একাত্তরের স্মৃতিচারণ……….. দাঁতিয়া কয়রাপাড়া রেল লাইন ধ্বংসের বিবরণ

–এবাদত আলী —
১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। পুরা বর্ষাকাল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আমাদের মুক্তি বাহিনীর গ্রুপ কমান্ডার ঈশ্বরদীর ওয়াছেফ আলীর অধিনে টুআইসি জয়নাল আবেদীনসহ আমরা ২২জন আটঘরিয়ার বাঐখোলা রিকাত মেম্বারের বাড়ির শেল্টারে অবস্থান করে ছয় দাঁড়ের নৌকা নিয়ে হাদল ও আশেপাশে রাজাকার ও পিস কমিটির হোতাদেরকে শায়েস্তা করার পর উপরের নির্দেশ মোতাবেক পাশ্ববর্তী চাটমোহর থানার দিলালপুরে টালক প্রামাণিকের বাড়ির শেলটারে গিয়ে উঠি। আর এই শেলটারের বিশেষত্ব ছিলো এই যে, আটঘরিয়া থানার একজন সাহসি মুক্তিযোদ্ধা লক্ষণপুর গ্রামের রাজেম উদ্দিনের ছেলে রফিকুল ইসলাম রফিক আমাদের সাথে ছিলেন এবং একই গ্রামের বাসিন্দা আটঘরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ মাস্টার ছিলেন আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ নেতা। তারা দুজন মিলে দিলালপুরের টালক প্রামানিকের বাড়িতে মুক্তি বাহিনীদের আস্তানা খোলার ব্যাপারে অগ্রণি ভুমিকা পালন করেন। তাই ফৈলজানা অপারেশন শেষে ঐ রাতেই আমরা গিয়ে সেখানে গিয়ে উঠি। লতিফ মাস্টার আর রফিক আগে থেকেই যোগাযোগ করে রাখায় আমাদের কোন বেগ পেতে হলোনা। দিলালপুর গ্রামের ধনাঢ্য ও সাহসি ব্যক্তি টালক প্রামাণিক নিজেদের থাকার ঘরটি আমাদের জন্য ছেড়ে দিয়ে পাশের একটি ছাপরা ঘরে গিয়ে উঠলেন। দেখে দারুন মায়া হলো। হায়রে মুক্তি পাগল বাঙালি, বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য তারা কিইনা করেছে। বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে অজ পাড়া গাঁয়ের লোকও মুক্তির জন্য মরিয়া। যাক আমাদের নৌকাটি নদীর মাঝ বরাবর ডুবিয়ে রাখা হলো। আর এ ব্যাপারে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন দিলালপুর গ্রামের সোবহান, আব্দুর রশিদ, ভাদু প্রামাণিক, আব্দুল কুদ্দুস, লক্ষনপুরের লতিফ মাস্টার ও মিনাজ উদ্দিন। তারা রাতভর জেগে জেগে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
অপর দিকে আমাদের পৌছানোর সঙ্গে সঙ্গে টালক প্রামাণিকের স্ত্রী ও আশেপাশের কয়েকজন মহিলা গরম ভাত ও মাসকালাইয়ের ডাউল পাক করে ধামাও পাতিল ভর্তি করে ফেল্লেন। পরিবেশনের আগেই মাসকালাইয়ের ডাউলের মনমাতানো সুবাস যেন আমাদেরকে পাগল করে তোলে। সত্য বলতে কি খাবারের সময় কারো কোন খেয়াল নেই। এমন সুস্বাদু ডাউল জীবনে কোন দিন খেয়েছি কিনা মনে পড়লোনা। সকলের মুখেই যেন সড়াৎ সড়াৎ শব্দ। খাবার পর ছয়জন করে পালাক্রমে ডিউটির ব্যবস্থা রেখে কমান্ডার ঘুমানোর আদেশ দিলে মুহূর্তের মধ্যে আমরা ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। কয়েক দিনের ক্লান্তি মাথায় নিয়ে এমন শান্তির ঘুমের কথা ভাষায় প্রকাশ করা কোনদিনও সম্ভব নয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে যতগুলো সেল্টারে অবস্থান করেছিলাম তার মধ্যে টালক প্রামাণিকের বাড়ির শেল্টারের তুলনা হয়না। এভাবেই অতি নিরাপদ বেষ্টনির মধ্যে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল।
কমান্ডার আমাদেরকে সেদিন দুপুরের দিকে তৈরি হতে নির্দেশ দিলেন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় রইলাম। টুআইসি জয়নাল আমাদেরকে এসাইনমেন্ট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিলেন। আমাদের ছয় দাঁড়ের নৌকার বদলে কাজের সুবিধার জন্য স্থানীযভাবে কয়েকটি ডিঙি নৌকার ব্যবস্থা করা হলে আমরা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে তাতে গিয়ে চড়লাম। প্রত্যেকের মাথায় মাথাল, গলায় পেঁচ দেয়া গামছা। ময়লা গেঞ্জি গায়ে। লুঙ্গি মালকোচা মারা। নৌকার মাচালে আগুনের আ’েল যাতে তামাক সেবনের জন্য আগুনের ব্যবস্থা। সকলেই আমরা বিলের মাঝে উড়ি (এক ধরনের ঘাস যা পানিতে ভেসে থাকে।) ঘাস কাটার কৃষক।আমাদের নৌকায় ছিলেন রাধানগর ময়দানপাড়ার হামিদ। সে কলকেতে তামাক ও আগুন দিয়ে পড়াৎ পড়াৎ করে হুকা টেনে ধুয়া ছাড়তে লাগলো। সে এক মজার ডিজগাইজ।
আমাদের কাজ হলো চাটমোহর থানার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের দাঁতিয়া কয়রাপাড়া রেলওয়ে ব্রিজ মাইন সেট করে উড়িয়ে দেয়া। এদিন ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। দিবসটি পালন করতে পাকিস্তানি হায়নার দল যেমন ব্যস্ত তাদের পাশাপাশি এদেশীয় দোসর রাজাকার আর পিস কমিটির নেতা-কর্মিরা মহা ব্যস্ত। এদিন প্রায় সকলেই পাবনা জেলা শহর ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা শহরে তাদের পেয়ারে দোস্তদের সঙ্গে মোলাকাত করতে গেছে। এই সুযোগে দিনের বেলাতেই ব্রিজ উড়িয়ে দিতে হবে। নইলে বিকাল ৫টার সময় রাজাকাররা ব্রিজ পাহারায় দায়িত্বে থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করে।পাবনা সিরাজগঞ্জ রেলপথে তখন নামে মাত্র দুএকটা ট্রেন চলতো।তাও আবার প্রায় যাত্রি শুন্য। মালামাল পরিবহনের জন্য তেমন রেল যোগাযোগ ছিলোনা। লতিফ মাস্টার রফিকুল ইসলাম রফিক, সোবহান, কুদ্দুস, রশিদ, ভাদু ও মিনাজ স্থানীয় হওয়ায় বিলের মাঝ দিয়ে কচুরিপানা, ধাপ, দাম ও উড়ির ক্ষেত মাড়িয়ে লগি এবং বৈঠা বেয়ে বেয়ে আমাদের নৌকা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগুতে লাগলো।
দুরে রেল লাইন দেখা যাচ্ছে। আমাদের মনের মধ্যে রোমাঞ্চের মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় দাঁতিয়া কয়রাপাড়া প্রান্তের রেলওয়ে ব্রিজের কাছে পৌছে গেলাম। পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক মাইন সেট করে ডেটোনেটর স্থাপনের মাধ্যম ফিউজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। শক্তিশালি মাইনটি বিস্ফোরিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে রেলওয়ে ব্রিজ ও দুপাশের রেল লাইন ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে গেল। আশে পাশে কোন বাড়ি-ঘর নেই। আমরা বিলের অথৈই পানিতে উড়ির জমির মধ্যে নৌকা থামিয়ে পরবর্তী ঘটনা অবলোকন করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমাদের উদ্দেশ্য পাকাপোক্ত, কারণ বিকালে অন্য প্রয়োজনে ট্রেন চলাচল না করলেও রাজাকারদের ব্রিজ পাহারার জন্য প্রত্যেকটি ব্রিজে নামিয়ে দেয়ার জন্য অবশ্যই ট্রেন আসবে। বিকাল ৫টার দিকে সিরাজগঞ্জের দিক হতে একটি যাত্রি বাহি ট্রেন আসছে দেখা গেল। ক্রমেই ট্রেনটি কাছে আসছে। একসময় ব্রিজের নিকটে এসে ট্রেনটি থামতে থামতে হুড়মুড় করে বিলের পানিতে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে গেল। দুর থেকে অনুমান করা গেল ট্রেনটিতে কোন সাধারণ যাত্রি ছিলোনা। যারা ছিলো তারা পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আর পিস কমিটির লোকেরা। সবাই পনিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। কমান্ডারের নির্দেশে আমরা ফায়ার ওপেন করলাম। দুর থেকে বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ করা হলো। পাকিস্তানি আর্মি পাল্টা কোন গুলি না ছুড়ে তাদের জীবিত দোসরদেরকে নিয়ে রেল লাইনের উত্তর পাশ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কোন মতে জীবন বাচিয়ে পালিয়ে গেল। ট্রেন দূর্ঘটনায় যারা নিহত হয়েছিলো তাদের দিকে তারা ফিরেও তাকালোনা। যেন চাচা আপন জান বাঁচা। পরে জেনেছিলাম বহুসংখ্যক পাকিস্তানি আর্মি এবং তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর বিপুল পরিমান সদস্য করুনভাবে মৃত্যু বরণ করেছিলো। (লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
প্রেরক ঃ এবাদত আলী
সদস্য, পাবনা প্রেসক্লাব
মোবাইল ০১৭১২২৩২৪৬১

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author