পাবনার সুজানগরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় খাতার কোড ফাঁস করে নম্বর বৃদ্ধি করার অভিযোগ

পাবনা প্রতিনিধি :
পাবনার সুজানগরে ২০১৮ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় আনোয়ার হোসেন নামের এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে খাতার গোপন কোড ফাঁস করা এবং নম্বর কম-বেশি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এতে কিছু মেধাবী শিক্ষার্থী নম্বর বঞ্চিত হয়েছে আর কিছু অযোগ্য শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক বেশি নম্বর পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরকম ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর অভিভাবক মহল ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছেন। দোষিদের বিচার দাবিতে এরই মধ্যে রাশেদ খান নামের একজন অভিভাবক আদালতের শরনাপন্ন হয়েছেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস অভিযোগের সত্যতা পেয়ে বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তদন্তের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুজানগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন ২০১৮ সালের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার খাতার গোপনীয় কোড কৌশলে হাতিয়ে নেন। তার সাথে উপজেলা শিক্ষা অফিসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারির গোপন সখ্যতার কারণে তিনি কোড নম্বর হাতে পান বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর তিনি সার্ভার থেকে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরও আগাম দেখে নেন। তার বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর মনোপূত না হওয়ায় তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের উপজেলায় ডেকে আনেন। তার বিদ্যালয়ের নম্বর কম পাওয়া পরীক্ষার্থীর খাতায় বেশী নম্বর দেওয়ায় জন্য কয়েকজন পরীক্ষকের উপর চাপ প্রয়োগ করেন।
চাপের মুখে পড়া একজন পরীক্ষক হলেন- ইংরেজি বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক শারমিন আক্তার। তাকে সারাদিন উপজেলা শিক্ষা বসিয়ে রেখে মানসিক নির্যাতন করা হয়। তিনি নিরুপায় হয়ে খাতায় নম্বর বেশি দেয়ার ব্যাপারে রাজি হওয়ার পর রেহাই পান। আনোয়ার হোসেন নিজেই নম্বর কাটাকাটি করে বেশি নম্বর বসিয়ে দেন। এ ঘটনাটি সারা উপজেলায় জানাজানি হয়ে যায়। এর প্রেক্ষিতে একজন অভিভাবক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর অভিযোগ দেন।
সহকারি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রাজ্জাক তদন্তভার পেয়ে জেপ্রাশিঅঃ/পাব/৩৩১৪ তাং ১০/১২/১৮ স্মারক পত্রে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেনকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য চিঠি পাঠান। কিন্ত ওই প্রধান শিক্ষক হাজির হননি। তদন্তকালে কোড নং ১৬৪৫১৯৭৪ খাতায় ৫০ নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীর ৮৫ এবং কোড নং ১৬৪৫১৯৭৫ খাতায় ৫০ স্থলে ৮৭ নম্বর দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। উক্ত খাতা দুইটি কথিত শিক্ষক নেতা আনোয়ার হোসেন নিজেই কাটাকাটি করে নম্বর পরিবর্তন করেন। চাপের মুখে উপজেলায় যাওয়া পরীক্ষকরা তা লিখিতভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানান। এরপর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জেপ্রশিঅ/পাব/১৫২, তাং-২৭/১/২০১৯ স্বারক পত্রে অভিযুক্ত শিক্ষক আনোয়ার হোসেনকে শো-কজ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ায় জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানান, পরীক্ষার খাতার কোড নং শুধুমাত্র ২/১জন শিক্ষা কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারো জানারই কথা নয়। অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেনকে নিশ্চয়ই অনৈতিকভাবে কেউ সহযোগিতা করেছেন। কয়েক বছর আগে ওই উপজেলারই ইউআরসির ডাটাএন্ট্রি অপারেটর কোড ফাঁস করে নম্বর জালিয়াতি করে ধরা পড়েছিলেন বলে সূত্র জানান। এবারও এমন কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে অনেকের ধারণা। এদিকে এ অনিয়মের বিচার চেয়ে সুজানগর উপজেলার নারুহাটি গ্রামের রাশেদ খান নামের একজন অভিভাবক আদালতের শরনাপন্ন হয়েছেন। তার দেয়া উকিল নোটিস সূত্রে জানা যায়, তার মেয়ে সাবরিনা নোভা (রোল ম-১৬২১) এবার সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তিনি নম্বর জালিয়াতির বিষয়টি জেনে তার মেয়ের খাতা পূন:নিরীক্ষণের আবেদন জানান। কিন্তু শিক্ষা অফিস তা আমলে না নেয়ায় তিনি উপজেলা ও জেলা শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে আইনী নোটিশ দিয়েছেন। তিনি জানান উপযুক্ত জবাব না পেলে মামলা করা হবে। তিনি জানান, সুজানগরে খাতার নম্বর জালিয়াতি করা হয়, অথচ খাতা পূন:মূলায়ন করা হয় না। এটা দু:খজনক।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author