প্রধান মেনু

ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় প্রায় ১০০ ভূমিহীন ছিন্নমূল পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়ায় পরিত্যক্ত রেলওয়ে কোয়ার্টার, ঝুকিপুর্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভবন এবং খোলা জায়গায়সহ আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ছিন্নমূল মানুষের মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা যাচ্ছে । তাদের দুঃখের কথা শুনার মত মানুষের বড় অভাব আমাদের এই সমাজে । কিছু জনদরদী আছেন মানবিক মূল্যবোধ থেকে এই ছিন্নমূল মানুষদের সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি সাহায্য সহযোগীতা করতে চান কিন্তু উনাদের সামর্থ্য নেই । আবার যাদের সামর্থ্য আছে তাদের সাহায্য সহযোগীতা করার মানসিকতার অভাব । এই ছিন্নমূল মানুষগুলোর এখন প্রধানত প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা ।সদর উপজেলার রুহিয়া থানাকে দু’ভাগ করে চলে গেছে ঢাকা – পঞ্চগড় রেলপথ ।

ঠাকুরগাঁও জেলার ঐতিহ্যবাহী রেল স্টেশন রুহিয়া । বৃটিশ আমলে নির্মিত এই রেলওয়ে স্টেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হিসেবে গন্য হতো কারন উত্তরের শেষ রেল স্টেশন ছিল এটি । আলোচ্য ছিন্নমূল মানুষদের বসবাস এখানেও কম নয় । মহান স্রষ্টা কর্তৃক বিশ্ব সৃষ্টিলগ্ন থেকেই এজগতের সৃষ্টির অন্যতম সেরা হচ্ছে মানুষ । এই মানুষেরা বিভিন্ন অবস্থানে, পরিবেশে নানান বৈচিত্রে ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে জীবনযাপন করে থাকেন । কেউ বাস করে উপর তলায় আবার কারো আবাস গাছ তলায় । এ অসমতা বিনাশের প্রত্যয়ে বিশ্ব স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের অন্যতম অধিকার হচ্ছে সকল মানুষের বাসস্থান নিশ্চিত করা । যেমন-ই হোক প্রত্যেক মানুষের একটি ন্যুনতম সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন বসবাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে । বিশ্ব স্বীকৃত মানুষের মৌলিক অধিকার ৫টি ১. খাদ্য ২. বস্ত্র ৩. বাসস্থান ৪. শিক্ষা ও ৫. চিকিৎসা । এর মধ্যে বাসস্থান তৃতীয় অবস্থানে হলেও এটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার । আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে, মানবেতর জীবনযাপন করছে । ওই মানুষগুলোর নেই কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই কোন বসবাসযোগ্য আবাস । বর্তমান প্রেক্ষাপটে এদেরকেই আমরা ছিন্নমূল মানুষ হিসেবে অভিহিত করে থাকি ।এই মানুষগুলোই পরিত্যক্ত, অব্যবহৃত সরকারি জায়গায় অথবা পরিত্যক্ত ভবনে নিজ উদ্যোগে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে নেয় । এদেরকে সবচেয়ে অধিক পরিমানে পরিলক্ষিত হয় পরিত্যক্ত সরকারি ভবন অথবা খোলা জায়গায় ।

শহর কেন্দ্রিক রেল স্টেশন গুলো তাদের জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থান বলে তারা বিবেচনা করেন । সেখানে তারা মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং বেঁচে থাকার তাগিদে রোজগারের ব্যবস্থা উভয় সুবিধাই পেয়ে থাকেন ।সরজমিনে রুহিয়া রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এই মানুষগুলোর মধ্যে কেউ কেউ কিছু দিনের জন্য এখানে আসেন আবার কেউ যুগব্যাপী বসবাস করছেন । আবার এই রেল স্টেশনের পার্শ্ববর্তী পরিত্যক্ত জায়গায় ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে স্বপরিবারে বাস করছেন অনেকেই ।ঢাকা বিক্রমপুরের বাসিন্দা মৃত, দোমাসুর ছেলে জাকির হোসেন জানান, তাঁর মূল ঠিকানা বিক্রমপুর হলেও সেখানে তার কোন ভিটে – মাটি নেই । তাই বাধ্য হয়েই এখানে থাকা স্বপরিবারে ।ঝালমুড়ি বিক্রেতা আব্দুল হক একই কথা বললেন, ভিটে – মাটি নাই । মিশন রেলক্রসিং সংলগ্ন, ঝুপড়ি ঘরের বাসিন্দা বিধবা লঙ্কেস্বরি দাস (৭০) বলেন, তার স্বামী নেই, শশুর বাড়ি নেই, বাবার বাড়িতেও বসবাসের জন্য স্থায়ী কোন ভূমি নেই, তাই রেলওয়ের পরিত্যক্ত জায়গায় ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে বসবাসকরা ব্যতিত কোন উপায় নেই ।একই স্থানে দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে অনেকেরই এলাকায় সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে । সেই সুবাদে অন্যের আশ্রয়ে কুড়ে ঘর বানিয়ে দিনাতিপাত করছেন অনেকেই ।

এদের একজন মৃত ডাহই মিয়ার ছেলে মো মেজর বলেন, নিজের কোন বাসস্থানের জায়গা না থাকায় রেলের জায়গায় পরিবারসহ আশ্রিত হয়ে আছি ।কর্নফুলী বাজার সংল্গন পরিত্যক্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াবদা কোলনিতে বসবাসরত দিনমজুর পোকা মিয়ার শারিরীক সামর্থ্যই তার সম্বল । বর্তমানে ষাটোর্ধ বয়সে কর্মক্ষমতা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি । অনেকেই মনেকরেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় খাস ভূমিতে অথবা যেস্থানেই হোক এদেরকে পূণর্বাসন করা যেতে পারে । এ লক্ষ্যে প্রয়োজন আলোচ্য বিষয়টি রাষ্ট্রকে অবগত করানোর পাশাপাশি উদ্যোগ গ্রহন করার মানসিকতা সম্পন্ন, দৃঢ় প্রত্যয়দীপ্ত ব্যক্তিত্ব । সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দশ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যেভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছে তা বিশ্ব দরবারে আমাদের ভাবমূর্তি সমুন্নত করেছে । আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে অনুন্নত ঠাকুরগাঁওকে তৈরি করেছেন মডেল জেলা হিসেবে ।“ শেখ হাসিনার অবদান , সবার জন্য বাসস্থান ” এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ভূমিহীন , ছিন্নমূল ও গৃহহীন মানুষদের গুচ্ছগ্রাম , আশ্রয়ণ ও সরকারী খাস জমিতে পুনর্বাসনসহ অবৈধ দখলদ্বারদের উচ্ছেদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ( এসিল্যান্ড ) সোহাগ চন্দ্র সাহা ।

আর এ সকল কাজকে সফল করতে সার্বিক ভাবে সহযােগীতা করছেন জেলা প্রশাসক ড . কেএম কামরুজ্জামান সেলিম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী আফরিদা। সরেজমিনে দেখা যায় , জেলার বৃহৎ নেকমরদ বাজারের সাড়ে পাঁচ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় গরুর হাট লাগতো একটি সরকারি অফিসের ভিতরে । তিনি ওই জমি উদ্ধার করে সরকারি খাস জমিতে গরুর হাট লাগার ব্যবস্থা করেছেন । এছাড়াও বেদখলে থাকা সাতটি পুকুর পাড়ের ২০ একর জমি উদ্ধার করে পুকুরপাড় গুলিতে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রেখেছেন ওই এসিল্যান্ড । ১০ জুন থেকে শুরু হয়েছে এই উচ্ছেদ কার্যক্রম । এতে করে উপজেলার বহু আশ্রয়হীন ও ভূমিহীন মানুষ নতুন করে ঠিকানা পেয়েছেন । একই উপায়ে রুহিয়ার এই অবহেলিত, প্রায় একশ মানবেতর জীবনযাপনকারী ছিন্নমূল, ভূমিহীন পরিবার গুলোকে একটি স্থায়ী ঠিকানায় পুণর্বাসিত করার দাবী অত্র এলাকার জনদরদী সচেতন মহলের । নয়তো, সরকারি পরিত্যক্ত ভবন ও অব্যবহিত জমি থেকে উচ্ছেদ হলে মানুষ গুলো যাবে কথায় ?