প্রত্নতাত্ত্বিক আকর্ষণ ‘জোড়বাংলার’ সংস্কার কাজ সঠিক নিয়মে হচ্ছে না বলছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক

তারেক খান : পাবনা শহরের প্রত্নতাত্ত্বিক আকর্ষণ ঐতিহাসিক জোড়বাংলা নামে পুরাকীর্তিটি দীর্ঘদিন অযত্ন আর অবহেলায় পরে থাকার পর অবশেষে সংস্কার কাজ চলছে। কিন্তু সংস্কার কাজ সঠিক নিয়মে হচ্ছে না। এমনটাই বলছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পিএইচডি গবেষক আবির বিন কায়সার। সম্প্রতি তিনি পাবনার জোড়বাংলা পুরাকীর্তিটি পর্যবেক্ষণ করে জানান, প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিস যেভাবে সংস্কার করার নিয়ম জোড়বাংলার সংস্কার কাজ সেভাবে সঠিক নিয়মে করা হচ্ছে না। জোড়বাংলার সামনের খিলানযুক্ত প্রবেশ পথে কোন টেরাকোটা প্রতিস্থাপন না করে অধিকাংশ জায়গায় সিমেন্ট দিয়ে লেপে দেয়া হয়েছে। গর্ভ গৃহের বাইরের দেয়াল গাত্রে সিমেন্টের প্লাস্টার করে চুন কাম করেছে। মূল বেদির কোন সংস্কার কাজ করা হয়নি। সিমেন্ট ও চুনের ব্যবহারের কারণে স্থাপনার মূল রঙের পরিবর্তন হয়েছে, যা আইন সঙ্গত নয়। এসব সমস্যাগুলোর কথা বলেন এই তরুণ গবেষক।
এ বিষয়ে পাবনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কাস্টডিয়ান মোছাঃ হালিমা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জের সাহ্জাদপুর রবীন্দ্র কাচারীবাড়ীর অফিসে আমার পোস্টিং। মাঝে-মাঝে পাবনাতে গিয়ে কাজ দেখে আসি। কিন্তু জোড়বাংলার সংস্কার কাজ শুরু হবার পর পাবনাতে যাওয়া হয়নি। ওখানকার কাজ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবই দেখছেন। তবে আমি অতি সত্বর পাবনাতে গিয়ে সংস্কার কাজ পরিদর্শন করে সমস্যাগুলো দেখব।

পাবনা শহরের কেন্দ্রস্থল কালাচাঁদ পাড়া মহল্লায় জোড়বাংলা মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটির নির্মাণ কাল সম্পর্কে কেউ কোন সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। তবে পাবনা জেলার ছাতিয়ানী গ্রামের ভোলানাথ সান্যালের নিকট রক্ষিত ১৬০৭ সালের একটি দলিল পাওয়া যায়, যাতে দেখা যায় ব্রজবল্লভ ক্রোড়ী জোড়বাংলার প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে এ মন্দিরের অভ্যন্তরে কোনো মূর্তি নেই। স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত কাহিনীতে জানা যায়, কোন এক আনর্থ কারনে এ মন্দিরের পূজা-অর্চনা বন্ধ ছিল। তবে অনেকে বলে এখানে ব্রোঞ্জের তৈরি মূর্তি ছিল যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খোয়া যায়। মন্দিরটি আয়তনে বৃহৎ না হলেও বাংলাদেশের সকল জোড়বাংলা নিদর্শনের মধ্যে সুন্দরতম। দুটি দোচালা সংযুক্ত করে মন্দিরের উপরের ছাদ বক্রাকারে নির্মিত হয়েছে যার নির্মাণ শৈলী আমাদের প্রচলিত গ্রামের কুঁড়ে ঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরের সম্মুখ দেয়াল ও স্তম্ভ আগাগোড়া পোড়ামাটির চিত্র-ফলক দ্বারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খোপে চমৎকারভাবে অলংকৃত। প্রত্যেকটি খোপে বিভিন্ন সামাজিক ও পৌরাণিক কাহিনী উৎকীর্ণ করা হয়েছে। জোড়বাংলা মন্দিরের অপূর্ব নির্মাণকৌশল, স্থাপত্যশিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন। কালের আবর্তে পুরাতন ইতিহাস নিয়ে মাথা উঁচু করে পর্যটক আকর্ষণের জন্যে দাঁড়িয়ে আছে দেশীয় সম্পদ জোড়বাংলা। রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যটন কেন্দ্র না হলেও সুপরিচিত এই প্রাচীন পুরাকীর্তিটি দর্শণে প্রতিদিন ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দূর-দূরান্ত থেকে আগত শতশত পর্যটকের সমাগম ঘটে। তাই পাবনার সচেতন মানুষের প্রাণের দাবি, পাবনা শহরের প্রাচীন পুরাকীর্তির গৌরবময় ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য জোড়বাংলা পুরাকীর্তিটিকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সংরক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহন করবেন কতৃপক্ষ।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author