২৯ মার্চ পাবনার ঐতিহাসিক মালিগাছা মুক্তিযুদ্ধ দিবস

।। আবদুল জব্বার ।।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চের ভোর বেলা। সবেমাত্র ফজরের আজান শেষ হয়েছে। আমার (লেখক আবদুল জব্বার) মামাতো বোন পাবনা শহরের শালগাড়িয়া নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি শত্রু সেনাদের কবল হতে আত্মরক্ষার জন্য মাত্র ১ দিন আগে স্বামী, ভাই এবং অসুস্থ শিশু সন্তান মানিক সহ আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের বাড়ী। পাবনা শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরবর্তী আমাদের গ্রাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে পাবনা-ঈশ্বরদী পাকা সড়ক পথ। অসুস্থ ভাগ্নে মানিকের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হওয়ায় বাড়ির কারো ঘুম হয়নি রাতে। সবাই অপেক্ষায় ছিলাম কখন ভোর হবে। তাই ভোরের প্রত্যাশিত আজানের ধ্বনি কানে যাবার পরই হাত মুখ ধুয়ে আমার মামাতো ভাই রশিদকে সাথে নিয়ে মানিকের জন্য ঔষধ আনার উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে বেরুলাম। আমি এবং রশিদ দু’জনেই তখন পাবনা শহরের আর.এম. একাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র। আমি ওই সময় স্কুল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এবং রশিদ একজন সদস্য। বাড়ির সামনের পাকা সড়ক বেয়ে গন্তব্য ছিল পশ্চিম দিকের গ্রাম্য ডাক্তার কালীপদ আচার্যের বাড়ী। যাত্রাপথে মালিগাছা বাজারে পৌঁছে লোকমুখে শুনতে পেলাম একদল পাকিস্তানি শত্রুসেনা আমাদের গ্রাম থেকে উত্তর দিকের জোতকলসা গ্রামের মাঠের মধ্যে দিয়ে জিয়েল গাড়া নামের বিলের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। লোকজন বলাবলি করছে পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দুক থাকলেও খুব সম্ভব গুলি ফুরিয়ে গেছে। চারিদিক থেকে শতশত মুক্তিকামী জনতা তাদের ঘিরেও ফেলেছে। আমি এবং ছোট ভাই রশিদ বাঁশের লাঠি হাতে করলাম। তারপর আশেপাশের লোকজনকে ডেকে সংগঠিত করলাম। সকলের হাতেই তখন লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র। এরপর জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে পাকা সড়ক বেয়ে টেবুনিয়া বাজারের দিকে দৌঁড় দিয়ে মালিগাছা-মজিদপুর গোরস্তান অতিক্রম করলাম। আমাদের সঙ্গে লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ জন। এ সময় সরাসরি চোখে পড়লো ৬ জন পাকিস্তানি শত্রুসেনা শতশত মুক্তিকামি মানুষের দিকে অস্ত্র তাক করে পিছনের দিকে পিচাচ্ছে। পাকিস্তানি শত্রুসেনাদের ঘেরাও করে রাখা উপস্থিত মুক্তিকামি মানুষের হাতেও লক্ষণীয় হলো বাঁশের লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র। এমনি মুহূর্তে আকস্মিক ভাবে কয়েকটি গুলির শব্দ কানে এলো। দেখলাম পাকিস্তানী শত্রুসেনাদের ঘেরাও করে রাখা মুক্তিকামি মানুষগুলো মাটিতে শুয়ে পড়েছে। কেউ কেউ দৌঁড়ে দিগবিদিক পালাচ্ছে। ইতিমধ্যে টেবুনিয়া বাজারের দিক থেকেও পাকিস্তানী শত্রুসেনাদের আক্রমণ করার জন্য অনেকে এগিয়ে এসেছে। লাইসেন্সের বন্দুক দিয়ে তারা পাকিস্তানি শত্রুসেনাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। সংবাদ পেলাম পাকিস্তানি শত্রুসেনাদের গুলি লেগে জোতকলসা গ্রামের বছির মন্ডলের ছেলে গহের মন্ডল মারা গেছেন। গহের মন্ডল পাকিস্তানি শত্রুসেনাদের লক্ষ্য করে মাটির ঢিল ছুঁড়েছিল এবং একটি ঢিল পাকিস্তানি শত্রুসেনাদের গায়ে লেগেছিল। পরে বুঝলাম পাকিস্তানি সেনাদের বন্দুকের গুলি নাই এরকম পূর্ববর্তী ধারণা ছিল ভুল। আমরা একই সড়ক পথে পিছনের দিকে দৌড় দিয়ে পুনরায় মালিগাছা বাজারে ফিরে আসি। এর মধ্যে টেবুনিয়ার দিক থেকে গুলির শব্দ শুনে পাকিস্তানি শত্রুসেনারা মুক্তিকামি জনতার আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য সামনে আর না এগিয়ে রুট পরিবর্তন করে পাবনা-ঈশ্বরদী পাকা সড়কের পাশ দিয়ে পূর্বদিকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে আমাদের গ্রামের দিকে এগুচ্ছে।
সংবাদটি দ্রুত পাবনা শহরে পৌঁছানোর পর শহর থেকে জিপে করে পুলিশ এবং মুক্তিকামি জনতার কয়েকটি দলকে অস্ত্রসহ পাবনা-ঈশ্বরদী পাকা সড়কের মনোহরপুর বড় ব্রীজের কাছে নামিয়ে দেয়া হয়। ওই টিমের সদস্যরা কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে মনোহরপুর উত্তর পাড়া আব্বাস ফারাজির আমবাগান এবং মালিগাছা গ্রামের মোল্লাপাড়ায় আমাদের বাড়ী ছাড়াও অন্যান্য বাড়ীতে অবস্থান নিয়েছিল। পাবনা শহর থেকে পুলিশ ও মুক্তিকামি লড়াকুদের ব্যারিকেড দেয়া মাত্রই চারিদিক থেকে বৃষ্টির মতো গোলাগুলির মুহুর্মুহু আওয়াজ গগন বিদারী শব্দ আমাকেও স্পর্শ করতে লাগলো। আমি এবং আমাদের গ্রামের কেরামত আলী ভাই সহ প্রায় সবাই মালিগাছা বাজার সংলগ্ন নূর বকস ব্যাপারীর পাকা বাড়ীতে আত্মরক্ষার জন্য অবস্থান গ্রহণ করেছিলাম ঘরের ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে। আমাদের আশংকা ছিল পাকা ঘর দেখে শত্রুসেনারা যদি সেখানে আশ্রয় নেবার জন্য আসে তাহলে আমাদের কারোরই প্রাণ রক্ষা হবে না। অনেকেই তখন আশেপাশে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছিল কি-জানি কি হয় এই সংশয়ে। এমন সময়ে খবর এলো শত্রুসেনারা পাকা সড়কের উত্তর দিক দিয়ে পাবনা শহর অভিমুখে যাওয়ার পথে পুলিশ ও মুক্তিকামি জনতার প্রতিরোধের মুখে আর এগুতে না পেরে আমাদের বাড়ীর অদূরে কেফাত মোল্লার বাড়ীতে ঢুকে অবস্থান নিয়েছে। তখন আমরা আমাদের অবস্থান থেকে বের হয়ে কেরামত আলীর বাড়ীর মধ্যে ঢুকে পিছন দিয়ে আমাদের বাড়ীর দিকে তাকালাম। তখন কেফাত মোল্লার বাড়ীর দিক থেকে অজস্র গুলি ছুঁড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমাদের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়া পুলিশ ও মুক্তিকামি জনতা হানাদারদের অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে। আমাদের অবস্থান নেয়া বাড়ীটির টিনের ঘরের চালে বিকট শব্দে গুলি লাগছে। ইতিমধ্যে থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে নিয়ে আটঘড়িয়া থানার এ.এস.আই আবদুল জলিল মালিগাছা বাজারের কাছে উপস্থিত হলেন। এরপর মজিদপুর গ্রাম হতে কাজী আবু নঈম অস্ত্র হাতে আমাদের কাছে এলো। আমরা জয়বাংলা শ্লোগান দিলাম। এ,এস,আই আবদুল জলিল ও কাজী আবু নঈমের সাথে পাকা সড়কের দক্ষিণ পার্শ্ব দিয়ে আমরা পাকিস্তানি শত্রুসেনাদের অবস্থান নেওয়া বাড়ীটার ঠিক বিপরীত দিকে এসে পৌঁছলাম। সে সময় আমাদের পাশে ছিল আমার ভাতিজা ছাদেক মোল্লা, মোকসেদ, মজিবর, আমার মামাতো ভাই রশিদ এবং এডরুকের কর্মচারী আবদুর রশিদসহ অনেকে। এ,এস,আই আবদুল জলিল পাকা সড়কের মাঝে একটি কালভার্টের দক্ষিণ মুখে বন্দুক তাক করে অবস্থান গ্রহণ করলো। গর্জে উঠলো তার বন্দুক। দারোগা আবদুল জলিল উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন একজন খতম হয়েছে। তিনি এরপর স্থানীয় যুবক মজিবরকে নির্দেশ দিলেন উত্তর পাশে নিহত হানাদারের লাশ ও বন্দুক নিয়ে আসার জন্য। নির্দেশ পেয়ে মজিবর, রশিদ ও সাদেক মোল্লা কালভার্টের ভিতর দিয়ে পাকা সড়ক অতিক্রম করে কালভার্টের উত্তর পার্শ্বে পড়ে থাকা একজন শত্রুসেনার লাশ ও বন্দুক নিয়ে সড়কের দক্ষিণ পাশে এলো। লোকজন লাশ ধরাধরি করে ড্রেন দিয়ে মালিগাছা বাজারের দিকে সফর প্রাং এর বাড়ীর পাশে ব্রীজের নিকট নিয়ে গেল। এরপর দেখা গেল পাকিস্তানি সেনাদের একজন কেফাত মোল্লার বাড়ীর ড্রেনের মধ্যে থেকে হামাগুড়ি দিয়ে একদম পাকা সড়কের ধারে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে। পুলিশের এ,এস,আই আবদুল জলিল সেটা টের পেয়ে মোকসেদের বাড়ীর সামনে কোড়ই গাছে হেলান দিয়ে প্রায় পাকা সড়কের উপর উঠতে লাগল। দারোগা আবদুল জলিলের ছোড়া গুলি সড়কের পাশে অবস্থান নেয়া পাকিস্তানি শত্রুসেনার গায়ে লেগে সে চিৎকার দিয়ে সড়কের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। এরপর ২ জন শত্রুসেনাকে সম্মুখযুদ্ধে পরাস্ত করার পর দারোগা আবদুল জলিলকে আর থামানো যায় নি। তিনি পাকা সড়কের পাশে মাথা উঁচু করে কিফাত মোল্লার বাড়ীর দিকে শত্রুসেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে লাগল। আমি এবং রশিদসহ রণাঙ্গনে উপস্থিত মুক্তিকামি জনতা পিছন থেকে তাকে নিচে নেমে অবস্থান নেওয়ার জন্য একাধিক বার অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি আমাদের কোনো কথাই শুনলেন না। হঠাৎ পরপর কয়েকটি গুলি আবদুল জলিলের বুকে বিদ্ধ হলো। তিনি চিৎকার করে পিছনের দিকে ড্রেনে পড়ে গেলেন। আমরা তার পাশে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। লাল রক্তে ভেসে গেছে তার শরীর। তিনি দু’চোখে তাকিয়ে আমাদের শেষ বারের মতো এক নজর দেখলেন। তিনি কি যেন বলতে চেয়েও বলতে পারলেন না। আমাদের চোখের সামনেই শত্রুসেনার গুলিতে তিনি মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যুবরণ করলেন।
রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে দারোগা আবদুল জলিল নিহত হবার পর আমরা ১০/১২ জন মিলে ধরাধরি করে তাঁর মৃতদেহ মালিগাছা বাজারের নিকট নিয়ে এলাম। এরপর মৃত দেহ আটঘড়িয়ার উদ্দেশ্যে সহ-যোদ্ধারা ধরাধরি করে টেবুনিয়ার দিকে নিয়ে গেল। এ,এস,আই আবদুল জলিল নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রণাঙ্গনে শোকের ছাঁয়া নেমে আসে। এর মধ্যে গোলাগুলি থেমে গেছে। আমরা পুনরায় নূর বক্সের বাড়ীর পাশে মহিরউদ্দিনের বাড়ীর সামনে পৌঁছালাম। এ সময় বন্দুক হাতে মনোহরপুর গ্রামের আপ্তাই সহ বেশ কিছু অচেনা সহযোদ্ধার সন্ধান পেলাম। আমার কথামতো গ্রামের কয়েকজন যুবক মহিরউদ্দিন ব্যাপারীর বাড়ীর ডাবের গাছ থেকে ডাব পেড়ে আনলো। সে সময় সবাই আমরা খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম। মালিগাছা রণাঙ্গনে অংশগ্রহণকারি সহযোদ্ধা সহ আমরা সবাই ডাবের পানি পান করলাম। এর মধ্যে একটা যুদ্ধ বিমান বিকট শব্দ করে কয়েকবার আমাদের মাথার উপর দিয়ে চক্কর দিলো। অবরুদ্ধ পাকিস্তানি শত্রুসেনারা ওয়ারলেস সেটের মাধ্যমে সম্ভবত ঊর্ধ্বতম কর্তৃপক্ষকে তাদের শোচনীয় অবস্থার কথা জানিয়েছিল। এরপর কয়েক ঘণ্টা একদম নীরবতা। তখন বেলা আনুমানিক তিনটা। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ। পরে জানতে পারলাম, পাবনা মক্তব পাড়ার ৩ জন যুবক পাকা সড়কের পাশে পড়ে থাকা নিহত শত্রুসেনার অস্ত্র আনার জন্য সবেমাত্র পাকা সড়কের উপর উঠতে যাচ্ছিল। তাদের ৩ জনই নিহত হয়েছে। নিহতদের মৃতদেহ ড্রেনের মধ্যে পড়ে রইল। এ এক মর্মান্তিক দৃশ্য। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারি সকলেই রণাঙ্গন ছেড়ে চলে যেতে লাগলো। এরপর দুই রশিদ ও ভাতিজা ছাদেককে সঙ্গে করে গ্রামের মধ্যে পাকা সড়কের দক্ষিণ দিক হয়ে আমাদের বাড়ীর দিকে যেতে লাগলাম। গ্রামের নারী-পুরুষ প্রায় সকলেই আত্মরক্ষার্থে নিজ বাড়ী ছেড়ে দূরবর্তী গ্রাম গুলোতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। শুধুমাত্র অপরিচিত দু’একজন সহযোদ্ধাদের রণাঙ্গন ছেড়ে বিদায় নিতে দেখলাম। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পাকা সড়ক অতিক্রম করে আমাদের বাড়ীর পূর্বদিকে ঢালের অপর পাশ দিয়ে নিজ বাড়ীতে পৌছালাম। তখন বিকেল চারটা। দেখলাম আমাদের বাড়ীগুলোতে কোনো লোকজন নেই। সকল বাড়ীতেই রান্না করা ভাত চুলার উপর ছিল। রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণকারি যোদ্ধারা সে ভাত খেয়েছিল। আমাদের বাড়ীর পশ্চিম দিকে ছিল একটি ড্রেন। সেই ড্রেনে অবস্থান নিয়েছিলেন পুলিশ এবং মুক্তিকামি যোদ্ধারা। দেখলাম সেখানে অগণিত গুলির খোসা পড়ে আছে। তবে এখানে অবস্থানরত কোনো সহযোদ্ধার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল না।
১৯৭১ এর পাবনার মালিগাছা রণাঙ্গনের ঐতিহাসিক সম্মুখযুদ্ধে শত্রুসেনাদের প্রতিরোধ করতে বিভিন্ন দিক থেকে আরো যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা হলেন, মালিগাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ইদ্রিস আলী খাঁন, আওয়ামী লীগ নেতা আটঘরিয়া থানার অভিরামপুরের আজিজুর রহমান ফনি মিয়া, (দু’জনই তাদের লাইসেন্সকৃত বন্দুক নিয়ে এসেছিলেন)। এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতা জয়নুল আবেদীন, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ শাখার তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও পরবর্তীকালে সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবাদত আলী, বাদালপাড়া গ্রামের আফফান, মনোহরপুর গ্রামের তৎকালীন ডা. পরবর্তীকালে সাংবাদিক ও নাট্যকার এইচ.কে.এম আবু বকর সিদ্দিক ও দেলোয়ার হোসেন দেরোব, রূপপুর গ্রামের মোঃ জাহাংঙ্গীর আলম (সাবেক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) বর্তমানে ঢাকাস্থ পাবনা সমিতির সভাপতি, মনিদহ গ্রামের রিয়াজ উদ্দিন ও খন্দকার সাখাওয়াত হোসেন, রামচন্দ্রপুর গ্রামের মতিয়ার রহমান, উত্তর রামচন্দ্রপুর গ্রামের মোজাহারুল ইসলাম বকুল, সাহাপুর যশোদল গ্রামের গিয়াস উদ্দিন, রানীগ্রামের আবু সাঈদ, করিম ড্রাইভার, লোকমান হোসেন ড্রাইভার, বারইপাড়া গ্রামের আবেদ আলী বেগে ও মোসলেম উদ্দিন, হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চকচিরট গ্রামের হারেজ আলী মাস্টার, সামছুল আলম গান্ধী, বারেক, হান্নান, ঘরনাগড়া গ্রামের আকমল হোসেন, আব্দুল কাদের আটঘরিয়ার দেবোত্তরের ডা. মিজানুর রহমান (প্রদীপ ডাক্তার), মোমতাজ উদ্দিন মন্টু, ইয়াসিন আলী প্রাং, মগরেব আলী, নজরুল ইসলাম, রামনগর গ্রামের আব্দুল মজিদ, আব্দুল বারী, আব্দুল গণি, ঢলেশ্বর গ্রামের রফিকুল ইসলাম বকুল, শ্রীকান্তপুর গ্রামের আজাদ হোসেন জুনি, শহিদুল্লাহ খান বাদশা, হাবিবুল্লাহ খান, আব্দুল আজিজ, বুলবুল হোসেনসহ আরও অনেকে।
রণাঙ্গনে শহীদ (পুলিশের এ এস আই) আবদুল জলিলের মৃতদেহ দেবোত্তরে নিয়ে যাবার পর কেউই আটঘড়িয়াতে নিয়ে যাওয়া নিরাপদ মনে করেন নি। তাই দেবোত্তরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং সমাজকর্মী মোকসেদ প্রাং এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে দেবোত্তর বাজারে অবস্থিত মসজিদের পাশে নামাজে জানাজা শেষে তার মৃতদেহ দাফন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হলে ১৯৯৬ সালের ৮ ডিসেম্বর স্থানীয় সংসদ সদস্য ভাষাসৈনিক বীরমুক্তিযোদ্ধা শামসুর রহমান শরীফ ডিলু এবং তৎকালীন আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রফিক উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে কবরটি চিহ্নিত করে বাঁধানো হয়েছে। শহীদ গহেরের মৃতদেহ ওই দিন বিকেলে টেবুনিয়ার নারায়ণপুর গোরস্তানে দাফন করা হয়। এখনও তাদের কবর এ রনাঙ্গণের স্মৃতিকে ধরে রেখেছে। পাবনা শহরের মক্তব পাড়ার আহসান আলী এবং অজ্ঞাত নামা ২ জনের মৃত দেহ একদিন পর তাদের স্বজনরা নিয়ে গিয়ে দাফন করে। শহীদ আহসান আলী দৈনিক ডেসটিনি পত্রিকার পাবনা জেলা প্রতিনিধি মোস্তফা সতেজের মামা। এ রণাঙ্গনে শত্রুসেনাদের গুলিতে আহত আকমল হোসেনকে তার গ্রামে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। নিহত ২ জন শত্রুসেনার লাশ পরের দিন পাবনা-ঈশ্বরদী সড়কের উত্তর পাশের ড্রেনে স্থানীয় জনতা গর্ত খুঁড়ে পুতে রাখে। বেঁচে থাকা ৪ জন শত্রুসেনা ওই দিন রাতেই তাদের অবস্থান থেকে পালিয়ে যায়। পরের দিন তাদের অবস্থান পরিদর্শন করে দেখা যায় একটি খড়ের ঘরের মাঝখানে বাংকার খনন করে শত্রুসেনারা অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ওই বাংকারের মধ্যে ছিল ছোপ ছোপ জমাট বাধা রক্ত। অনুমান করা হয় শত্রুসেনারা সকলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত জখম হয়েছিল।
১৯৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩৮ বছর পর ঐতিহাসিক এ রণাঙ্গনের স্মৃতিকে স্মরণ করার জন্য ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি গঠন করা হয়েছে মালিগাছা ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। এ কমিটির উদ্যোগে ২০০৮ সালের ২৯ মার্চ মালিগাছা রণাঙ্গনে আয়োজন করা হয়েছিল স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পাবনার সাবেক পুলিশ সুপার এ এফ এম মাসুম রাব্বানি। এছাড়াও পাবনার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক এবং পুলিশ কর্মকর্তা অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে শহীদ গহেরের স্ত্রী সুকজান বেওয়া এবং আহত মুক্তিকামী যোদ্ধা আকমল হোসেনের ছেলে আব্দুল বারেককে সম্বর্ধনা দেয়া হয়। এছাড়াও ২০১০ সালের ২৯ মার্চ মালিগাছা রণাঙ্গনে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পাবনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্টেট মোঃ জাফর উল্লাহ, প্রধান বক্তা ছিলেন, পাবনার শহীদ সরকারি বুলবুল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক শিবজিত নাগ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পাবনা জেলা ইউনিট কমান্ডের সদস্য সচিব বীরমুক্তিযোদ্ধা শরিফুল ইসলাম।
২০১৭ সনের ২৯ মার্চ পাবনার মালিগাছা রণাঙ্গনে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, পাবনা পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির পিপিএম এর প্রতিনিধি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পাবনা জেলা ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বাতেন, উপজেলা ইউনিট কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আবুল কাশেম বিশ্বাসসহ জেলা উপজেলা এবং ইউনিয়ন কমান্ডের বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দসহ এলাকাবাসী। অনুষ্ঠানে শহিদ গহের মন্ডলের বিধবা স্ত্রী সুকজান বেওয়া এবং সহযোদ্ধা আকমল হোসেনর ছেলে আব্দুল বারেককে পাবনা জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়াও সন্ধ্যা পর জেলা তথ্য অফিসের সৌজন্যে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পাবনা জেলা পুলিশ প্রশাসন জেলা পুলিশ লাইনের মিলনায়তনকে পাবনার মালিগাছা রণাঙ্গনে শহীদ পুলিশের এএসআই “বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুল জলিল মিলনায়তন” নামকরণ করেছেন।
পাবনার ঐতিহাসিক মালিগাছা রণঙ্গনে অংশগ্রহনকারি শহিদদের এবং সহযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তকরণ এবং এ রণাঙ্গনে একটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান এখন সময়ের দাবী।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধিকারকর্মী।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author