Main Menu

ওসির দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের পদায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের নীতিনির্ধারণী গ্রুপে আলোচনা হবার পর শিগগিরিই অনুমোদন দেওয়া হবে। এরপরই থানার দায়িত্বে অ্যাডিশনাল এসপিদের বসানোর ঘোষণা।

এদিকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত শোনার পরই ক্ষুব্ধ ও হতাশ নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যরা গত শুক্রবার বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের জরুরি সভা ডেকে বিষয়টি আলোচনা করেছেন। সেখানে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসব তথ্য জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রশাসন শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, থানায় এডিশনাল এসপি দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। তবে রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসন ক্যাডার কখনো এটা চায় না। তারা চায় সহকারী কমিশনার বা পরিদর্শকরাই থানার দায়িত্বে থাকুক।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত মে মাসে রাষ্ট্রপতির কাছে বাৎসরিক প্রতিবেদন জমা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই প্রতিবেদনে দুর্নীতি রোধে থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এরপরই নতুন করে আলোচনায় আসে বিষয়টি। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা।

থানায় অ্যাডিশনাল এসপি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে- এমন খবরে নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করলেও এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওসি বলেন, দুদক চেয়ারম্যান কী কারণে ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছেন বোধগম্য নয়। কারণ দুদকের উপসহকারী পরিচালক, সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক বা পরিচালকসহ যারা অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্বে থাকেন তাদের কেউই বিসিএস ক্যাডার নন। সেখানে মামলার তদন্ত ও অনুসন্ধান পরিচালনায় জটিলতা না হলে পুলিশ বাহিনীতে হবে কেন? দুদকের প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনাও করেন তারা।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, থানার ওসি হিসেবে এডিশনাল এসপি নিয়োগ দেওয়া হলে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হবে। ওসিরা ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পরোয়ানা ও আদেশ তামিল করেন। ওসিরা এডিশনাল এসপি পদমর্যাদার হলে তাদের সঙ্গে মেট্রোপলিটন বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের পদমর্যাদার বিরোধ দেখা দেবে। কারণ একজন এডিশনাল এসপি সিনিয়র মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সমান বেতন স্কেল পান।

তারা আরও জানান, থানায় ওসি হিসেবে এডিশনাল এসপি পদায়ন হলে সহকারী পুলিশ সুপার ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপারদের পদায়ন কোথায় হবে? সার্কেলে সহকারী পুলিশ সুপার বা জোনের সহকারী কমিশনার পদে কারা থাকবেন সেটাও নির্ধারিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে থানায় এডিশনাল এসপি পদায়ন করা হলে বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়গুলো আগেই মীমাংসা হওয়া জরুরি।সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৭ সালে থানায় ওসি পদে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা বা সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) নিয়োগ দেওয়ার প্রথম নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পরে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০১০ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের পলিসি গ্রুপের বৈঠকে ওসি হিসেবে এএসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাছাড়া ২০০৯ সালে অনুমোদন হওয়া ডিএমপির অর্গানোগ্রামে থানায় ওসি হিসেবে পরিদর্শকের পরিবর্তে সহকারী কমিশনার (এসি) বা সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় তিনজন করে পরিদর্শক দেওয়ার কথাও বলা হয়। পদগুলো হচ্ছে- পরিদর্শক প্রশাসন, পরিদর্শক তদন্ত ও পরিদর্শক অপারেশন। পরে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে থানায় এসি বা এএসপি পদায়ন করা হয়নি। তবে থানায় একজন পরিদর্শককে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্ব দিয়ে পাশাপাশি একজন করে পরিদর্শক তদন্ত ও পরিদর্শক অপারেশন নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশের প্রায় সব থানায় তিনজন করে পরিদর্শক দায়িত্ব পালন করছেন।

তারা আরও জানান, এরপর ২০১৬ সালের নভেম্বরে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রংপুর রেঞ্জের ২৫ থানায় এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া গুলশান থানার তৎকালীন ওসি সিরাজুল ইসলামকে সহকারী কমিশনার পদোন্নতি দিয়ে তাকেও দায়িত্বে রাখা হয়। সিরাজুল ইসলাম ওই সময় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। ওই সময় ওসি পদে ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। তাদের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল তৎকালীন আইজিপি শহীদুল হকের সঙ্গে দেখা করে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জননিরাপত্তার বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র সচিবকে গণভবনে ডেকে ওসি পদে এএসপি নিয়োগ না দেওয়ার জন্য বলেন। এরপর ২৫ থানায় সহকারী কমিশনার দেওয়ার সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি।

রাজধানীর মতিঝিল বিভাগের একটি থানার ওসি বলেন, বর্তমানে দুই থানা মিলে একটি সার্কেল। সেখানে তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে একজন এসি বা এএসপি, কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দায়িত্ব পালন করছেন। থানার ওসি পদে থাকা পরিদর্শকরা এখন প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা পাচ্ছেন। তারা যথেষ্ট দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ওসির দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এই অবস্থায় আমরা জেনেছি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে থানায় ওসির দায়িত্ব দেওয়া হবে। এতে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর গুলশান বিভাগের এক ওসি বলেন, এখন থানায় বহু কনস্টেবলও আছে যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স পাস করা। তাদের স্বপ্ন থাকে ইউনিটের প্রধান হওয়া বা ওসির দায়িত্ব পালন করা। কনস্টেবলরা পদোন্নতি পেয়ে এএসআই, এসআই ও পরে ইন্সপেক্টর হয়ে ওসির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু থানায় এডিশনাল এসপি নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের সেই আকাক্সক্ষা কখনই বাস্তবায়ন হবে না। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেবে। সূত্র: দেশ রূপান্তর