দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে মায়ের জীবন যুদ্ধ

আব্দুল লতিফ রঞ্জু : ত্রিশোর্ধ্ব কৃষ্ণা রানী দাস। মা-বাবা,স্বামী-সন্তানকে নিয়ে বেশ সুখেই কাটছিল তার সংসার। কিন্তু কপালে সুখ সইলো না। চোখে নেমে এলো অন্ধকার! ছিলেন পোশাক কর্মী, হয়ে গেলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী! বৃদ্ধ মা বেলী রানী এখন তার একমাত্র অবলম্বন। পাবনার চাটমোহরের মূলগ্রাম ইউনিয়নের কুবিরদিয়ার দাসপাড়া গ্রামে একটি ঝুপড়ি ঘরে মা-মেয়ের বাস। বাবা রতন চন্দ্র দাস গত আট বছর আগে মারা গেছেন। কৃষ্ণার চোখের দৃষ্টি চলে যাওয়ায় স্বামী সুনীল দাস তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেছেন। একমাত্র ছেলে ইশান মানুষ হচ্ছে খালা অঞ্জনা দাসের কাছে। শুধু অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে না পেরে চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন কৃষ্ণা দাস। শুধু দৃষ্টি হারাননি; হারিয়েছেন স্বামী-সন্তান ও সংসার।

সরেজমিন অসহায় এই মা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় কৃষ্ণার সাথে। তিনি জানান, দশ বছর আগেও গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি। প্রায়শই মাথা ব্যাথা ও জ্বর হতো তার। কিন্তু সে এটা আমলে নেননি। কারণ বাবা-মা ও স্বামীকে টাকা না পাঠালে তাদের মুখে অন্ন উঠতো না। কৃষ্ণা বলেন, ‘একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি আর চোখে দেখতে না পেয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তারা আমাকে ঢাকায় যেতে বলেন। পরবর্তীতে অর্থাভাবে আমার চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। আমি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাই তখন চাকুরীও চলে যায়। তবে এখনও মনে হয় আমি সেলাই মেশিনে বসে আছি। কাপড় সেলাই করছি। মেশিনের শব্দ কানে বাজে। কিন্তু চোখে না দেখায় হারালাম চাকুরী, স্বামী-সন্তান ও সংসার। এখন আমি সবার বোঝা।

কৃষ্ণার মা বেলী রানী দাস অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘আমাদের নিজেদের জায়গা বলে কিছু নেই। স্বামী মারা গেলে এবং মেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারালে আমাদের এমন অবস্থা দেখে আওয়ামীলীগ নেতা আবুল হোসেন ধোনী দয়া করে তার জমিতে থাকতে দিয়েছেন। কিন্তু মেয়ের চিকিৎসা করাতে পারছি না। যে মেয়ে রোজগার করে আমাদের সবার মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে; সেই মেয়েই এখন ঘরে বসে বসে শুধু কাঁদে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ের কষ্ট আর সহ্য হয় না। এখন কেউ ভিক্ষাও দিতে চায় না। তবে প্রতিবেশীরা সহযোগিতা না করলে মা-মেয়েকে না খেয়ে মরতে হতো। আগের চেয়ারম্যান কৃষ্ণাকে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দিয়েছিল। কিন্তু যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে চলে না।’ চিকিৎসা করালে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে এবং আবারও কাজ করে সংসার চালাতে পারবে বলে বেলী দাসের দৃঢ় বিশ্বাস। এ সময় তিনি কৃষ্ণার চোখের চিকিৎসার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘এমন কর্মঠ মেয়ে দৃষ্টি হারাবে বিশ্বাসই হয় না। পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিল সে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; তাকেই আজ অন্যের ভরসায় বেঁেচ থাকতে হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া সব রকমের সরকারী সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে পরিবারটি। সত্যিই তাদের দেখে কষ্ট হয়।’

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author