প্রধান মেনু

মুটিয়ে যাচ্ছে ঘরবন্দি শিশুরা

রাজধানীতে তিন মাস ঘরে বন্দি থাকার পর ১০ বছর বয়সের রাহুলের স্বাস্থ্য এতে বেড়ে গেছে যে চিকিত্সক জানিয়েছেন তারা হাঁটাচলা করা জরুরি। কিন্তু শহরে লকডাউন আর করোনা সংক্রমণের এই সময়ে তা করা সম্ভব নয়। তাই লকডাউন খুলতেই রাহুলকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রামে দাদুর বাড়িতে। এখন রুহুল আর রাজধানীতে ফিরতে চাইছে না বন্দিজীবনে ফেরার ভয়ে। রাহুলের মা মনিকা ইসলাম বলেন, ‘ছেলেকে কী কষ্টে যে তিন মাস ঘরে আটকে রেখেছিলাম, তা বলার বাইরে। বাসায় কেক, পেস্ট্রি, বার্গার, ফ্রেঞ্চফ্রাই—এসব খাবার খেয়ে বাচ্চাটার ওজন ভয়াবহ রকমের বেড়ে যায়।’

১০ বছরের রাহুল বলে, ‘গ্রামে আমি অনলাইনে ক্লাস তো করছিই। পাশাপাশি আমি গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, পুকুরপাড়ে বসে মাছ ধরা দেখতে পাচ্ছি, যা ঢাকার বাসায় বসে এসব কিছুই করার সুযোগ নেই।’ এ কারণে স্কুল না খোলা পর্যন্ত সে আর ঢাকা ফিরতে চাইছে না। পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে আবিশাকে নিয়ে ফেসবুকে গান করতে দেখা যায় বাবা ফুয়াদ হাসানকে।

তিনি বলেন, তারা দেশের বাইরে থাকেন। লকডাউনের আগে আত্মীয়ের বিয়েতে দেশে এসে আর ফিরে যেতে পারেননি। ফলে বন্দি চার মাসে মেয়ে বাংলা কথা, বাংলা গান রপ্ত করেছে। অভিভাবক সায়মা রহমান বলেন, করোনা সংক্রমণের তিন মাস ঘরবন্দি শিশুরা ভাষা শিখছে, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, গেমস—সবই করছে অনলাইনে। আর পড়াশোনা! সে তো শিশুদের চাইতে অভিভাবকেরাই করছেন বেশি। এভাবে একঘেয়ে জীবনে অতিষ্ঠ শিশুরা।

গত ১৬ মার্চ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। অভিভাবকেরা শিশুদের জোর করে হলেও ঘরে রাখার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘদিন স্কুলের মাঠে বন্ধু-সহপাঠীদের সঙ্গে ছোটাছুটি নেই। হাঁটাচলাও নেই বাবা-মায়ের হাত ধরে বাইরে। তাই ঘরের চারদেওয়ালে একরকম বন্দিজীবন কাটছে তাদের।

এদিকে করোনা প্রতিহত করতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিত্সকেরা। কিন্তু সেই চাইদা মেটাতে গিয়ে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। এভাবে শিশুরা শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও অনেক সময় অবসাদে ভুগছে। ঘরে বসে খাওয়া, ঘুম আর মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া এখন তাদের আর কোনো কাজ নেই। ঘরে থাকার কারণে বাইরের খাবার খাওয়ার সুযোগ না থাকলেও ঘরে বসেও তাদের নানা খাবারের আবদার মেটাতে গিয়ে বাড়ছে ওজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম আর শারীরিক পরিশ্রমের অভাব শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে স্থূলতার দিকে। লকডাউনে বাইরে কাজ না থাকায় ঘুম ও খাওয়ার সময়েও অনিয়ম দেখা দিয়েছে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই, যা স্থূলতার ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে বলে জানান তারা। সম্প্রতি এক গবেষণায় এর ক্ষতিকর প্রভাব উঠে এসেছে।

‘শৈশবে ওজন বাড়ার কারণে কুপ্রভাব পড়তে পারে পরিণত বয়সে’ শিরোনামে এই গবেষণার সহ-লেখক, যুক্তরাষ্ট্রেও ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর মাইলস ফেইথ বলেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারির ক্ষতিকর প্রভাব শুধু ভাইরাস সংক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লকডাউনের কারণে শিশু-কিশোর সবাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার। সাধারণত স্কুলের গরমের ছুটিতে শিশু-কিশোরদের ওজন বাড়তে দেখা যায়। এ থেকেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই লম্বা সময় ঘরে আটকে থাকায় তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা কী হতে যাচ্ছে? এই গবেষণার জন্য খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম আর ঘুম সম্পর্কিত তিন সপ্তাহের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ইতালির বাধ্যতামূলক দেশব্যাপী লকডাউনের সময়। আর তার তুলনা করা হয় ২০১৯ সালে নেওয়া তথ্যের সঙ্গে।

বৈদ্যুতিক পর্দার সামনে সময় কাটানোর মাত্রা, মাংস, স্ন্যাকস, ফল ও সবজি খাওয়ার মাত্রা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয় এই গবেষণায়। ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব প্রমাণিত হয়। দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গত্বাঁধা রুটিনের মাঝেও যেসব শিশু স্থূলতায় ভুগছিল, তাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার সমস্যাগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।