ইতিহাসের পাতায় চাটমোহর শাহী মসজিদ

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমূহ দেশের অমূল্য সম্পদ। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চল ঘুরলেই চোখে পড়বে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বহু বছর পরেও তার অবকাঠামোসহ নির্মাণ শৈলী আধুনিক প্রত্ন শৈলীকে হার মানায়। বিশেষত: তখনকার সমাজ-সংস্কৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে, যে সময়ে ঐ সব নিদর্শন তৈরী হয়েছিল তখনকার সমাজ এতাটা শিক্ষিত ছিল না , সহজলভ্য ছিল না এর নির্মান শিল্পী ও নির্মান সামগ্রী। এর জন্যে প্রয়োজণীয় অর্থ ও তা ব্যয়ের মানসিকতার বিষয়টি ভাবনার। কিন্তু এসব রুচিশীল প্রত্ন নিদর্শন আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তা নিয়ে অনেক কিছু ভাববার আছে। ঐ সময়ের মানুষ ও মানসিকতার বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করলে নুতন কোন ইতিহাসে পাওয়া যাবে যা আমাদের জনপদের মানুষের ইতিহাসকে এগিয়ে নেবে দূর থেকে দূরে। এসব স্থাপত্য শৈলীর অপরূণ নিদর্শণ হওয়া সত্ত্বেও কোন ইতিহাস এই সব নিদর্শনকে কেন্দ্র করে স্বাতন্ত্র ভাবে গড়ে উঠে নি। বরং প্রত্যেকটি প্রত্ননিদর্শনই অযত্ন অবহেলার নির্মম সাক্ষী। এমনি একটি প্রাচীন নিদর্শন পাবনার চাটমোহর উপজেলা সদরে যুগ যুগ ধরে দাড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক মাসুম খাঁর মসজিদ চার শতাধিক বছর পূর্বে নির্মিত মাসুম খাঁ কাবলীর মসজিদটি কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে চাটমোহর উপজেলা পরিষদের পশ্চিমে। অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ এর চলনবিলের ইতকথা গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবরের শাসনামলে সৈয়দ নেতা আবুল ফাতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর অর্থায়নের তারই সহোদর খাঁন মোহাম্মদ কাকশাল কর্তৃক ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে চাটমোহরে মাসুম খাঁর মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। সৈয়দ আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর সম্বন্ধে জানা যায়,তিনি দিল্লীর সম্রাট আকবরের অধীনে ৫ হাজার সৈন্যের অধিনায়ক ছিলেন।তার পূর্ব পুরুষ সুলতান হুসেন শাহের রাজত্ত্ব কালে আফগানিস্থানের রাজধানী কাবুল হতে এসেছিলেন।পরবর্তী সময়ে চাটমোহরে বসতি স্থাপন করেন। ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে এখানেই সৈয়দ আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর জন্ম। তার পূর্ব পুরূষরা খোরাসানের তুরাবর্তী বংশের কাকশাল গোত্রের সৈয়দ ছিলেন। মাসুম খাঁর চাচা আজিজ মোহাম্মদ মাসুম খাঁ ২০ বছর বয়সে ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের সৈন্য দলে যোগদান করেন। যুবক মাসুম খাঁ কালা পাহাড় নামক শত্রু সৈন্যের অধিনায়ককে যুদ্ধেপরাজিত করে স্বীয় দক্ষতার গুণে পাঁচ হাজারী মনসবদার পদে উন্নীত হন। ইসলাম ধর্মের উপর সম্রাট আকবরের নিষ্ঠা ছিল না মনে করে কাকশাল গোত্র ও বাংলার বারো ভূইয়ারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ১৫৭৯ সালে মাসুম খাঁ বারো ভূঁইয়াদের সঙ্গে একাত্নতা ঘোষণা করেন। চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বারো ভূঁইয়াদের দলে যোগদান করেন। কিন্তু সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি ও গরর্ণর শাহববাজ খাঁনের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি শীতলক্ষার তীরে ভাওয়ালের গভীর অরণ্যে অত্নগোপন করেন। সেখানেই বাদশাহী ফৌজের সঙ্গে পুনঃযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সময় ৪৪ বছর বয়সে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ফৌজি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। সৈয়দ আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁ সম্রাট আকবরের অধীনতা অস্বীকরি করে চাটমোহর স্বাধীন ক্ষমতা পরিচালনাকালীন সময়ে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তাখন থেকেই মসজিদটি মাসুম খাঁর মসজিদনামে পরিচিত।ঐ সময়ে নদী পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় চাটমোর প্রসিদ্ধ স্থান রুপে গণ্য ছিল। এখানে কাবুলী,পাঠান,অফ্রিদিসহ বিভিন্ন গোত্রের বসবাস ছিল। গোত্রীয় অনুসারে এখনও চাটমোহর পৌরসভার মধ্যে পাঠানপাড়া, আফ্রাদপাড়া নামে দুটি পাড়া মহল্লা বিদ্যামান রয়েছে।

এক সময় প্রমত্তা বড়াল নদীর দক্ষিণ পাশে চাটমোহর থানা অবস্থিত ছিল এবং প্রাচীন বাণিজ্য কেন্দ্র ও পাঠান ভুমি হিসাবে প্রসিদ্ধ লাভ করে। চাটমোহর সদরে ৪৫ ফুট দীর্ঘ ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি চওড়া এবং ৪৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট মাসুম খাঁ কাবলীর মসজিদটি আজও মুসলমানরা সৃষ্টিকর্তার দরবারে তাদের ফরিয়াদ জানিয়ে আসছে।ক্ষুদ্র পাতলা জাফরী ইটে মসজিদটি নির্মিত। এর দোলয় ৬ফুট ৯ ইঞ্চি প্রশস্ত। দেয়ালে গায়ে প্রাচীন ভাস্কর্য শিল্পের নিদর্শন এখনো দেখা যায় চারশ ২৩ বছর পূর্বে নির্মিতত এ মসজিদটির তিনটি গম্বুজ ও ছাদ প্রায় ধ্বংশ হয়ে পড়েছিল। কয়েক বছর আগে সেটা সংস্কার করা হয়েছে। “লা-ইলাহা-ইল্লালাহু-মুহাম্মাদুর-রাসুলুল্লা খন্ডিত একখানা কালো পাথর মসজিদের সামনের ভাগে ইদারার সঙ্গে আঁকড়ে ছিল। ১৯০৪ সালে প্রাচীন কীর্তি রক্ষা আইনের তদানীন্তন পাকিস্থান সরকার মসজিদটি রক্ষার চেষ্টা করেন। মসজিদটি নির্মানের ইতিহাস সম্বলিত এক খন্ড কৃষ্ণপাথরের একপাশে ফার্সি ভাষা এবঙ অপর পাশে ব্রম্মা, বিষ্ণু ও শিবের মুর্তি অংকিত ছিল। সে পাথর বর্তমানের রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। মাসুম খাঁ কাবলীর মসজিদের পাশে অতীতে একটি নগর রক্ষিদের কয়েকটি পাহারা ঘর ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে বড়াল নদী ভারট ও ক্রস বাঁধ দেয়ার নদীটির অচলাবস্থায় সৃষ্টি হবার ফলে চাটমোহরবাসীর ভাগ্যে দৃর্গতি নেমে এসেছে।পরবর্তীতে সরকারী ভাবে মসজিদটি সংস্কার করে সোন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রাচীন গেট তৈরী করে পরিবেশ আনা হয়েছে মাধুর্য্য।

মসজিদটি সৌন্দর্য এখনও মানুষকে বিমোহিত করে।বহু পর্যটক আসেন সম্রাট আকবরের স্মৃতি বিজড়িত চার শতাধিক বছরের মাসুম খাঁ কাবলীর (শাহী মসজিদ) মসজিদটি দেখতে। যা এখনো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, ঈদের দুটি জামাত এখানে অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগরে নিয়ন্ত্রণাধীণ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রত্নতত্ত সংরক্ষনের কোন উদ্যোগ আছে বলে তাদের কার্যক্রম দেখে মনে হয় না । এসব প্রত্নতত্ত্বের ওপরে গবেষণা চালালে আমাদের ইতিহাস বদলে যাবে, তারপরও কে চুলায় আগুন জ্বালে।দেশের প্রত্নতত্ত্ব গুলো সংরক্ষণ করা উচিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে। উন্নত বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশেই রাষ্ট্রীয় খরচে সে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তারা আবিস্কার করেছে তাদের ইতিহাস এবং তাদের উৎস ও বিকাশের শেকড় সংবাদকে। উন্নত বিশ্বেরদিকে তাকিয়ে আমরাও কি আমাদের আবিস্কারের উদ্যোগ নিতে পরি না?

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author