প্রধান মেনু

ভাষা সংগ্রামী, খাপড়া ওয়ার্ডখ্যাত বিপ্লবী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক – আমিনুল ইসলাম বাদশা

। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
ভাষা সংগ্রামী, খাপড়া ওয়ার্ডখ্যাত বিপ্লবী, ভুট্টা আন্দোলনের নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক পাবনার কৃতি সন্তান আমিনুল ইসলাম বাদশা। এদেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের যোদ্ধা এবং বাম রাজনীতির পথিকৃত। ১৯২৯ সালে ১৪ এপ্রিল পাবনা শহরের কৃষ্ণপূর মহল্লায় জন্ম। পাবনা জি,সি আই স্কুলে পড়াকালীন কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে জড়িত হন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন দিয়ে রাজনীতির শুরু। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে পাবনার সংগঠক। বাংলা ভাষার দাবীতে ৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী আহুত হরতালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া ভাষা সংগ্রামী । ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত ৭ জন বন্দীর সাথে আমিনুল ইসলাম বাদশা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ( ন্যাপ) গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। উল্লেখ্য ষাটের দশক ছিল এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উত্তাল সময়। ১৯৫৮ সাল থেকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, ৬২ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, ৬৫ সালে পাক – ভারত যুদ্ধ, ৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৭ সালে পাবনা শহরে সংগঠিত ভুট্টা আন্দোলন, ৬৮ /৬৯ সালে গন আন্দোলন সহ সবকিছুতেই আমিনুল ইসলাম বাদশার ছিল অগ্রনী ভূমিকা। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাবনায় গঠিত স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের সাত সদস্য বিশিষ্ট কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন।

১৯৬৭ সালে আমি পাবনার ঐতিহ্যবাহী আর,এম,একাডেমী স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। রাজনীতির উত্তাল সময়কাল। আমিও কমবেশী আন্দোলন ও সংগ্রামের তৃনমূল কর্মী। ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির সংগঠক। এমন সময় একদিন স্কুলে যাবার পর শুনলাম পাবনায় বিষাক্ত আটার রুটি খেয়ে বহু মানুষ মারা গেছে। এমন সংবাদে স্কুল কলেজের ছাত্রদের মধ্য চাপা উত্তেজনা শুরু হয়ে গেল। এক পর্যায়ে আমাদের স্কুল এবং এডওয়ার্ড কলেজের শত শত ছাত্র ছাত্রী মিছিল নিয়ে শহর অভিমুখে রওয়ানা হলাম।শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ছাত্র জনতা হাসপাতালের ( বর্তমান ডায়াবেটিক হাসপাতাল) সামনে জমায়েত হয়েছেন । বিক্ষব্ধু জনতার সামনে সুদর্শন এক রাজনৈতিক নেতা অনর্গল বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। তখন জানলাম উনার নাম আমিনুল ইসলাম বাদশা। উনি ন্যাপ দলের নেতা। সে দিন উনাকে আমি প্রথম দেখলাম। শত শত মানুষের মাঝে উনি ভাষণ দিচ্ছেন। এই ঘটনার জন্য উনি পাবনার মুসলিম লীগ নেতা ও তৎকালীন সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন জায়েদীকে দায়ী করছেন। তাঁকে জরুরী ভাবে হাসপাতালে এসে নিহত এবং অসুস্থদের দেখে যাবার দাবী করছেন। এছাড়া এই ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবী করেন।

এক পর্যায়ে মুসলিম লীগ নেতা ক্যাপ্টেন জায়েদী পাবনা সদর হাসপাতালে আসেন এবং সেখানে উপস্থিত বিক্ষুদ্ধ মানুষের সামনে বক্তৃতা দেবার সময় জনতার হাতে লাঞ্চিত হন। সেখান থেকে ক্যাপ্টেন জায়েদী পালিয়ে তার বাসভবনে গেলে জনতা তার বাসভবন ঘিরে বিক্ষোভ করতে থাকে। এমন অবস্থায় জায়েদী তার বাসভবন থেকে গুলি বর্ষন করলে একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর উত্তেজিত জনতা আঃ হামিদ রোডের প্রেসক্লাবের সামনে বন্দুকের দোকান লুট করে অস্ত্র নিয়ে রুপকথা রোডে ক্যাপ্টেন জায়েদীর বাড়ী ( বর্তমান আইন কলেজ) আক্রমন করে। বিক্ষুদ্ধ জনতা জায়েদীর বাড়ী অগ্নিসংযোগ করে। কয়েক ঘন্টাব্যাপী বন্দুকযুদ্ধ সহ সেদিনের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভূমিকায় ছিলেন বাদশা ভাই। পরে ঐ ঘটনায় তিনি সহ অনেক নেতা কর্মী গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। পরবর্তীতে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে প্রায় প্রতিদিন মিটিং মিছিল হতো। ভুট্টা আন্দোলনের পর পরই শুরু হলো তৎকালীন সামরিক সরকার আইয়ুব খানের পতনের আন্দোলন। তখন প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামীলীগ, ন্যাপ ( ভাসানী) ও ন্যাপ (মোজাফ্ফর) হলো প্রধান দল। এসব দলের ছাত্র সংগঠনগুলি ছিল আন্দোলনের মুল শক্তি। ছাত্রলীগের লালু, গোরা, রেজা -ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপে ছিল টিপু বিশ্বাস, বারী সরদার,এম আই চৌধুরী এবং মতিয়া গ্রুপে শফি আহমেদ, মতিউর রহমান বাচ্চু, রবি, রইস, জাহিদ, বুড়ো, মঞ্জু প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য ছাত্রনেতৃবৃন্দ । সে সময়ে ছাত্রলীগের সাথে মেনন গ্রুপের চরম বৈরী সম্পর্ক থাকার পরও আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সবাই ছিল সক্রিয়।

৬৯ এর গন আন্দোলনে আইয়ুব সরকারের পতনের পর ৭০ এর জানুয়ারী মাসে
স্কুল ছাত্রদের উপর নেমে এলো এক কালো ছায়া। ইয়াহিয়া সরকার ৯ম/১০ম শ্রেনীর ছাত্রদের জন্য “পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি “নামে একটি বই বাধ্যতামুলক
বিষয় ঘোষনা করলেন। বইটি ছিল বিতর্কিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত। সেই বইটি বাতিলের দাবীতে সারাদেশে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে আন্দোলন শুরু করলো। ৬৯ এর গনআন্দোলনের সময়ে গঠিত স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বৃহত্তর পাবনা জেলা কমিটিতে আমি ছিলাম যুগ্ম -আহবায়ক। ঐ বইটির বিরুদ্ধে আমি আট পৃষ্টার একটি কবিতা লিখেছিলাম (আমার টাইম লাইনে সেই কবিতা কিছু অংশ আছে)। যাইহোক সেই আন্দোলনের সময় আমরা সমস্ত জেলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্রনেতা ও স্কুল গুলিতে বৈঠক করেছি। সেই আন্দোলনের এক পর্যায়ে আমরা ন্যাপ নেতা বাদশা ভাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলাম। সেটাই উনার সাথে প্রথম কথা বলা।
সেই বৈঠকের স্মৃতির কথা এখনো মনে পড়ে। উনি মুহুর্তের মধ্যে আমাদের আপন হয়ে গেলেন। আমাদের সমর্থন দিলেন, উৎসাহ দিলেন। স্মৃতিকাতর
হয়ে বলেছিলেন, উনি স্কুলের ছাত্র হয়ে আন্দোলন করেছেন। জেলে গেছেন, জেলের মধ্যে পুলিশ তাকে গুলি করে আহত করেছেন । পরে জেনেছি উনি
৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের শুরুতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। ৫০ সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পুলিশ রাজবন্দীদের উপর গুলি করে ৭ জন বন্দীকে হত্যা করেছিল । প্রায় ৩২ জন বন্দী গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। উনি খাপড়া ওয়ার্ডখ্যাত সেই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ
হবার পরেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

আজীবন সংগ্রামী আমিনুল ইসলাম বাদশা জীবনে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রায় ১৩/১৪ বছর জেলে বন্দী ছিলেন। জীবনে বহুবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নীতি এবং আদর্শের কাছে কোনদিন নতি স্বীকার করেন নাই। ক্ষমতা বা আর্থিক লোভকে কোনদিন প্রশ্রয় দেন নাই। রাজনীতির পরিবর্তনের ধারায় কমিউনিষ্ট পার্টী, ন্যাপ, ন্যাপ ( মোজাফ্ফর) বাকশাল, এনএপি হয়ে গনতন্ত্রী পার্টির সাথে যুক্ত থেকেছেন। ভাষা সংগ্রামী, খাপড়া ওয়ার্ডখ্যাত বিপ্লবী, ভুট্টা আন্দোলনে নেতৃ্ত্বদানকারী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সৎ -ত্যাগী, নির্লোভ এই জননেতা ১৯৯৮ সালের ৪ আগষ্ট মাত্র ৬৯ বছর বয়সে আমাদের মাঝ থেকে চীরবিদায় নিয়েছেন। প্রয়াত আমিনুল ইসলাম বাদশা মৃত্যুকালে গনতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি মন্ডলীর সদস্য ছিলেন। এদেশের প্রগতিশীল বামধারা রাজনীতির এক অন্যতম পথিকৃত এই মহান নেতা আজ আমাদের মাঝে আর নেই কিন্তু তিনি রেখে গেছেন সততার এক উজ্জল নিদর্শন। উনার মৃত্যু হয়েছে কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। উনি যুগ যুগ ধরে আমাদের হৃদয়ের মাঝে অমর হয়ে বেঁচে থাকবেন।
(সমাপ্ত)

লেখক পরিচিতি –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।