প্রধান মেনু

করোনা কালের জীবন ধারা (৫)

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে যেহেতু বলা হয়েছে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই রোগ হওয়ার আগেই ব্যারিকেড দিতে হবে। তারা একমত পোষন করেন যে, মানুষকে ঘরে রাখতে আ্যাকশনে যাওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস যেখানে ছড়িয়েছে সেইসকল দেশ থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশিরা যদি কোয়ারেন্টাইনে না যান তাহলে তাদের জেল ও জরিমানা কার হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক ঢাকায় আয়োজিত সংবাদ সন্মেলনে এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ঢাকাসহ প্রত্যেকটি জেলায় হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। আমাদের চিকিৎসক ও নার্সদের রেডি রাখা হয়েছে। আমাদের যে কমিটি আছে জাতীয়কমিটি, জেলা-উপজেলা কমিটি খুবই তৎপর এবং তারা ভালো কাজ করছে। বিদেশ থেকে যারাই আসছে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখছে এবং নজরদারি চালাচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন এই মন্তব্য করছেন তখনই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে দিল্লিতে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার পর কিছু শিক্ষার্থি বাংলাদেশে ফিরেছেন। সেদিন বিকেল তিনটের সময় ইন্ডিগোর একটি ফ্লাইট ওই যাত্রিদের নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তারপর ঐ যাত্রিরা বাড়ি চলে যান। তার আগে সকালে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে তাদের বিদায় জানান ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহম্মদ ইমরান। শিক্ষার্থিরা বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহযোগিতা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য দিল্লি ও বেজিং দুতাবাসের আধিকারিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অপর দিকে ইটালি থেকে এমিরেটস এয়ার লাইন্সের ফ্লাইটে আসা ১২৬ জন যাত্রিকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য আশকোনা হজক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৪২ জন যাত্রি নিয়ে ঢাকায় আসে এমিরেটসের সেই ফ্লাইটটি। অন্য যাত্রিরা দুবাই থেকে সেই ফ্লাইটে ওঠেন। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ল আশকোনা হজ ক্যাম্পে তৈরি কোয়ারেন্টাইনে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় ইটালি ফেরত কিছু যাত্রি বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা চেচামেচি শুরু করে দেন। এমনকি জোরপুর্বক বাইরে বেরিয়ে যাবারও চেষ্টা করে। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রবল উত্তেজনা ছড়ায়। ইটালি ফেরত বাংলাদেশি ও তাদের আত্মীয়রা অব্যভস্থার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করে। পরিস্থিতি এমন নাজুক যে সেখানে সেনা মোতায়েন করতে হয়। প্রশাসনের অভিযোগ , পরিবারের অন্য সদস্য ও দেশের মানুষের স্বার্থে বিদেশ থেকে আসা মানুষদের কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সদ্য ইটালি থেকে আসা ১৪২জন সেআ সরকারি নির্দেশ মেনে চলতে রাজি হয়নি। বলতে গেলে গন্ডগোলের সুচনা এখান থেকেই শুরু হয়েছে। করোনাভাইরাসকে যেন জামাই আদরে আহবান করে নিয়ে আসা হয়েছে। গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে ‘ছেড়ে দিয়ে তেড়ে ধরা।’ এখন হায় হায় করা ছাড়া আর কিছু করার নাই।
বিশেষজ্ঞরা প্রথম থেকেই সাবধান বাণি উচ্চারণ করে আসছিলেন যে, বহির্বিশ^ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সকল প্রকার পথ বন্ধ করে দিতে হবে। যাতে করে করোনাভাইরসে সংক্রমিত কোন ব্যক্তি এদেশে প্রবেশ করতে না পারে। অবশেষে সেটা করা হলেও বাংদেশে করোনার আক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি। প্রাণঘাতি এই করোনা ভাইরাস ব্যাধি ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সর্বপ্রথম চীন দেশের হুপেই প্রদেশের উহান নগরিতে সনাক্ত করা হয়। ২০২০ সালের ১১ মার্চ তারিখে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ব্যাধিটিকে একটি বৈশি^ক মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশ করোনা প্রতিরোধের জন্য যথেস্ট সময় হাতে পেয়েছিলো। কিন্তু কি করতে কি হয়ে গেলো সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই করোনা বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করে দানবিয় কায়দায় একেরপর এক আক্রমণ করে চলেছে।
করোনাভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার একমাত্র উপায় হলো সঙ্গ নিরোধ বা সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা। যারা সুস্থ্য আছে তাদের জন্য এটাই উত্তম দাওয়াই। কিন্তু বাঙালি সন্তান কিছুতেই যেন ঘরে থাকতে চায়না। বাইরে না বেরুলে যেন পেটের ভাত হজমই হয়না। এদেশের অধিকাংশ মানুষ বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে থাকতে ভালোবাসে। চায়ের দোকান যেন প্রাণের দোকান । সকাল থেকে গভির রাত অবধি চায়ের দোকানে মানুষ গিজগিজ করে। কি আলাপ আলোচনা হয়না সেখানে। দেশ-বিদেশের রাজ নীতি, অর্থ নীতি, সমাজ নীতি, পরনিন্দা-পরচর্চার যেন সুতিকাগার চায়ের দোকান। এছাড়া রাস্তাপথে- বাজার-ঘাটে প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে মানুষের ভিড়। সামজিক দুরত্ব বা ব্যক্তি দুরত্ব বজায় রাখার কথা বল্লেই নানা অজুহাত। স্বাভাবিক নিয়মে মানুষের দুহাত। কিন্তু গায়েবি আরেকটি হাত রয়েছে যার নাম অজুহাত। আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন যাই বলা হোকনা কেন। শ^তস্ফুর্তভাবে তা বলতে গেলে কেউই রাজি নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুকে কে একজন আগাম খবর দিয়ে বলেছেন ২০৫০ সালের একজন ছাত্র তার মায়ের পাশে বসে বই পড়ছে, বইয়ে লেখা, জানা যায়! ‘২০২০ সালের দিকে শুধুমাত্র বাইরে ঘোরাঘুরি আর বাজার করার কারণে নাকি করোনাভাইরাস রোগের আক্রমণে একটি জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো।’ খোদা না করুন তেমনটা যেন আমাদের দেশে না হয়। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।