গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইনরা বাড়িঘরে লুট, নারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় উগ্রবাদী রাখাইনদের ভয়াবহ নির্যাতন চলছেই। লুট করা হচ্ছে ঘরবাড়ি। নারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর পুরুষ ও শিশুদের ঘরের ভেতরে রেখে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে সৈন্যরা। কেউ পালাতে চাইলে গুলি করে হত্যা করছে। এভাবে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র রাখাইনরা।

গতকাল মঙ্গলবার দিনভর সীমান্তবর্তী উখিয়া এলাকার জিরো পয়েন্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার টহল দিতে দেখা গেছে। বিকাল চারটার দিকে তমব্রুর জিরো পয়েন্ট থেকে কিছুটা দূরে একটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখা যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই সেখানকার গ্রামগুলোর তিন চারটি স্পট থেকে ধোঁয়ার কুন্ডুলি উড়ে। খানিক পরেই হেলিকপ্টারটি আবার সেখানে এসে উড়তে থাকে।

সোমবার রাতে উখিয়ার একটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন নুরুল করিম (৩৫)। তিনি জানান, তাদের বাড়ি ঢেকিবুনিয়া গ্রামে। সেখানকার বেশিরভাগ বাড়িঘরই পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তার ছোটভাইকে সৈন্যরা গত শনিবার ধরে নিয়ে যায়। রবিবার তিনি তার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে স্বজনদের সঙ্গে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন। সোমবার বাড়ির অদূরে একটি ডোবায় ভাইয়ের লাশ খুঁজে পান। পরে লাশ দাফন করেই তিনি এপারে চলে আসেন।

রাথিডং এলাকা থেকে টেকনাফ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মনোয়ারা আক্তারী নামের এক গৃহবধূ। গতকাল দুপুরে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, শনিবার সৈন্যরা তার স্বামীকে চোখের সামনে গুলি করেছে।

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা বলছেন, উত্তর মংডু, দক্ষিণ মংডুর গ্রামে গ্রামে সৈন্যদের তাণ্ডব চলছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় যাচ্ছে সৈন্যরা। কিছু এলাকায় রাতের বেলা কারফিউর কথা বলা হচ্ছে। কারফিউর ভয়ে কেউ ঘর থেকে বের হয় না। আর এরমধ্যেই সৈন্যরা ঘরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সীমান্তবর্তী কি কান পিং, কোনেবং, বুথিডং, চেইনখালীসহ অনেক এলাকায় গ্রামের পর গ্রামে কেবল পোড়া ছাই ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

এদিকে, কয়েকজন রোহিঙ্গা এক্টিভিস্ট ও ব্লগার নিয়মিত ফেসবুক, ইউটিউভ ও টুইটারে স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সহায়তায় সেখানকার সহিংসতার খবর প্রকাশ করছেন। এসব খবর কতটুকু সত্য তা যাচাইয়ের সুযোগ না থাকলেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

রো নে সান লুইন একজন এক্টিভিস্ট। যিনি পড়াশোনা করেছেন ইয়াঙ্গুন ইউনিভার্সিটিতে। এখন তিনি বসবাস করছেন লন্ডনে। সেখান থেকেই তিনি স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় তার নিজের পরিচালিত রোহিঙ্গা ব্লগার নামের একটি ব্লগে নিয়মিত মিয়ানমারের সহিংসতার খবর প্রকাশ করছেন। ব্লগটির গত কয়েকদিনের যে সকল আপডেট দেয়া হয়েছে তার অনেকগুলোর সাথেই অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের তথ্যে মিল রয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে- এরচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা, লুট আর হতে পারে না। পুরো বিশ্বের এদিকে নজর দেয়া উচিত।

এমনই আরেকজন এক্টিভিস্ট এম এস আনোয়ার। তিনি পড়াশোনা করেছেন ওয়েস্টমিনিস্টার কলেজে, বসবাস করছেন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, রোহিঙ্গাদের চিরতরে উচ্ছেদ করতে চাইছে ওরা।

চট্টগ্রাম মেডিক্যালে আরো দুই রোহিঙ্গা

মিয়ানমারে গুলিবিদ্ধ খালেদা আক্তার ও মামুনুর রশিদকে গত সোমবার গভীর রাতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে মামুনুর রশিদের মুখে আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। সীমান্তের ওপারে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর গত কয়েকদিন ধরে অগ্নিদগ্ধ,  গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত রোহিঙ্গাদের চিকিত্সার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যালে পাঠাচ্ছে বিভিন্ন এনজিও। কক্সবাজার ডিজিটাল হাসপাতালেও রোহিঙ্গাদের চিকিত্সা চলছে।

৬১৬ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত

সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত হোয়াইক্যং ও উনছিপ্রাং পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে ৬১৬ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিজিবি ২ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

জিরো পয়েন্টে রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশ থেকে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই এখনো সীমান্ত এলাকার নো ম্যানস ল্যান্ড ও জিরো পয়েন্টগুলোতে অবস্থান করছে। উখিয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে যেসব রোহিঙ্গাদের বিজিবি ফেরত পাঠিয়েছে তাদের অধিকাংশই জিরো পয়েন্টে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে। আবার সীমান্তের ওপারে অব্যাহত গোলাগুলির কারণে অনেক এলাকায় কিছু কিছু রোহিঙ্গাকে সাময়িক আশ্রয়ের সুযোগ দিচ্ছে বিজিবি। তবে গোলাগুলি থামলে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। গতকাল টেকনাফের দমদমিয়া সীমান্তে ৩২ জন রোহিঙ্গাকে দিনের বেলা সাময়িক আশ্রয় দেয় বিজিবি।

থেমে নেই অনুপ্রবেশ

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইসসিআর বলছে, গত রবিবার পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে ৫ হাজার ২শ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, গতকাল পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা টেকনাফ থেকে নাইক্ষংছড়ি পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এর মধ্যে কেবল সোমবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করেছে অন্তত পাঁচ হাজারের অধিক।

টেকনাফ সংবাদদাতা জানান, গতকাল ভোররাতে মংডুর রইগ্যাদং ও পুছিংগ্যা পাড়ায় কয়েকটি পরিবারকে আনতে দুটি নৌকা নিয়ে বাংলাদেশিসহ ছয়জন সেখানে যায়। তাদের লক্ষ্য করে বিজিপি ও মিয়ানমার নৌবাহিনী  গুলিবর্ষণ করলে তারা যে যেদিকে পেরেছে পালিয়ে যায়। এদিকে, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তা করার অভিযোগে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  তিনজনকে কারাদণ্ড দিয়েছে।

লামা (বান্দরবান) সংবাদদাতা জানান, নাইক্ষ্যংছড়ির চাকডালা, আশারতলী, ফুলতলা ও জামছড়ি এলাকায় সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বহু রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। খোলা আকাশের নিচে বিপর্যস্ত অবস্থায় সময় কাটাচ্ছে তারা। তিনদিনের উপোস অনেক শিশুকে নিয়ে মা-বাবা আহাজারি করছে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবু আহম্মদ জানান, মিয়ানমার বাহিনীর গুলির আওয়াজে সীমান্ত ঘেঁষা তুমব্রু, দক্ষিণ ঘুমধুম ও ভাজাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মো. এরশাদুল হক সাংবাদিকদের জানান, সোমবার মিয়ানমান বাহিনীর ছোড়া একটি বুলেট সকাল ৮টায় ঘুমধুমের টুমরো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং অপর ১টি বুলেট তুমব্রু বাজারে পড়ে। যার কারণে এলাকার মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্নেল আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন, ঘুমধুম, তুমরু, আশারতলী ও চাকডালার জিরো পয়েন্টে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামে সমাবেশ

এদিকে চট্টগ্রামের এক মানববন্ধন থেকে মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে আশ্রয়দানের দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন আয়োজন করে বিশ্ব সুন্নি আন্দোলন ও বিশ্ব ইনসানিয়াত বিপ্লব, বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মহানগর শাখা।
সুত্র; ইত্তেফাক

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author