেগে উঠার পর সামনে যা পেতো তাই ভক্ষণ করতো। ‘কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জেগে উঠার মত ’ জেগে উঠে তারা পানির মধ্যে বালির বস্তা ফেলা শুরু করে। এই কাজকি জরিপের মাধ্যমে পরীক্ষা –নীরিক্ষা করে শুষ্ক মৌসুমে করা যায়না? পরিকল্পিতভাবে নদী শাসনের ব্যবস্থা করলে প্রতিবছরই কেন মানুষ নদী ভাঙনের কবলে পড়ে নিজেদের বসতবাড়ি নদীতে বিসর্জন দিবে? আামাদের দেশে ক্যাসিনো কান্ড, বালিশ কান্ড, পর্দা কান্ড এবং করোনা সার্টিফিকেট কান্ডের মত খর¯্রােতা নদীতে বালির বস্তা নিক্ষেপে তেমন কোন কান্ড ঘটেনাতো?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বন্যা উপদ্রুত এলাকায় দুর্দশায় পড়া মানুষের জন্য ত্রানের যেন ঘাটতি না হয় সে ব্যবস্থা রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি গত ২০ জুলাই মন্ত্রীসভার বৈঠকে এ নিদের্শনা দেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সচিবালয় থেকে যোগ দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরা। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে একথা জানান মন্ত্রী পরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম্। মন্ত্রী পরিষদ সচিব জানান, মন্ত্রীসভায় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কোন ভাবেই মানুষের যেন ক্ষতি না হয় এবং রিলিফের যেন কোন ঘাটতি না হয় সে বিষয়ে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। (সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২১ জুলাই-২০২০)। করোনাকালের জীবন ধারায় ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’ এর মত ’ চেপে বসা বন্যা দুর্যোগের ঘনঘটা অচিরেই বিলীন হয়ে আবার নতুন সুর্য হাসবে। শান্তির সুবাতাস আবার আগের মতই বইবে আমাদের স্বাধীন বাংলায়। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।