প্রধান মেনু

জেলখানার স্মৃতিকথা

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।

১৯৭৩ সালে ২১ মার্চ আটঘরিয়া উপজেলার বেরুয়ান গ্রাম থেকে রক্ষীবাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। আমার অপরাধ আমি জাসদ রাজনীতি করতাম । তখন আমার বয়স ১৯ বছরের মত। আমাকে গ্রেপ্তার করার ১৪ দিন আগে ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে জাসদের প্রার্থী ছিলেন আটঘরিয়া-ঈশ্বরদী থেকে আনোয়ার হোসেন রেনু, পাবনা সদরের প্রার্থী ছিলেন ইকবাল হোসেন, সাঁথিয়া-বেড়া থেকে মোঃ নিজাম উদ্দিন, সুজানগর -বেড়া থেকে অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম। উক্ত নির্বাচনে ছোট মানুষ হিসেবে আমার অনেক বড় ভূমিকা ছিল। আটঘরিয়ায় প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারনায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত জড়িত ছিলাম।

প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে ২১ থেকে ২৩ জুলাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি বিভক্তি হয়। ছাত্রলীগের বিভক্তির পর আমি পাবনা জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক মনোনীত হই। পাবনা পলিটেকনিকের জিএস আব্দুল হাই তপন আহবায়ক হন । পাবনায় প্রথম অবস্থায় রব গ্রুপ ছাত্রলীগের পক্ষে ছিলেন রফিকুল ইসলাম বকুল, ফজলুল হক মন্টু, আহমেদ করিম প্রমুখ। তাঁদের অনুপ্রেরনায় আমরা রব গ্রুপ ছাত্রলীগে জড়িত হই। এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা উল্লেখ করা দরকার, স্বাধীনতার পর পাবনায় আওয়ামী লীগ রাজনীতি দুই ধারায় পরিচালিত হতো। একদিকে নেতৃত্ব দিতেন মোঃ নাসিম অন্যদিকে রফিকুল ইসলাম বকুল। আমি শুরু থেকে বকুল গ্রুপে ছিলাম। তখন বকুল গ্রুপের পক্ষে ছাত্রলীগ এবং শ্রমিকলীগ দেখার দায়িত্ব পালন করতেন ফজলুল হক মন্টু। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের জুলাই মাসের সম্মেলনের আগেই ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ভাগ হয়ে যায়। এর প্রভাব পাবনাতেও পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের আগে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আব্দুস সাত্তার লালু এবং সাধারন সম্পাদক ছিলেন রফিকুল ইসলাম বকুল।

স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের বিভক্তিতে নুরে আলম সিদ্দিকী গ্রুপে পাবনায় উল্লেখযোগ্য নেতারা ছিলেন, যথাক্রমে আব্দুস সাত্তার লালু, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, আব্দুর রহিম পাকন, রেজাউল রহিম লাল, আব্দুল কাদের প্রমুখ। শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বধীন রব গ্রুপ ছাত্রলীগে ছিলেন, রফিকুল ইসলাম বকুল, ফজলুল হক মন্টু, এডওয়ার্ড কলেজের ভিপি অখিল রঞ্জন বসাক ভানু এবং জিএস খোন্দকার আওয়াল কবীর, ইশারত আলী জিন্নাহ প্রমুখ। পরবর্তীতে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে রফিকুল ইসলাম বকুল এবং ফজলুল হক মন্টু গ্রুপ ত্যাগ করে নুরে আলম সিদ্দিকী গ্রুপে যোগ দেন। উনারা চলে গেলেও আমরা রব গ্রুপেই থেকে যাই।

রব গ্রুপ ছাত্রলীগ থেকে ১৯৭২ সালে ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল – জাসদ গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হন, মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল এবং সাধারন সম্পাদক হন, ১৯৭১ সালে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব। পাবনা জেলা জাসদের নেতৃত্ব গ্রহন করেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রবিউল ইসলাম রবি , মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনা জেলা মুজিববাহিনী প্রধান ইকবাল হোসেন , জামিল আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান মুকুল প্রমুখ। ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগরের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রধান কমান্ডারগন জাসদে যোগদান করেন। ঈশ্বরদীর শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম চুনু সরদার, জাফর সাজ্জাদ খিচ্চু, সদরুল হক সুধা, মতিউর রহমান কচি, খায়রুজ্জামান বাবু, গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, আন্নি আটঘরিয়ার মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার আনোয়ার হোসেন রেনু, আলী আশরাফ, কাশেম মুন্সী, সাদেক আলী বিশ্বাস, হাসান আলী, সাঁথিয়ার মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার নিজাম উদ্দিন, বেড়ার আবদুল হাই সুজানগরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আহসান হাবীব সহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ জাসদে যোগ দেন।

১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ১৪ দিন পর রক্ষীবাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করে। ২১ মার্চ গভীর রাতে আটঘরিয়ার বেরুয়ান গ্রাম থেকে রক্ষীবাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করে। একই সময়ে বেরুয়ান গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আলী বিশ্বাস এবং মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলীর বাড়ীতে অভিযান চালালেও তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আমাকে আটক করে মাজপাড়া ইউনিয়নের গোকুলনগর গ্রামে যায়। সেখানে জাসদ মনোনীত সংসদ পদপ্রার্থী আনোয়ার হোসেন রেনু, মুক্তিযোদ্ধা আলী আশরাফ ও মুক্তিযোদ্ধা কাশেম মুন্সীর বাড়ী ঘেরাও করলেও তাঁদের আটক করতে ব্যর্থ হয়। এরপর সেখান থেকে আমাকে নিয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতাল চত্বরে অবস্থিত রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে আনা হয়। ২২ মার্চ রক্ষীবাহিনীর লিডার ওলিউর রহমানের নেতৃত্বে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। আমার কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে এই অজুহাতে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। বিকাল থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত শত শত লাঠির আঘাতে একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ভোররাতে জ্ঞান ফিরে আসার পর নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি ছোট্ট রুমের মেঝেতে পড়ে আছি। জ্ঞান ফিরে দেখি আমার গোটা শরীর রক্তাক্ত। শরীরের জামা-কাপড়, হাড়-মাংস সব একাকার। মাথায় একাধিক জায়গা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। শরীরের ব্যথায় আমি কাতরাচ্ছি। আমার রুমের সামনে রক্ষীবাহিনীর এক সেন্ট্রী অস্ত্র হাতে বসে আছে। একপর্যায়ে সেন্ট্রী দয়াবশতঃ জিজ্ঞাসা করলো আমার কিছু লাগবে কিনা। আমি পানি খেতে এবং বাথরুমে যেতে চাইলাম। সেন্ট্রী আমাকে পানি দিলো। আমাকে ধরে বাথরুমে নিলো। তখন আমার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নাই। প্রচন্ড ক্ষুধায় মনে হচ্ছে আমার জীবনটা বের হয়ে যাবে। সেন্ট্রী কয়েক টুকরো রুটি আমাকে খেতে দিলো । কখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছি সেটা আর মনে নাই।

২৩ মার্চ সকালে আমাকে ডেকে তোলা হলো। রক্ষীবাহিনীর ডিপুটি লিডার মাজদার রহমান আমার ঘরে ঢুকলেন । পাশের চেয়ারের উপর বসে আমাকে বললেন, আমি যদি অস্ত্র না দেই তাহলে আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে । সে আমাকে বাঁচাতে চায়। যেকোন ভাবে অস্ত্র জোগাড় করে দিলে উনি আমাকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। নতুবা আজই আমাকে মেরে ফেলা হবে। আমি যদি রক্ষীবাহিনীর লিডার ওলিউর রহমানকে বলি, আমাকে গ্রামে নিয়ে গেলে অস্ত্র দিতে পারবো। এই কথা বলে ডিপুটি লিডার মাজদার রহমান আমার রুম থেকে বের হয়ে গেলো। এরপর আমার জন্য নাস্তা আসলো। লিডার ওলিউর রহমানকে কিছুই বলতে হলোনা। কিছুক্ষনের মধ্য ডিপুটি লিডার মাজদার রহমান আমাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে রওয়ানা হলেন। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। গ্রামে কোন পুরুষ মানুষ নাই। আমাকে যখন বাড়ীতে নেওয়া হয় তখন আম্মা এবং প্রতিবেশী কিছু মহিলা ছাড়া আমার কাছে কেউ ভয়ে আসছেন না। আমার এমন বিভৎস্য চেহারা দেখে কেউ ঠিক থাকতে পারছে না। রক্ষীবাহিনীর ডিপুটি লিডার সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন যদি সন্ধ্যার আগে ১/২ টা অস্ত্র জোগাড় করে দিতে পারেন তাহলে তাঁকে বাঁচানো যাবে। একপর্যায়ে সময় দিয়ে আমাকে আটঘরিয়া থানায় নিয়ে আসা হয়। আটঘরিয়া থানার ওসি হলেন লালা বাবু। উনি আমাকে খুব ভালবাসতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ওসি হলেন লালা বাবু । ঐ সময়ে থানার দারোগা, পুলিশ সবাই আমার প্রতি সদয় সহনুভুতিশীল ছিল। কিভাবে আমাকে বাঁচানো যায় সে বিষয়ে সবাই বিচলিত হয়ে পড়ে।

এরপর বিকালের দিকে আমার গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মোড়ল আয়েন উদ্দিন প্রামাণিক, হারু মেম্বার, আব্দুস সাত্তার ছাতু, জয়নাল প্রমুখ কয়েকটি পরিত্যক্ত অস্ত্র নিয়ে থানায় উপস্থিত হলেন। এরপর রক্ষীবাহিনীর ডিপুটি লিডার মাজদার রহমান আমাকে অস্ত্রসহ থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেন। রক্ষীবাহিনী আমাকে আটঘরিয়া থানায় সোপর্দ করে পাবনা চলে গেলেন । ২৩ মার্চ আমাকে আটঘরিয়া থানায় রাখা হলো। রক্ষীবাহিনী থানা থেকে চলে যাওয়ার পর অসংখ্য মানুষ আমাকে দেখার জন্য ভীড় করতে থাকে । ২৪ মার্চ দুপুর ১২ টার দিকে আটঘরিয়া থানা পুলিশ আমাকে নিয়ে পাবনা রওয়ানা হন। তারপর কোর্ট হয়ে পাবনা জেলখানায়। আমি জেলগেটে থাকতে ভিতরে থাকা সহযোদ্ধা বন্ধুরা এসে আমাকে বরণ করে নিলেন। গুরুত্বর আহত থাকায় আমাকে জেলগেট থেকে জেল হাসপাতালে নেওয়া হলো।

জীবনের প্রথম জেল-দর্শন। নিজের কাছে মনে হচ্ছে নরক থেকে স্বর্গে এলাম। এমন ভাবনার কারন হলো, বাইরে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল জীবননাশের আতঙ্ক। অন্ততঃ সেটা থেকে এখন অনেক স্বস্তিবোধ করছি। যাইহোক আগে কখনো জেলের ভিতরের চিত্র দেখা হয়নি। এই জেলখানার পাশ দিয়ে কত যাতায়াত করেছি। কোনদিন কল্পনাও করি নাই, দুনিয়াতে এমন স্থান আছে। শতবর্ষ পূর্বে কয়েক বিঘা জমির উপর পাবনা জেলখানা স্থাপিত। তখন জেলখানায় প্রায় দেড় হাজার বন্দী। প্রথম জেলে প্রবেশ করেই মনে হলো, দেশের মধ্য এ যেন আরেক দেশ। জেলকোড নামের বৃটিশ প্রণীত আইন দ্বারা জেলখানা পরিচালিত হয়। সব ধরনের অপরাধ করা অপরাধীর অবস্থান একই রকম। জেলখানার মধ্যে সু-শৃঙ্খলতা দেখে মনে মনে ভাবতাম ইশ গোটা দেশটা যদি এমন হতো। গাছের ছায়ায় ঢেকে থাকা স্থানটিতে একটি গাছের পাতাও পড়ে থাকার উপায় নাই। সব যেন নিয়মের মধ্য পরিচালিত হচ্ছে। ঘড়ির কাটা ধরে ঘুম থেকে উঠতে হবে । ধনী-গরীব, ছোট-বড় সব বন্দীর ফাইল নামক নিয়মে সারিবদ্ধভাবে বসতে হবে। জেল কর্তৃপক্ষ দিনে কয়েকবার এই ভাবে আসামী গুনবে। ঠিক একই সময়ে খাবার দিবে। প্রতিদিনের প্রতি সময় যেন ছকে বাঁধা নিয়মে চলে।

জেলখানার মধ্যে সবচাইতে আকর্ষনীয় এবং লোভনীয় স্থান হলো হাসপাতাল । যেখানে শুধু অসুস্থ নয় সুস্থ মানুষও ভর্তি হওয়ার তদবির করেন । এর প্রধান কারন হলো জেল হাসপাতালে খাটে শুয়ে থাকার ব্যবস্থা আছে। মশারীর বন্দোবস্ত আছে। উন্নত মানের খাবার পাওয়া ও ভাল বাথরুমের সুবিধা আছে। এছাড়া জেনারেল ফাইলের গননা নামক বিরক্তিকর অবস্থা থেকে মুক্ত থাকা যায়। এছাড়া হাসপাতালের ডাক্তার কর্তৃক উন্নত মানের খাবার বরাদ্ধের ব্যবস্থা করা যায় । আমি শুরু থেকেই হাসপাতালে ভর্তি এবং কয়েক মাস যাবত সেখানে ছিলাম। তখন জেল হাসপাতালের চিকিৎসক হলেন, বনওয়ারীনগর ফরিদপুর থানার ডাঃ আবু তাহের। সার্বক্ষনিক রাইটার বা সহকারীরা হলেন, পাবনা শহরের পৈলানপুরের মির্জাউল হোসেন তারা এবং ঈশ্বরদীর মতিউর রহমান মতি। তাঁরা দু’জনই বিচারাধীন আসামী ছিলেন । উল্লেখ্য মির্জাউল হোসেন তারা তাঁর বাবা ইয়াকুব আলি এবং ছোট ভাই কেরু জেলখানায় বন্দী ছিলেন। তখন জেলখানায় প্রায় দেড় হাজার বন্দী ছিল। এদের মধ্য স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধীতার অভিযোগে শান্তি কমিটির সদস্য, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিমলীগ, রাজাকার, আলবদর, নক্সাল বাহিনী, বিহারী ও পাকিস্তানী মিলেশিয়া বাহিনীর সদস্যরা আটক ছিল।

সেই সময় প্রায় ১৫/২০ জন মুক্তিযোদ্ধা পাবনা জেলে বন্দী ছিলেন। তার মধ্যে বেশীর ভাগ জাসদ করার অপরাধে আটক হয়েছেন। আমি আটক হওয়ার তিনদিন পরে আটক হয়ে এলেন, ঈশ্বরদীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম চুনু সরদার। তাঁকেও রক্ষীবাহিনী আটক করে চরম নির্যাতন করেছে। তখন মুক্তিযোদ্ধা বন্দীদের মধ্যে ছিলেন পাবনার আহমেদ করিম, মঞ্জু, মুন্নু, সরোওয়ার, টেংকু বাবলু, আবদুল লতিফ সেলিম, আব্দুল্লাহ হিল কাফি, বাদশা, শেখর, স্বপন, রফিক, নয়নামতির নূরুল ইসলাম নুরু , পাকশীর সদরুল হক সুধা, ঈশ্বরদীর খায়রুজ্জামান বাবু, সুজানগরের আহসান হাবীব, আটুয়ার ঘি কুদ্দুস, রাধানগরের ছমির উদ্দিন এবং টেবুনিয়ার দেরব আলী। অল্পদিনের মধ্যে জাসদ যেমন বড়দলে পরিনত হলো, জেলখানাতেও তেমনি জাসদের বন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকলো। আটঘরিয়ার আনোয়ার হোসেন রেনু, সাত্তার খান, জহুরুল ইসলাম, মিয়ার উদ্দিন, মন্টু, জলিল চাটমোহর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে এলেন। তার আগে উনার শ্বশুর ডাঃ নওশের আলী, ভগ্নিপতি মকবুল খাঁ ( প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন ডাঃ লুৎফর রহমানের বাবা), তাঁর ভাই মোজাম্মেল খাঁ জেলে বন্দী হয়ে আছেন । বেড়া থেকে বেলায়েত আলী বিল্লু, আরিফুর রহমান আরব, গোলাম মোস্তফা চাঁদ, মঞ্জু, সাঁথিয়ার ছেঁচানিয়া গ্রামের মধু, মোহাম্মদ আলী, পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লার মুক্তিযোদ্ধা মমিনুর রহমান বরুন সহ প্রমুখ জেলখানায় প্রবেশ করেন।

ঐ সময়ে দুবলিয়া থেকে গ্রেপ্তার হয়ে নক্সাল নেতা কামরুল মাষ্টার, কাশেম বিশ্বাস, মান্নান বিশ্বাস, রইস উদ্দিন, নুরু, আমজাদ হোসেন জেলে এলেন। পাবনা পলিটেকনিকে ছাত্র হত্যা মামলায় আওয়ামীলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম বকুল, হাবিবুর রহমান হাবিব, রেজা, মোহন, আজিজুল হক ( এডভোকেট) , মাহতাব উদ্দিন নিশু, তোফাজ্জল হোসেন তক্কেল ( চেয়ারম্যান) জেলে এলেন । ঈশ্বরদীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ওয়াছেব হত্যা মামলায় আবু তাহের বকুল, নাজিরপুরের নজরুল ইসলাম হাবু চেয়ারম্যান হত্যা মামলায় রাধানগরের বিদ্যুৎ ও হেমায়েতপুরের আজমত,আনসার জেলে এলেন। শালগাড়ীয়ার মুক্তিযোদ্ধা নবীর উদ্দিন, আটঘরিয়ার পয়গাম হোসেন পাঁচু, মাজপাড়ার আহম্মদ আলী খান(চেয়ারম্যান) জেলখানায় বন্দী ছিলেন। নক্সাল নেতাদের মধ্যে রাধানগরের নুরুন্নবী হুমু, আবদুল হালিম, তোতা, জেলে ছিলেন। পাবনার আহমেদ রফিক হত্যা মামলায় টাঙ্গাইল থেকে গ্রেপ্তার হয়ে পাবনা জেলে এলেন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এনামুল করিম শহীদ ( পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)। সিরাজগঞ্জের কবি মোহন রায়হান ছিল।

১৯৭৩ সালে জুন জুলাই মাসে পাবনা জেলখানায় সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সংঘটিত হয় । জেলখানার পুলিশের সহযোগিতায় ৭ জন বন্দী পালিয়ে যায় । পরের দিন আটঘরিয়ার শ্রীকান্তপুর গ্রামের পাশে থেকে ৫ জন ধরা পড়ে । তাদের মধ্যে ৪ জনকে পাবনা পলিটেকনিকের ভিতর হত্যা করা হয়। এই ঘটনাটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল । জাতীয় রাজনীতিতে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলেছে। বিরোধী দল অভিযোগ করেছে সরকার জেলখানায় বন্দীদের হত্যা করেছে। আসলে কি ঘটেছিল সেদিন যা আজও উদঘাটন হয়নি। সেই ঘটনায় জড়িত বন্দীরা এখনো বেঁচে আছে। বেঁচে আছে সেই ঘটনায় আমার মত অনেক সাক্ষী।

১৯৭৩ সালে জুন-জুলাই মাসের ঘটনা। বর্ষাকাল তখন বিরুপ আবহাওয়া। একটানা ২০-২৫ দিন ধরে অবিরত বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত। এমনি একটি দিনে জেল পালানোর ঘটনাটি ঘটেছিল। উল্লেখ্য যে আমি জেলে প্রবেশ করার পর থেকেই সহযোদ্ধা বন্দীদের মাঝে জেল থেকে পালানোর ব্যাপারে কানাঘুষা চলতে থাকে। আমাদের মধ্যে অনেকে মনে করতেন জেলে থাকা কোনভাবেই নিরাপদ নয়। সরকারী দলের লোকেরা যেকোন সময় আমাদের এখান বের করে হত্যা করতে পারে। তখন দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল। তাই এভাবে মারা যাবার থেকে জেল থেকে বের হওয়া সঠিক হবে। বিষয়টি নিয়ে সবাই একমত ছিল না। প্রথমদিকে শুনতাম বাইরে থেকে ডিনামাইট দিয়ে প্রাচীর উড়িয়ে দেওয়া হবে এবং আমরা বের হবো। পুরা অপারেশন পরিচালনা করবে বাইরে থাকা সহযোদ্ধা বন্ধুরা। নানা কারনে সে পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে পাবনার আহম্মেদ করিম, মঞ্জু এবং পাকশীর সদরুল হক সুধা বিচারে জেল হলে তাদের দ্রত রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর জেল থেকে পালিয়ে যাবার বিষয়টি অনেকদিন থেমে ছিল।

এরপর বেশ কিছুদিন পর একদিন ১ নং ওয়ার্ডে থাকা ১১ জন, হাসপাতালে থাকা আমি, মির্জাউল ইসলাম তারা ও মতিউর রহমান মতি , অন্য ওয়ার্ডে থাকা ঘি কুদ্দুস একসাথে বিকালে খাওয়া দাওয়া করলাম। তখন আমি সহ আট জনের বাড়ী থেকে খাবার দেওয়ার অনুমতি ছিল। সেই মোতাবেক আমাদের বাড়ী থেকে দুইবেলা খাবার দেওয়া হতো। আমরা এই খাবার প্রতিদিন একসাথে ১৩/১৪ জন খেতাম। সেদিন বাড়ীর খাবারের সাথে ভিতরে রান্না করা বিশেষ খাবারও ছিল। একসাথে খাওয়ার পর আমি হাসপাতালে ফিরে এলাম। সেদিন কিছুটা আঁচ করলেও বুঝতে পারিনি আজ রাতেই ঘটনাটি ঘটবে। আনুমানিক রাত আটটার দিকে জেলখানার পাগলা ঘন্টা বেজে উঠলো। মাঝে মাঝে জেল কর্তৃপক্ষ মহড়া হিসেবে পাগলা ঘন্টা বাজালেও সেদিনের ঘন্টা আর থামছে না। ডিসি অফিসের সাইরেন বেজে চলছে। মুহুর্তে জেল পুলিশ সহ পুলিশ লাইনের পুলিশ জেলখানা ঘিরে ফেলেছে। বাইরে ব্যাপক হৈ-চৈ হচ্ছে। অনেক পরে জানতে পারি জেলখানার পুলিশ ছাত্তারের সহযোগিতায় ১ নং ওয়ার্ড থেকে জানালার শিক কেটে ৭ জন বের হয়েছে। হাবিলদার টের পাওয়ার কারনে চারজন বের হতে পারে নাই । ভিতরে আটকা পরা চারজন হলেন, চুনু সরদার, মুন্নু, নূরু এবং কাফি। বের হয়েছে সেলিম, শেখর, বাদশা, স্বপন, রফিক, সরোওয়ার ও টেংকে বাবলু। এরপর আটকে পরা ৪ জন সহ বাঁকীদের হত্যা করার চেষ্টা করলে তৎকালীন ডিসি, জেল সুপার, জেলার সহ কতিপয় কর্মকর্তার বলিষ্ঠ ভুমিকার কারনে সেটা সম্ভব হয়নি।

পরে জানা যায়, জেল থেকে বের হয়ে সরোওয়ার ও টেংকে বাবলু একদিকে আর সেলিমের নেতৃত্বে পাঁচজন আরেক দিকে পালিয়ে যায়। পরের দিন আটঘরিয়া উপজেলার শ্রীকান্তপুর গ্রামের পাশে সেলিম সহ পাঁচজন ধরা পড়ে। পরে তাদের রাধানগর ডিগ্রী কলেজের পাশে একটি ক্যাম্পে আনা হয়। এরপর রাতে তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে পাশের নির্মানাধীন পলিটেকনিকের ভিতর নেওয়ার সময় সেলিম আবার পলায়ন করে। তখন বাঁকী চারজন যথাক্রমে শেখর, বাদশা, রফিক ও স্বপনকে সেখানেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেখান থেকে সেলিম পালিয়ে সদর থানার ওসি কাদের দারোগার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপর সেলিমকে কোর্টে হস্তান্তর করে সরাসরি রাজশাহী সেন্টাল জেলে পাঠিয়ে দেয়। এই ঘটনার পর দীর্ঘদিন জেলখানার মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকন্ঠা বিরাজ করেছিল ।

পাবনা জেলখানা থেকে বন্দী পালানোর পর দীর্ঘদিন জেল কর্তৃপক্ষ খুব কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। প্রথম কয়েকদিন ২৪ ঘন্টা রুম তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। বন্দীদের চলাফেলা করার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। বন্দীদের আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। যেকোন ছোট খাটো অপরাধ করলেই তার উপর পুলিশ নির্যাতন করতো। ক্রমান্বয়ে জেল কর্তৃপক্ষের অনাচার ও অবিচার মাত্রা অতিক্রম করলে ধীরে ধীরে আমরা প্রতিবাদ শুরু করি। বন্দীদের সংগঠিত করে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী পেশ করি। বিশেষ করে বন্দীদের বরাদ্দকৃত খাবার কম দেওয়া, খাবারের মান নিম্নমুখী হওয়া, বন্দীদের উপর পুলিশের নির্যাতন করা সহ নানা দাবী দাওয়া পেশ করি। এসব দাবী দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য আলটিমেটাম পেশ করি। অনশনের হুমকি দেওয়া এবং একাধিক বার অনশন করি।

জেলখানায় বন্দীদের পক্ষ থেকে এই সব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন, ঈশ্বরদীর আমিনুল ইসলাম চুনু সরদার। ষাটের দশকে ঢাকা জগ্ননাথ কলেজ ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন । ঈশ্বরদীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে উনি ছিলেন সিনিয়র। পাবনার চরাঞ্চলের প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। খুবই সৎ, ন্যায় পরায়ন এবং সংগ্রামী নেতা। উনার সাথে এনামুল করিম শহীদ এবং আমি থাকতাম। এনামুল করিম শহীদ সেও খুব প্রতিবাদী এবং বলিষ্ঠ নেতা। বাড়ী টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানায়। স্বাধীনতার আগে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র ছিলেন। পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। উনি পাবনার ন্যাপনেত্রী সেলিনা বানু’র দেবর। নারী মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিলের চাচা। ১৯৭০ সালে ২২ ডিসেম্বর পাবনায় নব-নির্বাচিত এমপিএ আহমেদ রফিক হত্যাকান্ডের আসামী। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর দল স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেও উনি টাঙ্গাইলে গিয়ে কাদের সিদ্দিকীর সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। উনার আপন ভাই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর আহমেদ রফিক হত্যা মামলার আসামি হিসেবে টাঙ্গাইল থেকে গ্রেপ্তার হয়ে পাবনা জেলে স্থানান্তর হন। উনি স্বাধীনতার পর ভাসানী ন্যাপের ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক ছিলেন।

জেলখানায় বন্দীদের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, প্রতিবাদ, অনশন ধর্মঘট করার কারনে জেল কর্তৃপক্ষ চুনু সরদারকে রাজশাহী জেলে বদলী করে। এনামুল করিম শহীদ এবং আমাকে দিনাজপুর জেলখানায় বদলী করে। ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে সারাদেশে সেনাবাহিনী নামিয়ে দিয়েছে। ঠিক এমনি একটি সময়ে আমাদের দুইজনকে কঠোর পুলিশ প্রহরায় পাবনা জেল থেকে বের করা হলো। শহরের বিআরটিসি বাস ডিপোতে ( বর্তমান ডায়াবেটিক হাসপাতাল) আনা হলো। সেখান থেকে এনামুল করিম শহীদ নিউমার্কেট সংলগ্ন তসলিম হাসান সুমনদের বাড়িতে খবর পাঠালো। সুমন, জাহিদ ভাই এরা হলো শহীদ মামার ভাগ্নে। একই বাড়ীতে শহীদ মামার ভাই এবং দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। তাঁদের বাড়ী থেকে লোক এসে দেখা করলো। কিছু টাকা পয়সা ও জিনিষপত্র কিনে দিলো। আর ঘটনাক্রমে যে বিআরটিসির বাসে ঈশ্বরদী যাবো, সেই বাসের ড্রাইভার হলো রাধানগর মক্তবের মুক্তিযোদ্ধা মতিন। আমার বাড়ীতে সংবাদ দিয়েছিল ড্রাইভার মতিন।

সকাল ১০ টায় পাবনা জেলখানা থেকে বের হয়ে বিআরটিসি বাসে ঈশ্বরদী রেল স্টেশন । সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে পার্বতীপুর। তারপর ট্রেন বদল করে দিনাজপুর। পথে পথে উৎসুক জনতার ভীড়। আমরা কে – কোথায় থেকে কোথায় যাচ্ছি? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত মানুষকে দিতে হয়েছে। আর হাজার হাজার মানুষ দেখেছে দুই ভালো চেহারার যুবককে পুলিশ হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে যত্ন সহকারে নিয়ে যাচ্ছে। রাত ৩ টার দিকে দিনাজপুর স্টেশনে পৌছানোর পরে আমাদের জেলগেটে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর মনে হলো – আমাদের বরন করার জন্য সবাই অপেক্ষা করছেন। পরে জেনেছিলাম আমাদের বদলীর আদেশ করেছিলেন আইজি(প্রিজন)। দিনাজপুর জেল কর্তৃপক্ষকে ৭ দিন আগে জানানো হয়েছিল পাবনা জেল থেকে দুই জন ভয়ানক বন্দী যাবে। তাঁদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই হিসেবে আমরা যাবার আগে থেকে পরিত্যক্ত ফাঁসির ঘর ( কনডেম সেল) সংস্কার করে রাখা হয়েছে। সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্ঠিত জেলের মধ্যে জেল। সেখানে আমাদের নেওয়ার পর জানানো হয় – কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে সেল থেকে বের হওয়া যাবেনা। সেলে প্রবেশ মুখে সার্বক্ষনিক একজন কারারক্ষী থাকবে। আমাদের দুইজনের জন্য দুইজন ফালতু ( সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী) থাকবে। একজন ২৪ ঘন্টা থাকবে এবং আরেকজন ১২ ঘন্টা থাকবে। ২৪ ঘন্টা যে থাকবে তার বাড়ী সিরাজগঞ্জের বেতিল। জয়নাল নামের সেই আসামী চোরাচালান মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।

দিনাজপুর জেলখানায় প্রথমদিনের প্রথম প্রহর থেকে কর্তৃপক্ষের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে যায়। ফাঁসির ঘরে রাখা, এত কড়াকড়ি আরোপ করা এবং নিম্নমানের খাবার দেওয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ, হাবিলদার ও জেলার সাহেবের সাথে কথাকাটি হয়েছে। পাবনা জেলে আমার খাবার বাড়ী থেকে দেওয়া হতো। এখানে জেনারেল ফাইলের খাবার খাওয়া সম্ভব নয়। এ নিয়ে দুপুর এবং রাতে যে খাবার দেওয়া হলো সেটা দেখেই আর রুচি হয়নি। এ নিয়ে জেলার সাহেবের কাছে রাতে অভিযোগ দেওয়া হলো। পরেরদিন সকালে কাকতালীয় ভাবে আমাকে জেলগেটে ডাকা হলো। আমার সাথে দেখা করার জন্য কারা যেন এসেছে। আমাকে জেলগেটে নেওয়া হলো। গেট খুলতেই চোখে পড়লো আর্মীর গাড়ী। জেলার সাহেবের রুমে ঢুকতেই দেখি বড় ভাই সহ ৪/৫ জন সামরিক অফিসার। উনাদের মধ্যে সিনিয়র অফিসার হলেন মেজর বাশার। যিনি কিনা ঐ সময়ের বিমান বাহিনী প্রধানের ছোট ভাই। বড় ভাই সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বড় ভাই জানালেন, গতকাল পাবনায় ফোন করেছিল। তখন জানতে পারে, আমাকে দিনাজপুর পাঠানো হয়েছে। বড় ভাই আমাকে জানায় সে দিনাজপুর সার্কিট হাউসে আছে। আমি যেন কোন চিন্তা না করি। মেজর বাশার জেলার সাহেবকে বললেন ওর যেন কোন অসুবিধা না হয়। জেলার সাহেব বললেন স্যার উনার কোন অসুবিধা হবে না। আমার অনেক প্রশংসা করলেন। যদিও গতকাল বেশ কয়েকবার ঝগড়া করেছি।

বড় ভাই এবং অফিসাররা আমার জন্য প্রায় এক বস্তা মালামাল নিয়ে এসেছেন। বড় ভাই জেলগেটে আমার নামে কয়েক’শ টাকা জমা করলেন। বড় ভাই এবং অন্য অফিসাররা সাক্ষাৎ করে বিদায় হওয়ার পর জেলার সাহেব তাঁর রুমে আমাকে বসিয়ে বললেন আমার কোন অসুবিধা হবেনা। আমাদের জন্য জেল হাসপাতাল থেকে রান্না করা খাবার দেওয়া হবে। চলাফেরা করতে কোন বাধা থাকবে না। যেকোন কিছু দরকার হলে আমাকে পৌঁছে দেওয়া হবে। সেখানেই জেলার সাহেব আমাকে জেলখানার ঠিকাদার হবি চেয়ারম্যানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর আমি জেলগেট থেকে রাজার হালে আমার সেলে ফিরে এলাম। শহীদ মামাতো বড় ভাইয়ের কথা শুনে আনন্দিত হলো। তবে তাঁর আফসোস হলো বড় ভাইয়ের সাথে দেখা না হওয়ায়। মুহুর্তে গোটা জেলখানায় ছড়িয়ে পড়লো আমি ক্যাপ্টেন নজরুলের ভাই। তখন জেলখানায় আর্মীর হাতে আটক প্রায় ৪০/৫০ জন চোরাচালানী এবং অবৈধ অস্ত্রধারী বন্দী ছিল। এদের মধ্যে বেশীর ভাগ ছিল মারোয়ারী ব্যবসায়ী।

আমি এবং শহীদ মামা প্রায় ৮ মাস দিনাজপুর জেলখানায় ছিলাম। বড় ভাই দিনাজপুর ছিলেন প্রায় ৩ মাস। এরপর উনি সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে বদলী হয়ে যান। দিনাজপুর থাকতে প্রতিদিনই জেলগেটে আসতেন। সৈয়দপুর যাবার পর প্রতি রবিবার ছুটির দিনে আসতেন। একবার সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের প্রধান কর্নেল মফিজ, ১৭, বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আবদুল আজিজ সহ অনেক অফিসার আমাকে দেখতে এসেছিলেন। সেই সময়ে দিনাজপুর জেলখানায় কাটানো স্মৃতিমধুর দিনগুলোর কথা এখনো মানসপটে অমলিন হয়ে আছে। মনে পড়ে জাসদ নেতা সাব্বির ভাই, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কবিরুল ভাই, বাবুল, মোমিন এর কথা। খুব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলাম শহরের মালদাপট্টির গোলাম গাউস মন্টু, বালিয়াডাঙ্গির মিজানুর রহমান মিন্টু, বালুবাড়ীর নজরুল, চার্চিল, ঘোড়াঘাটের মোজাফফর, শান্তাহারের গোলাম রব্বান দুলাল, নন্দীগ্রামের বাচ্চু সহ অসংখ্য মুখের কথা আজীবন মনে থাকবে। দিনাজপুর জেলখানায় প্রায় ৮ মাস এবং পাবনা জেলের প্রায় ২২ মাস বন্দীজীবনে হারিয়েছি যতটুকু – প্রাপ্তিটুকুও কম নয়। জীবনের এমন স্মৃতি শত বছর পরেও জীবন্ত থাকবে।
( শেষ)

লেখক পরিচিতি –

আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।