প্রধান মেনু

বীর মুক্তিযোদ্ধা এম, নুরুল কাদের

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার গৌরব গাঁথা ইতিহাসে একটি নাম এম, নুরুল কাদের। ১৯৭০-৭১ সালে পাবনার জেলা প্রশাসক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের প্রথম জেলা প্রশাসক যিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন । ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাবনা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহন করে। ২৬ মার্চ কার্ফু জারী করে জনগনকে বাড়ীর বাইরে আসতে নিষেধ করা হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার নিজ বাসভবন থেকে নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য এডভোকেট আমিন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিসিক শিল্প এলাকায় সেনাক্যাম্পে নিয়ে ভয়ানক নির্যাতন করে তাঁকে হত্যা করা হয় । ২৮ এবং ২৯ মার্চ পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করা হয়। সেইযুদ্ধে পাবনার সকল স্তরের ছাত্র জনতা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্রযুদ্ধে অংশ নেয়। দুইদিনব্যাপী যুদ্ধে পাবনায় অবস্থানরত সমস্ত পাকসেনাকে হত্যা করে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত গোটা জেলাকে মুক্ত রাখা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাবনায় বেসামরিক প্রতিরোধ যুদ্ধে সমস্ত শত্রু সেনাদের হত্যা করে প্রায় দুই সপ্তাহ পাবনাকে মুক্ত রাখার ঘটনা ছিল তৎকালীন সময়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। উল্লেখিত বিষয়গুলি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাবনা জেলাকে স্মরনীয় করে রেখেছে।

২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা পাবনা শহরে প্রবেশ করে বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থান নেয় । রাতেই শহরের গোপালপুর থেকে এডভোকেট আমিন উদ্দিন ( আটঘরিয়া – ঈশ্বরদী থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য), পাবনা জেলা ন্যাপের ( ভাসানী) সভাপতি ডাঃ অমলেন্দু দাক্ষী, রাধানগর তৃপ্তিনিলয় হোটেলের মালিক ও মটর ব্যবসায়ী সাঈদ উদ্দিন তালুকদার সহ শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করে। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কৃষ্ণপুর মহল্লায় জানাজা নামাজে অংশ নেওয়া মানুষের উপর গুলিবর্ষন করে। এতে বেশ একজন মারা যান এবং বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাবনা শহরে প্রবেশ করেই জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারকে তলব করলে তারা পাকসেনাদের নির্দেশ অমান্য করে। ২৭ তারিখ দিনব্যাপী পুলিশ লাইনে অবস্থানরত পুলিশদের আত্মসমর্পন করার ঘোষনা মাইকে জানানোর পরেও ডিসির নির্দেশে তারা আত্মসমর্পণ করা থেকে বিরত থাকে। সন্ধ্যায় পাকসেনারা পুলিশ বাহিনীর উপর গুলিবর্ষন শুরু করলে পুলিশও পাল্টাগুলি চালাতে থাকে। এদিকে শহরের বিভিন্ন পাড়া থেকে শত শত ছাত্র জনতা শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থিত পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। তারা দেশীয় অস্ত্র, বন্দুক, বোমা দ্বারা আক্রমন করে পাকসেনাদের কোনঠাসা করে ফেলে। ২৮ তারিখ ভোরে পাবনার ডিসি এম, নুরুল কাদেরের নির্দেশে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার খুলে দিয়ে সমস্ত অস্ত্র বীর জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এমনকি ডিসি এম,নুরুল কাদের পাবনা জেলখানার সমস্ত বন্দীদের মুক্তি দিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহনের আহবান জানান। এরপর ২৮ মার্চ দুপুরের মধ্য শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত সমস্ত পাকসেনা নিহত হয়। ২৯ মার্চ বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থানরত পাকিস্তানী সেনাদের পরাস্ত করে দেশের প্রথম জেলা শহর হিসেবে পাবনা জেলাকে শত্রুমুক্ত করা হয়।

এরপর পাকিস্তানী সৈন্যরা দ্বিতীয় দফায় পাবনা প্রবেশের চেষ্টা করলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত নগরবাড়ী ঘাটে তুমুল প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে। একটানা কয়েকদিন যুদ্ধ চালিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভারী অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। ইতিমধ্যে পাবনায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী সর্বদলীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে জেলা প্রশাসক এম, নুরুল কাদের বৈঠক করে পাবনা ট্রেজারি থেকে বিপুল পরিমান অর্থ এবং অস্ত্র নিয়ে সহযোদ্ধাদের সাথে ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে যান। সেখান থেকে একটি বিশেষ ট্রেন নিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ট্রেনসহ ভারতে প্রবেশ করেন । ভারতে প্রবেশ করার পর কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং পাবনা ট্রেজারী থেকে নিয়ে যাওয়া টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেন।

১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে ( মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়) প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠিত হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠিত হয়। পরবর্তীতে উক্ত মন্ত্রী পরিষদ জেনারেল ওসমানীকে সর্বাধিনায়ক ঘোষনা করে স্বাধীনতাযুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার এম, নুরুল কাদেরকে সংস্থাপন সচিব, রহুল কুদ্দুসকে মুখ্য সচিব করে আসাদুজ্জামান খান, টি,এইচ, ইমাম, তৌফিক এলাহী চৌধুরী, আব্দুস সামাদ, মাহবুব আলম চাষী সহ প্রমুখকে সচিব নিয়োগ করেন। সংস্থাপন সচিব এর দায়িত্ব গ্রহন করে এম,নুরুল কাদের ঘোষনা করেন, আজ থেকে তাঁর নামের শেষে আর কখনোই খান লেখা হবেনা। এছাড়া দেশ স্বাধীন না করা পর্যন্ত বিলাসী জীবন যাপন করবেন না । এমনকি তিনি যুদ্ধের নয়মাস বেঁচে থাকার জন্য সাধারন খাবার খেয়েছেন। চুল দাড়ি কাটতেন না। ছোট একটি রুমে তিনজনের বসার ব্যবস্থা করে তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম পরিচালনা করতেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এমন ত্যাগী এবং দেশপ্রেমিক এই বীরের ইতিহাস এ প্রজন্মের কয়জন জানেন? হয়তো বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না। এমনকি উনার নামটাও হয়তো কেউ কোনদিন শোনেন নাই। মহান মুক্তিযুদ্ধের অসীম সাহসী বীর এম,নুরুল কাদের ১৯৩৫ সালে ২ ডিসেম্বর ঢাকা জেলার বিক্রমপুর টঙ্গিবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম ঝিলু। বাবা আব্দুল লতিফ খান ও মাতা কুলসুম বেগম। তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক ( এসএসসি) পাশ করেন। ১৯৫২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অফিসার পদে যোগ দেন। পরে শারিরীক সমস্যার কারনে ১৯৫৪ সালে বিমান বাহিনীর চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ১৯৬১ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ( সিএসপি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে উনি চাঁদপুর মহকুমা প্রশাসক ছিলেন। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭০ সালে পাবনার জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন।

এম,নুরুল কাদেরের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস বড় বেদনার। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সদ্য স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করলেন। সদ্য স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে কাজ করার পথে বাধাপ্রাপ্ত হলেন । জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের অধীনে যেসব অফিসাররা চাকুরী করেছেন তাঁরা পরবর্তীতে সুকৌশলে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বিরুদ্ধে দলবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এম,নুরুল কাদেরকে পদে পদে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। উল্লেখ্য স্বাধীনতার কিছুদিন পরেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ মন্ত্রীপরিষদ থেকে বাদ পড়েন। এরপরই তাজউদ্দিন আহমেদের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এম নুরুল কাদেরের উপর নেমে আসে বিড়ম্বনা। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সরকার এবং প্রশাসনের উপর অভিমান করে চাকুরী ছেড়ে দেন । এরপর দেশের বাইরে চলে যান। কয়েক বছর বিদেশে কাটিয়ে আবার দেশে ফিরে আসেন । শুরু করেন গার্মেন্টস ব্যবসা। জানা যায়, উনিই বাংলাদেশে প্রথম রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি আমৃত্যু নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ১৯৯৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এই মহান মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী এবং এক ছেলে এক মেয়ে রেখে এই পৃথিবী থেকে চীর বিদায় নেন ।

ক্ষনজন্মা বীর এম নুরুল কাদের আমাদের দিয়ে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ এই বীরকে কি দিয়েছে? প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা তাঁকে কিছুই দিতে পারি নাই। তার সাথের সহযোদ্ধারা রাষ্ট্রীয় খেতাব বীর উত্তম,বীর বিক্রম উপাধী পেয়েছেন। অথচ তাঁর ভাগ্যে কোন পদক জোটে নাই। বরং বলা যায় তাঁকে কোন পদক দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ সরকার প্রধান। এমন একটি সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা এম, নুরুল কাদেরকে মূল্যায়ন করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব বা রাষ্ট্রীয় পদক দেওয়া উচিৎ। এছাড়া পাবনা জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পাবনা পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করছি, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এই বীরের স্মৃতি রক্ষার্থে পাবনায় কোন স্থাপনা এম নুরুল কাদেরের নামে প্রতিষ্ঠিত করা হোক। ১৩ সেপ্টেম্বর এই বীরের মৃত্যু বার্ষিকী আনুষ্ঠানিক ভাবে পালন করা হোক। এ প্রজন্মের মানুষকে অসীম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা এম নুরুল কাদেরের জীবনকর্ম সম্পর্কে জানানো দরকার। আশাকরি নিকট ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে । ঘুষ, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসনের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে । ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী হোক। মেহনতি জনতার জয় হোক। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। ( সমাপ্ত )

লেখক পরিচিতি –

আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।