একাত্তরের স্মৃতিচারণ ৫ রাজাকারকে বন্দিকরণ

-এবাদত আলী-
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শেষের দিকে মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর তৎপরতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নাভিশ্বাস ওঠে। তারা তৎকালিন পুর্ব-পাকিস্তানের ভুখন্ডে একঘরে অবস্থায় আটকা পড়ে। কারণ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পুর্ব পাকিস্তানের দুরুত্ব প্রায় ১২শ মাইল। তাছাড়া এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তের যোগাযোগের জন্য সরাসরি কোন ভুখন্ড ছিলোনা। ভারত ভুভাগের উপর দিয়ে অথবা ভারতের দীর্ঘ সিমান্ত পথ অতিক্রম করে যাতায়াত করতে হতো। তাই তারা নিজেদের দেশে ফিরে যাবার জন্য চেষ্টা করলেও সহজে যেতে পারবেনা ভেবে একেবারেই ভেঙে পড়েছিলো।সেই সাথে তাদের এ দেশিয় দোসর রাজাকার আলবদর আল শামস এতদিন ধরে যারা তাদেরকে সঙ্গে করে নীরিহ নিরপরাধ লোকজনের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছিলো লুট তরাজ করেছিলো এবং নির্বিচারে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিলো এবং হত্যাকান্ডে সহযোগিতা করেছিলো সেই সকল ব্যক্তিগণের মধ্যেও দারুন উৎকন্ঠা দেখা দেয়। তাদের মনের মধ্যে সকল সময় কস্প জ্বর বইতে থাকে। কি জানি যদি এই সাধের পুুর্ব-পাকিস্তান-পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায় অর্থাৎ যদি এই দেশ স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে তাদের কি গতি হবে। রাজাকারদের মুরুব্বি বা লিডাররা অবস্থা আঁচ করতে পেরে আগে ভাগেই পশ্চিম পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে থাকে। কিন্তু গরিব রাজাকারগন যারা মাসে ৭৫ টাকা বেতন ও রেশন পেতো তাদের অবস্থা ক্রমান্বয়ে কাহিল হতে থাকে।
এমনি কিছু রাজাকার ছিলো তৎকালিন সিরাজগঞ্জ মহকুমার শাহজাদপুর থানায়। সেসময় বৃহত্তর পাবনা জেলার পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মওলানা সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া ওরফে দুদু মওলানা। পিস কমিটির সদস্যদের মধ্যে আবু ইউছুফ ও ময়না মিয়ার নাম ছিলো উল্লেখযোগ্য। শাহজাদপুর থানার সিও (রেভ) গোলাম কিবরিয়ার নামও তখন দালালদের খাতায় ছিলো।পিস কমিটির চেয়ারম্যান দুদু মওলানার অধিনে শাহজাদপুর থানায় যে রাজাকার বাহিনী ছিলো তার কমান্ডার ছিলো তারই শ্যালক মজিবর। অন্যান্য রাজাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজাকার ছিলো জুব্বার কানা (এক চোখ অন্ধ), সদা মোল্লা, মনো ও ছকিম। রাজাকার কমান্ডার মজিবরের অত্যাচারে গোটা শাহজাদপুর থানার লোকজন সব সময়ই তটস্থ থাকতো। তার বিশাল রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা যে কোন সময় যে কোন বাড়িতে গিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যুবতি মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে শাহজাদপুর ইপসিক শিল্প নগরিসহ অন্যান্য আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যেতো। তারা পাকিস্তানি আর্মিদেরকে সঙ্গে করে বিভিন গ্রামেগিয়ে বাড়ি-ঘরে লুটতরাজ করতো, আগুন ধরিয়ে দিতো এবং নীরিহ লোকজনকে গুলি করে হত্যা করতো।
সে সময় শাহজাদপুরের সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ যারা ছিলেন তারা হলেনঃ জাতীয় পরিষদ সদস্য, শাহজাদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ হোসেন মনসুর। তিনি ছিলেন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক। সংগ্রাম কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ হলেন, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান, কাদাই বাদলার মোঃ আলতাফ হোসেন, আব্দুল বাকি মির্জা, গোলাম আজম, ওহিদ খান,সরফুদ্দিন আওয়াল, আবুল মতিন মোহন, আবু আশরাফ, খন্দকার হেলাল উদ্দিন, আব্দুল গফুর সরবত, সিদ্দিক নায়েব,ফরহাদ হোসেন, আমির লোদি এবং শাহজাদপুর কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি সহিদুজ্জামান হেলাল প্রমুখ। তারা সবাই ছিলেন মুক্তিফৌজ বা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন শাহজাদপুর পোতাজিয়ার আব্দুল মতিন মোহন। আমি ছিলাম টুআইসি।আমাদের অস্থায়ি ক্যাম্প ছিলো পোতাজিয়া ও রাউতারা পাথার এলাকায়। তখন বর্ষাকাল বলে আমরা বেশিরভাগ সময়ই বজরা নৌকাতে অবস্থান করতাম। নৌকাতেই রান্না-বান্নার ব্যবস্থা ছিলো। জরুরি প্রয়োজন মিটানোর জন্য সঙ্গে থাকতো ডিঙি নৌকা। মাঝে মধ্যে পোতাজিয়ার হামিদ চৌধুরিসহ বেশ কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতাম।
পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকারদের অবস্থা যখন ছ্যাড়াবেড়া তখন আমরা রাজাকারদেরকে পাকড়াও করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এরই মধ্যে খবর আসে যে, পোতাজিয়ার পশ্চিমে ধলাই নদীতে জেলেরা খোড়া জাল ও বেড় জাল দিয়ে সারা রাত ধরে যে মাছ ধরে তা প্রতিদিন শাহজাদপুরের একদল রাজাকার জোর করে নিয়ে যায়। তারা একটি ডিঙি নৌকায় তাদের হাতের থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও কিছু গোলাবারুদ নিয়ে এসে জেলেদেরকে গুলি করার ভয় দেখিয়ে মাছ নিয়ে সকলে ভাগাভাগি করে মজা করে খায়। গরিব জেলেরা তাতে কোন প্রতিবাদ করার সাহস পায়না।
এই খবর আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছামাত্র ঐসকল রাজাকারদেরকে শায়েস্তা করার জন্য ফন্দি আাঁটা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক কয়েকজন মুক্তিফৌজকে ধলাই নদীতে মাছ ধরারত জেলেদের কাছে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। তারা খোড়া জাল, বেড় জাল ও ঝাঁকি জালসহ বিভিন্ন কায়দায় মাছ ধরা পুরাপুরি রপ্ত করে। প্রাথমিকভাবে জেলেদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করা হয়। কিন্তু জেলেরা কিছুতেই রাজি হতে চায়না। মুক্তিফৌজদের পক্ষ থেকে তাদেরকে পুর্ণ নিশ্চয়তা দিলে তারা অপারেশন পরিচালনায় সহযোগিতা করতে রাজি হয়।
পুর্ব-পরিকল্পনা মোতাবেক পালাক্রমে দুএকজন মুক্তিফৌজকে মাছ ধরার নৌকায় রেখে দেয়া হয়। রাজাকাররা মাছ নিতে গেল তারা কিছুই বলেনা। রাজাকাররা বিভিন্ন ধরণের টাটকা মাছ পেয়ে খুশি মনে চলে যায়।তারা ঘুর্ণাক্ষরেওবিষয়টি টের পায়না। এভাবেই মাছ ধরার লোক বদল করা হতে থাকে। ঘটনার দিন সকাল বেলা ধলাই নদীর উজানে কয়েকটি ডিঙি নৌকাতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিফৌজগণ কাশবনের আড়ালে বেশ কিছু দুরত্ব বজায় রেখে পজেশন নিয়ে থাকে। সেদিন মাছ ধরারত মুক্তিফৌজদের নৌকার পাটাতনের নিচে কিছু অস্ত্র ও গোলা-বারুদ রেখে দেওয়া হয়। নিত্যদিনের মত ঘটনার দিন ভোর হতে না হতেই ৫জন রাজাকার থ্রিনটথ্রি রাইফেল হাতে মাছ নিতে যায়। কিন্তু জেলে রূপি মুক্তফৌজগন তাদের কাছে মাছের দাম চায়। তারা মিনতি করে বলে স্যার আপনেরা পেত্তেক দিন মাছ লিয়ে যান আমরা কিছু কইনে স্যার। স্যার আমরা গরিব মানুষ স্যার প্যাটে খাবের চায়, আমাদের কিছু ট্যাকা দিয়ে যান। রাজাকারদের মধ্য থেকে একজন বলে শালার ছোটলোকের জাত আমারে তুই চিনিস বলে রাইফেল তাক করে। জেলে রূপি মুক্তিফৌজ হাত জোড় করে ক্ষমা চায়। আরেকজন বলে আপনেরা অত রাগারাগি করেন ক্যা স্যার। আমাদের কিছু ট্যাকা দেন তা না হলি আমরা বাল-বাচ্চা লিয়ে না খায়ে থাকবোনে স্যার। আরেকজন রাজাকার বলে শালা হারামজাদা তোক গুলি করে নদীতে ভাসায়ে দেবো শালা। এমনি কথপোকথনের মধ্যে দুরের নৌকাগুলো অতি নিকটে চলে আসে। তারা জেলেদেরকে বলে এই ভাই তোমাদের কি হইছে, এত পাছড়াপাছড়ি করতেছাও ক্যা। জেলেরা নালিশ জানায়। ওমনি সবাই অস্ত্র বের করে রাজাকারদের দিকে তাক করে ধরে। শালারা একটু নড়েছিস তো গুলি করে দেবো। জেলেরূপি মুক্তিফৌজরাও নৌকার পাটাতনের নিচে থেকে অস্ত্র বের করে। রাজকাররা এতক্ষণে সব ঘটনা বুঝতে পেরে হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে প্রাণ রক্ষার জন্য সকলের পায়ে পড়তে থাকে। তাদেরকে পাইকারি হারে লাথিগুড়ি দিতে দিতে আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্প বজরা নৌকাতে নিয়ে যায়। তারা জীবন বাঁচানোর জন্য আমাদের হাতে পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করে।তারা আমাদের পা ছুয়ে গা ছুয়ে তাদের চোখ ছুয়ে অসংখ্যবার কিরা কসম কাটতে থাকে। তাদেরকে হত্যা না করে মুক্তিফৌজদের অস্থায়ী ক্যাম্পে ক্যাম্পে কড়া পাহারায় রাখা হয়। এ খবর আর্মি ক্যাম্প ও রাজাকার ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর তারা বেশ ভীতশন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তারা আমাদের ক্যাম্পেই বন্দি অবস্থায় দিন কাটাতো।
(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট )

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author