Main Menu

অন্তহীন বিপর্যয়ে মানবাত্মার চরম হাহাকার

আশুতোষ সাহা

পৃথিবীতে সকল জীবের মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ট। তার এ শ্রেষ্টতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রয়েছে। মানুষ অনেক সৃজনশীল, সংস্কৃতি সম্পন্ন, বিবেক, বৈরাগ্য, জ্ঞান-চর্চাশীল। তাই দেখা যায় জগতে পরের কল্যাণে, পরের হিতে নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেয় এ মানুষ। এমন নজির ভুরি ভুরি রয়েছে। যা অন্য কোনো জীবের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। বর্তমান সময়ে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের চরম বিপর্যয়ের কথাই এখানের আলোচ্য বিষয়। বিশ, ত্রিশ বা চল্লিশ বছর পর পর প্রত্যেক দেশেই একটি না একটি বড় ধরণের বিপর্যয় দেখা দেয়। যেমন আমাদের দেশে উনিশ’শ একাত্তরে পাকবাহিনীর বর্বরতা, দু’হাজার সতের- এ লক্ষ লক্ষ আশ্রিত রোহিঙ্গা নিয়ে সমস্যা, যা ছেচল্লিশ বছর পর। প্রত্যেক দেশই এ ধরণের বা অন্য কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। তবে বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে গেছে, তা যাদের অপরাধের কারণেই সংগঠিত হয়ে থাকুক না কেন, তার সমাধানে সংযত অবস্থা বা সহনশীল উপায় অবলম্বনে অনেক সুফল যে পাওয়া যেত না, তা নয়। মূলত বর্তমান সময়ে সমস্ত জগতে অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা, বিদ্বেষভাব আরোপ এগুলো ঝেঁকে বসেছে মানব হৃদয়ে। মানবিক, মানবতাবোধের চর্চাকে পিছনে ফেলে জাগতিক সমৃদ্ধি, ভোগ বিলাসের চর্চা এগিয়ে চলছে দ্রুত গতিতে। এই যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী এদেশে, এদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে অক’ল পাথারে হাবুডুবু খেতে হয়। বৃদ্ধ, যুবক, শিশু, গর্ভবতী মা ওরাতো আকাশ থেকে সৃষ্ট হয়নি। আমাদের মানব সমাজের মধ্য থেকে মানব ভালোবাসায়, মানব সুরক্ষার মধ্য দিয়েই তাদের জন্ম। কাজেই মানুষের প্রতি মানুষের এরুপ বিদ্বেষ প্রসূত অবস্থা সৃষ্টি হওয়া কোন মতেই কাম্য নয়। বিদ্বেষ, হানাহানি পশু ক’লের জন্মগত ভাব। মানব কূলের ভাব-এর সম্পূর্ণ বিপরীতে। ঐ দেশের সংখ্যা গরিষ্ট অথবা কিছু মানুষ এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে দীর্ঘ দিনের পুঞ্জীভুত বিদ্বেষই এমন চরম পরিস্থিতি ডেকে এনেছে। মাঝখান থেকে উভয় সংকটে আমাদের এদেশের মানুষ এবং সরকার। সরকার খুব আন্তরিকতা এবং মানবিকতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে, তা যারপরনায়ই প্রশংসিত।
মানুষ মানুষের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্যই সরকার, দেশ, সকল সংস্থা, সংঘ। মানুষের সুখের সন্ধানে কত মহামানব, মহাপুরুষ নিজ জীবনের ভোগ বিলাস সম্পূর্ণ রূপে বিসর্জন দিয়েছেন। মহামুনি বুদ্ধ একটি ছাগ শিশুর জন্যও প্রাণ দিতে চেয়েছিলে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তীর্থ যাত্রা কালে পথিমধ্যে হাড্ডিসার মানবের অবস্থা দেখে, তাদের মধ্যে থেকে যেতে চাইলেন। অতঃপর অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থা করে তীর্থে যাত্রা করলেন। অথচ আজ মিয়ানমারের লক্ষ লক্ষ মানব সন্তান ঈশ্বরের নিজ হাতে গড়া মানুষ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা,হাহাকারের দ্বার প্রান্তে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।” যাদেরকে প্রেম, সেবা দানে কৃতার্থ হওয়ার অপূর্ব সুযোগ, সে তাদেরই আজ কত করুণ পরিণতি। অপরদিকে অকাল বন্যায় আমাদের হাওর অঞ্চলের মানুষেরও আকস্মিক সংকট। সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে তা থেকে উত্তরণের। উপর্যুপরি লক্ষ লক্ষ আশ্রিতদের সার্বিক সহযোগীতা দেয়া এক কঠিন অবস্থার শামিল । এরপরও কথা হলো আশ্রিতদের প্রতি সদয় ব্যবহার এবং সাময়িক ভাবে তাদের ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অন্য দিকে বৈশ্বিক কূটনৈতিক পর্যায়ে এমন একটি অবস্থান তৈরি করা যাতে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো যায়। নতুবা বিভিন্ন দিক দিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতির পথটি কন্টকাকীর্ণ হবে। আমাদের দেশটি যদি বিশালায়তনের হতো তাহলে একটি পর্যায় ছিল। ভোটের আশায় আমাদের নেতা-নেত্রীগণ যতই বুলি আওরান না কেন, আমরা সাধারণ মানুষেরা কিছুটা হলেও বুঝি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাদ্য সেবাখাত গুলোর সেবাদানের আওতা এবং হাটে-ঘাটে, লঞ্চ-স্টিমার, রেলওয়েতে, চলাচলকারী মানুষের সংখ্যার কথা। আমার কলেজের এক ছাত্র অনেক দিন পর তার সঙ্গে দেখা। বয়স ২৭/২৮। জিজ্ঞেস করলাম তার পরিবার সম্বদ্ধে। সে বলল, তার পাঁচ সন্তান। আমার মাথায় হাত। তার উচ্চতা হবে ৪.৫ ফুট। এ হলো হালচাল। বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত আমাদের এ দেশ। তার ওপর আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চাপটা অনেক প্রবল। তাই বিচক্ষণ পন্থায় উপায় উদ্ভাবন করে, তাদেরকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বনায়কোচিত দক্ষতা এবং দেশের বুদ্ধিজীবীগণের শলাপরামর্শ বিষয়টিকে একটি সমাধানের পথে নিয়ে যেতে পারে। সর্বশেষে সকলের সার্বিক সহযোগিতায় আশ্রিতরা যেন খেয়ে পড়ে থাকে এ আশাবাদ ব্যক্ত করি। এ মানুষগুলোর প্রত্যেকের নাম ভিন্ন। জাতি, দেশ , ভাষা, সংস্কৃতি ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গা এক। তারা সবাই মানুষ। যা সবার ওপরে সত্য। এ পৃথিবীতে ধর্ম মতগুলো মানবতা, সত্য, নিষ্ঠা অবিদ্বেষ-প্রসূত ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ঐ সকল মতগুলোর আশ্রিত কিছু মানুষ ঐ ধর্ম মতগুলোর সত্য, সুন্দর, ভাবের গভীরে অবগাহণ করার অক্ষমতার কারণে বিদ্বেষ ভাবের আশ্রয়ে চলে যায়। আর হানাহানিতে অশান্ত করে তোলে এ পৃথিবীকে। হিংসায় উন্মত্ততায় কেহ সুখী হতে পারেনা। একথা চিরন্তন সত্য। হিংসায়, দ্বেষে মানুষ বা দেশ ছোট হয়। প্রেম, সেবা, ভালোবাসা দানে মানুষ মহৎ হয়, উচ্চাঙ্গে আসীন হয়। বাহ্য অনল বাইরের ব¯ত্তকে পোড়ায়, হিংসার অনল আপন হৃদয়কে দগ্ধ করে। যা নেভানো দায়। প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের অহিংস ভাব আরোপিত হোক, এটাই একমাত্র প্রত্যাশা ।