প্রধান মেনু

করোনা কালের জীবন ধারা ৬৬

এবাদত আলী
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে তৎকালিন পুর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দারা পাকিস্তানি হায়েনা সৈনিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুর্য উদিত হয়।
সুদীর্ঘ প্রায় ৪৯ বছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। তা হলো করোনা যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য নেতৃত্বদানকারি হলেন বাঙালি জাতির কান্ডারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকা পাকিস্তানিদের নারকীয় গণহত্যা এবং সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর তুলে ধরা হতো। মুক্তিযুদ্ধের শরুতেই ২৫ এর কাল রাতে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী দি পিপল পত্রিকা অফিসে আক্রমণ করে এবং কর্মরত ৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করে। ২৬ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক এবং ২৮ মার্চ দৈনিক সংবাদ পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
২৫ মার্চ সার্সলাইট নামক গণহত্যার খবর যাতে দেশ বিদেশে প্রচার হতে না পারে সেজন্য পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় হোটেল কন্টিনেন্টালে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের আটক করে। এদের মধ্যে লন্ডনের দি ডেইলী টেলিগ্রাফ এর সাংবাদিক সায়মনড্রিং এবং এসোসিয়েট প্রেসের ফটোগ্রাফার মাইকেল লরেন্ট আটক এড়াতে হোটেলের ছাদে আশ্রয় গহণ করেন। পরে তারা সারা ঢাকা ঘুরে ঘুরে পাকিস্তানি বর্বরতা-নৃশংসতার ছবি তোলেন যা পরবর্তীতে পত্রিকায় প্রকাশ করে বিশ^ বাসীকে পাকিস্তানি বর্বরতার খবর জানায়। এসময় চীনা পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ইয়াহিয়া খানকে চেঙ্গিস খানের সাথে তুলনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রণাঙ্গনের বিভিন্ন খবারখবর পরিবেশন করে বিশেষ ভুমিকা রাখে দলিল উদ্দিন ও ম, জয়নুল আবেদীন (দঃ জঃ) সম্পাদিত “ জয় বাংলা” পত্রিকা। আরো কিছুসংখ্যক পত্র-পত্রিকা প্রকাশের ও খবর জানা যায়।
কিন্তু ২০২০ সালের করোনাযুদ্ধে অন্যান্য সেক্টরের মত সংবাদ পত্র ও সাংবাদিকদের প্রতি নজিরবীহিন কালো ছায়া নেমে আসে। কথায় বলে ‘‘ আাঁধার ঘরে সাপ তো সকল ঘরেই সাপ” এমনি অবস্থার মধ্যে পড়ে দেশের পত্র-পত্রিকা। গত ৮ মার্চ থেকে বাংরাদেশে করোনাভাইরাসের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করতে থাকে। যেহেতু রোগটি ছোঁয়াচে তাই পত্র-পত্রিকা ছাপা হবার পর ছাপাখানা থেকে শুরু করে বিভন্ন হাত হয়ে পাঠকের নিকট পৌঁছে। এসময় কোনবাবে যদি ভাইরাসটি পত্রিকার পাতায় লেগে থাকে এবং তা থেকে সংক্রামিত হয়? সেকারনে মানুষ পত্রিকা হাতে করতে চাইতোনা। তাছাড়া মার্চ মাসের ২৩ তারিখে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং ২৬ মার্চ হতে তা কর্যকর। সেই সাথে সকল প্রকার যানবাহন বন্ধ ঘোষণার ফলে পত্র-পত্রিকাসমূহ পাঠকের হাতে পৌঁছানোর সকল পথ বন্ধ হয়ে যায়। লকডাউন চলাকালে তাই পুরোটা অলস সময় অনলাইনে পত্রিকা পড়ে পাঠকদের দুধের সাধ ঘোলে মিটতো।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত ৩০ শে জুন-২০১৮ তারিখের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধিত পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ৩০৬১ টি। (অন লাইন গণমাধ্যম বাদে) যার মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকে ১২৬৮ টি এবং অন্যান্য জেলা থেকে ১৭৯৩ টি পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বলতে গেলে করোনাকালে এর সব কটিই বন্ধ হয়ে যায়। যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হবার কারনে পত্রিকা বন্ধ হলে পত্রিকার হাজার হাজার হকার দারুন বিপদের সম্মুখিন হয়।
কোভিড-১৯ করোনা অতিমারিতে পত্রিকার প্রচার সংখ্যা আশাতীত হারে কমে যায় এবং বিজ্ঞাপন শুন্যের কোঠায় নেমে যায়। পরবর্তীকালে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ কর্তৃক টাকা-কড়ি এবং কাগজ পত্রের মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রামিত হয়না বলে অভয় দিলে এবং তা মানুষজন বিশ^াস করলে সংবাদ পত্র আবার পাঠকের দহলিজে যাবার সুযোগ লাভ করে। ততদিনে যা হবার তাই হয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে সংবাদ পত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব, বাংলাদেশ সংবাদ পত্র পরিষদ, টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের উভয় অংশ এবং ঢাকা রির্পোটার্স ইউনিটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যম রক্ষায় বিভিন্ন দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয় সরকারের কাছে।
বৈশি^ক মহামামারি করোনা কালের জীবন ধারায় সব চাইতে নির্ভর করার গণমাধ্যম হিসেবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তথা টিভি চ্যানেলগুলো ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। লকডাইন কিংবা ঘরে থাকা সব সময়ই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত খবর ও নানা ধরণের আলোচনা অনুষ্ঠান দেখে থাকেন। এই মূহুর্তে টিভি চ্যানেলগুলো সব ধরণের ঝুঁকি নিয়ে করোনাভাইরাসের খবরাখবর সচিত্র প্রতিবেদন আকারে প্রচার করে থাকে। শুধু তাই নয় সরকারের নির্দেশাবলী যেমন হাঁচি –কাশির শিষ্টাচার, সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া, শারীরিক বিচ্ছিন্নতা , লকডাউন, মাস্ক পরাসহ নানাধরনের সতর্কতা অবলম্বনের বিয়য় সম্পর্কে জনগণকে অবগত করানোর ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। এক্ষেত্রে দেশের অগণিত অনলাইন পোর্টালও বিশেষ কার্যকর ভুমিকা পালন করে চলেছে। যদিও হাতে গোনা কয়েকটি পোর্টাল ছাড়া তাদের ভাগ্যে এখনো সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি। এক্ষেত্রে ইউটিউব এবং ফেসবুকের ভুমিকাও কম নয় যদিও তার মধ্যে গুজবের মাত্রার পাল্লা অনেক ভারি। বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকগণ করোনা ভাইরাসের খবরাখবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেরা করোনাভাইরাসের শিকার হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক মৃত্যুবরণ করেছেন।
শুরু থেকেই করোনাভাইরাসের সকল খবরাখবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনের মাধ্যমে প্রচার করা হতো। অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ করে বর্তমানে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া গত ৪ আগস্ট -২০২০, যুগান্তর পত্রিকা মারফত জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কথা বরতে নিষেধ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নির্দেশনাতে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষেবিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ব্রিফিং সাক্ষাতকার প্রদান বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়ে মহাপরিচালকের পূর্বনুমোদন নিতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য ধামাচাপা দিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তথ্য লুকােেত চায় বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। (চলবে) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।