আজও বেঁচে আছেন ১২৬ বছরের বৃদ্ধ আহসান উদ্দিন শাহ

মোঃ মনিরুজ্জামান ফারুক, ভাঙ্গুড়া (পাবনা) থেকে : আলহাজ্ব আহসান উদ্দিন শাহ। বয়স ১২৬ বছর। পিতা মৃত বরকত শাহ। জন্ম ১৮৯২ সালে পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার বিএল বাড়ী গ্রামে। ১৪ সন্তানের জনক তিনি। তাদের মধ্যে সাতজন ছেলে ও সাতজন মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের আগেই তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা যান। ওই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন চার ছেলে ও চার মেয়ে । পরে তিনি ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত পাঁচ ছেলে ও চার মেয়েসহ মোট নয় সন্তান জন্ম দেন তাঁর দুই স্ত্রী। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি আরো দুই ছেলে ও তিন মেয়েসহ মোট পাঁচ সন্তানের বাবা হন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এখনো বেঁচে আছেন । বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া এ মানুষটির প্রিয় খাবার দুধ কলা দিয়ে ভাত। ছোট বেলা থেকেই তিনি নিয়মিত গরুর দুধ পান করেন। এখনও নিজের হাতে খাবার খেতে পারেন। এই বয়সে এখনও তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। অবশ্য গত বছর খানেক ধরে তিনি বসে নামাজ আদায় করছেন। বয়স্ক এ মানুষটি ইদানিং কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চোখে কম দেখছেন। কানেও তুলনামুলকভাবে কম শুনছেন। এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ ইন্দোনেশিয়ায় সোদিমেদজো গত ৩০ এপ্রিল ১৪৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুর পর বেশি বয়স্ক মানুষ হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন পোল্যান্ডের ইসরায়েল ক্রিস্টাল। তাঁর বর্তমান বয়স ১১৩ বছর। আর বাংলাদেশের আলহাজ্ব আহসান উদ্দিন শাহ এর বয়স ১২৬ বছর । ওই পরিবারটির দাবি করছেন বর্তমানে জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়স্ক হলেন তিনি। দাবিটি সত্য হলে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়ে নিতে পারেন আহসান উদ্দিন শাহ।

তার বয়স প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, ঈশ্বরদীর পাকশীতে যখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ করা হয় তখন আমার বয়স ছিল ১৮/২০ বছর হবে। তিনি জানান, ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ তৈরীর সময় তিনি ও তার বন্ধুরা সেখানে অনেক আড্ডা দিয়েছেন। রেল লাইনের নির্মাণের জন্য যখন মাটি কাটার কাজ শুরু হয়, তখন তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে ওই রাস্তার ওপর ডাংগুলি খেলেছেন। সেখানে গরু চরিয়েছেন। জানা গেছে, অবিভক্ত ভারতের পূর্বঞ্চলীয় রাজ্য আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কলিকাতার সহজ যোগাযোগের কথা বিবেচনা করে বৃটিশ শাসিত ভারত সরকার ১৮৮৯ সালে এই অঞ্চলে রেলপথ তৈরীর পরিকল্পনা করে। ১৯০৮ সালের দিকে বৃটিশ শাসিত ভারত সরকার ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ তৈরীর কাজ শুরু করে। ওই বছরই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের মঞ্জুরি লাভ করে। এর পরের বছর ১৯০৯ সালে পদ্মায় পাকশি এলাকায় সেতু নির্মাণের জন্য সার্ভে করা হয়। ১৯১০-১১ সালে প্রথম কাজের মৌসুম শুরু হলে ভয়াল পদ্মার দুই তীরে সেতু রক্ষী বাঁধ নির্মণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে মূল সেতুর কাজ শুরু হয় পরের বছর ১৯১২ সালে। এর তিন বছর পরই ১ জানুয়ারি ১৯১৫ সালে ১ ডাউন লাইন দিয়ে প্রথম চালু হয় মাল গাড়ি। দুই মাস পরেই ৪ মার্চ ১৯১৫ সালে সেতুর উপর ডবল রেল লাইন দিয়ে যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচলের উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভারতের গর্ভনর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড চার্লস হার্ডিঞ্জ যার নামে বর্তমানে সেতুটির নাম করণ।

আহসান উদ্দিন বলেন, ওই ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ কলকাতা বন্দরে মাছ রফতানীর জন্য প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে লাহিড়ী মোহনপুর, দিলপাশার, শরৎনগর ও বড়ালব্রীজ রেল ষ্টেশনগুলো চলনবিলের মাছ ও পাট রফতনীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে আহসান উদ্দিন বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখনই আমি ৮ সন্তানের জনক। এ ছাড়া ছোট বেলায় বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের হাল ধরতে হয় আমাকেই। তিনি বলেন,মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরণের সহায়তা করেছি। তখন আমার তৃতীয় নম্বর সন্তান আফজাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধে যায়। সে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে আসে। ফিরে এসে ওরা সংঘবদ্ধভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।এ বিষয়ে আহসান উদ্দিনের ছোট ছেলে সাংবাদিক গোলাম মওলা বলেন, আমার বাবা তাঁর দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আমুল পরিবর্তন যেমন দেখেছেন, তেমনি তিনটি শতক দেখা এই প্রবীণের জীবদ্দশায় বৃটিশ শাসিত সরকার, পাকিস্তান সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের শাসন দেখে যেতে পারছেন।এই দীর্ঘ জীবনের জন্য তিনি কৃতিত্ব দিয়েছেন নিয়ন্ত্রিত জীবন এবং খাদ্যাভাস।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author