প্রধান মেনু

পাবনায় ৩৫০ টাকার জন্য যুবক খুন খুনের রহস্য উদঘাটন ও খুনি গ্রেফতারের নাটকীয় গল্প

পাবনায় পাওনা ৩৫০ টাকা চাইতে গিয়ে গত ৯ই মে খুন হয় জুয়েল রানা আকাশ নামের এক যুবক। পাবনার একদল চৌকস পুলিশ দ্রুতই এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘটন করে আসামীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে হত্যার পর পুলিশী কার্যক্রমে হত্যা রহস্য উদঘান এবং আলামতসহ আসামী গ্রেফতারের নীচের এই গল্প শোনালেন পাবনার ডিবি পুলিশের এসআই অসিত কুমার বসাক।
গত ৯ই মে বিকেল ৫টার দিকে সদর থানার ওসি ফোন করে এসআই সুব্রতকে জিজ্ঞেস করেন, “কোথায় তুমি”? সুব্রত বলেন,‘ আমি শহরে ডিউটি করছি স্যার’। ওসি সাহেব জানালেন, তোমাকে ডিউটি করতে হবেনা, তুমি পাবনা শিবরামপুর সুইচ গেইট কলাবাগানে যাও, সেখানে গুরুতর জখম অবস্থায় একটি ছেলে পড়ে ছিলো । জনগন উদ্ধার করে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত ঘোষনা করেছে। দেখতো ঘটনা কি ?
দ্রæত ফোর্সসহ এসআই সুব্রত রওনা হলেন। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখলেন, একজন ২০/২১ বছরের ছেলের মাথা এবং মুখের বিভিন্নস্থানে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম। তার পরিচয় পাওয়া যায়নি । পরিচয় জানার জন্য ছবিসহ সোস্যাল মডিয়ায় প্রচার করা হলো। জানা গেলো  যুবকের নাম জুয়েল রানা আকাশ (২০) গ্রাম মন্ডল পাড়া, পাবনা সদর। এই ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু করা হয় । তদন্তকারী কর্মকর্তা  নিয়োগ করা হয় এসআই সুব্রতকে ।

এদিকে পাবনার পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) এর নির্দেশে ডিবি পাবনা থেকে এসআই অসিত, এসআই সুমন সংগীয় অফিসার ফোর্স এই হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটনে একযোগে নেমে পড়লেন । ডিবি টিম আকাশের মাকে জিজ্ঞাসাবাদে আকাশের নিখোঁজের বিষয়ে কিছু ঘটনা জানতে পারে। তা হলো আকাশ পাবনা পলিটেকনিকের ভোকেশনালের ছাত্র ছিল। গত ৯ই মে আকাশ সকাল সোয়া নয়টার দিকে নিজ বাসা মন্ডলপাড়া হতে বের হয়ে যায়। সকাল ১০.৩০ মিনিটের দিকে আকাশের মা আকাশকে ফোন দিলে আকাশ বলে, ‘মা আমি পাবনা লঞ্চঘাট ব্রীজের দিকে আছি, কিছুণ পর আসছি’। ঘন্টাখানেক পর আকাশের ফোনে রিং দিলে সুইচ বন্ধ দেখায় । আকাশের কাছে দু’টি  ফোন ছিল। একটি বাটন সেট এবং আরেকটি  OPPO F5 YOUTH মোবাইল। ফোন বন্ধ থাকায় আকাশকে সবাই খোঁজাখুজি করতে থাকে। এদিকে আকাশের বিয়ে ঠিক হয়ে ছিল, আকাশের হবু বউও তাকে ফোন করতে থাকে।

এই ঘটনা জেনে এসআই অসিত ফোন দেয় এসআই সুব্রতকে বলে ‘স্যার মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ন তথ্য পাওয়া গেছে তাড়াতাড়ি আসেন।’ তথ্য প্রযুক্তি এবং স্থানীয় সোর্সের সহায়তায় ডিবির এসআই অসিত, এসআই সুমন  এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা  এসআই সুব্রতসহ অভিযান পরিচালনা করে সন্দেহভাজন আসামী আকাশকে (২১) আটক করে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর  তথ্য দিয়ে পুলিশকে ভিন্ন খাতে ডাইভার্ট করতে থাকে। ।জিজ্ঞাসাবাদে যোগ দেন অতিঃ পুলিশ সুপার (সদর)  এবং ডিবি পাবনার ওসি। প্রতিটি মুহূর্তে বিভিন্নভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে  সাহায্য করছিলেন পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর), পাবনা সদর থানার ওসি এবং সদরের  ইন্সপেক্টর তদন্ত।  আকাশকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্য়ায়ে বের হয়ে আসে হত্যাকান্ডের মূল রহস্য ।

আকাশকে হত্যার কারণঃ

নিহত জুয়েল রানা আকাশ আসামী আকাশের কাছে ৩৫০ টাকা পেতো। প্রায়ই পাওনা টাকা  আকাশ টাকা চাইলেএবং আসামী আকাশ বিরক্ত হতো । ঘটনার আগেরদিন ৮ই মে টাকা চাওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। শেষে এই মর্মে মীমাংসা হয় যে, ৩৫০ টাকার বিনিময়ে  আসামী পরদিন একটি বাটন মোবাইল সেট দিবে। ৮ই মে রাতে আসামী আকাশ ফোন করে আরেক আসামী বাপ্পি (১৯) কে বলে,‘বন্ধু একটা কাজ আছে, তুই তো আকাশকে চিনিস, আকাশের কাছে একটা   OPPO F5 মোবাইল  আছে, সেটা সহজইে পাওয়া যাবে। বাপ্পি বলে, কিভাবে কাজ হবে ? আসামী আকাশ  বলে, আমি ভিকটিম আকাশকে ফোন করে সকালে বলবো, বাটন মোবাইল সেট নিয়ে যা। সে যখন সেট নিতে আসবে, তখন আমি বলবো চল কিছুন কলাবাগানে আড্ডা মেরে আসি। তখন তুই এবং হৃদয় (১৮) আগে থেেক কলাবাগানে নিরিবিলি জায়গায় অবস্থান করবি। আমি রাস্তায় রিক্সা রেখে কলাবাগানে আকাশকে নিয়ে আসবো। সবাই মিলে যখন আড্ডা দিবো, তখন আমি উঠে গিয়ে পেছনে থেকে আকাশকে ইট দিয়ে আঘাত করবো।’ পরিকল্পনা মাফিক আসামী আকাশ, বাপ্পি এবং হৃদয় ঘটনার আগের রাতে ফোনে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার কথা সেরে নেয়। প্রধান আসামী আকাশ মনে মনে ভাবতে থাকে- তোকে বাটন মোবাইল জন্মের মত দিব, তুই খালি আয় কালকে। এখানে উল্লেখ্য আসামী আকাশ এবং হৃদয় অনেকে আগেই লেখাপড়া ছেড়ে রিক্সা চালায় এবং আসামী বাপ্পি বাবার মাদক ব্যবসা দেখাশুনা করে। এই বয়সেই সে মাদক কারবারিতে বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে । ঘটনার দিন সকাল সোয়া নয়টায় পরিকল্পনামাফিক আসামী আকাশ ভিকটিম আকাশকে ফোন দিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়।
বাড়ি হতে ৪ কি:মি দূরে নিরিবিলি চরশিবরামপুর সুইচগেইটের পাশের কলাবাগানে গেলে সবাই গল্প করতে থাকে এবং নেশার জন্য বিভিন্ন উপকরণ তৈরী করতে থাকে। আকাশ এসময় বলে আমি নেশা করি না, রোজা আছি। এই সুযোগে আসামী আকাশ সরে গিয়ে পিছন থেকে আগে থেকে আনা একটি ইট দিয়ে সজোরে আকাশের মাথায় আঘাত করে। সাথে সাথে আকাশ পড়ে গিয়ে চিৎকার দিলে অপর দুইজন মুখ এবং হাত পা চেপে ধরে। পর্যায়ক্রমে সকল আসামী আকাশের মাথায়, মুখ, চোখে, নাকে, কানে এবং দাঁতে আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে আকাশ নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এসময় আসামী আকাশ বলতে থাকে-‘আর টাকা চাইবি আমার কাছে? নে টাকা নে, বাটন মোবাইল নে।’ মুমূর্ষু  অবস্থায় পড়ে থাকা ভিকটিম আকাশের পকেট থেকে আসামী আকাশ একটি বাটন মোবাইল সেট, একটি OPPO F5 YOUTH মোবাইল এবং  হাজার/ বারোশ টাকা বের করে নেয়। মোবাইলটি বিক্রয় করে তারা টাকা ভাগ করে নিবে বলে পরিকল্পনা করে। মৃতদেহের কাছে বসে আসামীরা সকলে নেশা করে কলাবাগান থেকে বের হয়ে আসে।

এদিকে আকাশের মা চিন্তায় ক্ষণ গুনতে থাকে, কখন ছেলে বাড়ি ফিরবে ? আকাশের ফোনের জন্য আরেক প্রিয়জন অপো করতে থাকে । অপোর এই প্রহর কখন শেষ হবে।
আসামী আকাশের দেওয়া তথ্যে সহযোগী আসামী হৃদয় ও বাপ্পি গ্রেফতার হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা দোষ স্বীকার করে জবানবন্দী দেয়। আসামীদের হেফাজত হতে মৃত আকাশের কাছে থাকা মোবাইল সেট এবং যে ইট দিয়ে আকাশকে আঘাত করে হত্যা করা হয় সেই রক্তমাখা ইটও উদ্ধার হয় । বুধবার আসামীগরা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দীও  প্রদান করার মধ্য দিয়ে শেষ লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন।
আর এই রহস্য উদঘাটন ও আসামী গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হলো যে, পাবনার পুলিশ বিভাগের তৎপরতায় কোন অপরাধীর ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ##