Main Menu

‘স্বর্ণের শহরে’ বিনা ভাড়ায় থাকেন তারা!

তিন স্তরবিশিষ্ট দেয়াল, মনোরম চারটি দরজা ও ৯৯টি বুরুজ রয়েছে কেল্লাটিতে। ২০তলার বেশি উচু কেল্লাটি দাঁড়িয়ে আছে ত্রিভুজাকৃতির একটি পাহাড়ের উপর। নিচ থেকে দেখলে বেলেপাথরের এ কেল্লাকে সোনালী দূর্গের মতো মনে হয়। থর মরুভূমি বেষ্টিত কেল্লাটি ভারতের রাজস্থান রাজ্যের পশ্চিমে জয়সালমিরে অবস্থিত। প্রথম দেখায় মনে হবে, এ যেন এক বিচ্ছিন্ন শহর।

এখন থেকে ৮০০ বছরেরও বেশি সময় আগে ১১৫৬ সালের দিকে গড়ে ওঠে এই কেল্লা। রাজপুত রাও জয়সাল থর মরুভূমিতে গড়ে তোলেন তার এই সাম্রাজ্য আর নামকরণ করেন জয়সালমির। তখন থেকেই বংশপরম্পরায় এখানে বাস করছেন রাজপুতরা, আছে স্থানীয় অধিবাসীও।

রাজস্থানের পাঁচটি রাজকীয় কেল্লার সঙ্গে জয়সালমির ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। এই কেল্লা নির্মাণে হলুদ বেলেপাথরের আকর্ষণীয় মধু রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। যার ফলে এটিকে স্বর্ণের শহরের ন্যায় মনে হয়।

যদিও কেল্লাটি কেবল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যই নয়, তার চেয়েও বেশিকিছু। প্রচীনকাল থেকে দুই থেকে চার হাজার মানুষ কেল্লাগুলোর অভ্যন্তরে বিনা ভাড়ায় বসবাস করতো। রাজ্যে প্রাচীন অধিবাসীদের সেবায় খুশি হয়ে স্থানীয় রাজারা এ জায়গা দিয়েছিলেন। আর তখন থেকেই দুর্গের মধ্যে বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা।

এখন জয়সালমির শুধু ভারতে বাস্তুচ্যুতদের জন্য শেষ প্রাচীন কেল্লায় নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভের মতো। যেখানে ১২ শতক থেকে সরু গলি ও অতিরিক্ত বাসিন্দাদের ভিড়ের যে দৃশ্য ছিল তার সেই চিরচেনা রূপ কয়েক’ শ বছর পার হলেও বদলায়নি কিছুই। এখনও সরু গলিতে গাদাগাদি করেই জীবনযাপন করছেন এখানকার বাসিন্দারা।

ঐতিহাসিকভাবে আশেপাশে কেবলমাত্র যাজক ব্রাহ্মণদের আবাসস্থল ছিল, যারা স্থানীয় রাজাদের শিক্ষক ও পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতেন। রাজারা ১২ শতক থেকে ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই জয়সালমির শাসন করেছিলেন। সে সময় কেল্লার ভেতরে তাদের ঘর দেওয়া হয়েছিল। আজ সাত শতাব্দি ও ২৩ প্রজন্ম পরে এসে প্রাচীন এই কেল্লার অভ্যন্তরে ৪২টি ব্রাহ্মণ পরিবার বাস করে।

৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে কেল্লার মধ্যে বাস করছেন ভিমল কুমার গোপার পরিবার। তার ছোট্ট বাড়ি কুন্ডপাদা থেকে ৪৪ বছরের পুরনো একটি টেক্সটাইল গ্যালারি পরিচালনা করেন তিনি।

তার দেয়া তথ্যমতে, দুর্গের অভ্যন্তরে সব পরিবার এক হয়েই বসবাস করে। এখানে ব্রাহ্মণদের পাশাপাশি জয়সালমির বসবাসকারী আরেকটি প্রভাবশালী সম্প্রদায় হলো রাজপুত।

গোপার মতে, বাসিন্দাদের উপাধিতে তাদের অতীতে পারিবারিক একটি ইঙ্গিত রয়েছে। যেখানে ব্রাহ্মণরা পুরাহিত ও ভাস নামে পরিচিত। আর রাজপুতরা ভট্টি, রাথোর বা চৌহান নামে পরিচিত।

সংকীর্ণ গলির একটি হস্তশিল্প শো-রুমের বিক্রয়কারী রাতেন্দ্রো পুরোহিত জানান, ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে তার পরিবার কেল্লাটিতে বসবাস করে আসছে। কতগুলো প্রজন্ম সেটা তার জানা না থাকলেও তিনি জানেন এটাই তাদের একমাত্র বাড়ি।

স্মরণীয় গোপা ও পুরোহিত পরিবার জয়সালমির কেল্লার ভেতরে বেশ সাধারণভাবে জীবনযাপন করেন। তাদের মতো বেশিরভাগই এখানে জন্মগ্রহণ করে এবং এখনেই কাজকর্ম করে। গত শতাব্দি থেকে কিছু মানুষ আবার আংশিকভাবে তাদের বাড়িতে দোকান, ক্যাফে বা গেস্টহাউস খুলেছেন। যা থেকে তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের আগমনে তাদের ব্যবসার প্রসার এখন বড় হচ্ছে।

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে রাজ্যটি সিল্ক রোড ট্রেডিং রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ হিসেবে চীন, ভারত, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও মিশরকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। ব্যবসায়ীদের দল পূর্বাঞ্চল থেকে সিল্কের বান্ডিল, মূল্যবান পাথর, মশলা, চা ও আফিম নিয়ে জয়সালমিতে থামতো। সেখানে তারা খাওয়া ও ঘুমানোর জন্য রাত কাটাতো। স্থানীয় শাসকরা ভ্রমণকারীদের জন্য জয়সালমির ভেতরে ও বাইরে থাকার ব্যবস্থা করে অর্থ উপার্জন করতেন।

কয়েকশ বছর পর সেই সিল্ক রোড এখন স্মৃতি হয়ে আছে পরিত্যক্ত গ্রাম, পাথর ও মরুভূমির বুকে বাস্তুচ্যুতদের বসবাসকারী একটি কেল্লা হিসেবে। তারপরও এর আবেদন ফুরায়নি আজও। স্বর্ণালি রংয়ের এই কেল্লার মধ্যকার সংকীর্ণ রাস্তা ও গম্বুজ সম্মলিত বেলেপাথরের দেয়ালগুলো এখনও অনেক ভ্রমণকারীর আকর্ষণীয় স্থান।

পর্যটকদের আনাগোনায় এখন জয়সালমির কেল্লায় ছোট ছোট চা দোকান, ক্যাফে, অতিথিশালা, বাড়ি, মন্দির ও বুটিকসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পর্যটকদের থেকে অর্থ উপার্জন করে স্থানীয় তথা কেল্লাগুলোর মধ্যে বসবাসকারীরা আয়-রোজগার করেন। এখানকার কিছু মানুষ খাবার সরবরাহ করে ও উটের চামড়ার তৈরি হাতব্যাগ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তবে জয়সালমির মধ্য থাকলেও বাইরের মানুষদের সাথে তাদের সম্পর্ক মোটেই খারাপ নয়। এখন তারা বাইরের মানুষের সাথেও তাদের বন্ধন গড়ে তুলতে শুরু করেছেন। যার ফলে এখন জয়সালমির কেল্লার বাইরের অনেক মানুষ কেল্লার অভ্যন্তরের বাসিন্দাদের সঙ্গে সন্তানদের বিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন না।

অন্যদিকে পুরো কেল্লায় যেন একটি পরিবার। গোপার মতে, এই ছোট দুর্গম সম্প্রদায়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের কোনো প্রয়োজন হয় না। কারণ পুরো কেল্লাটিই একটি পরিবার। অনুষ্ঠানে সবাই অংশগ্রহণ করে।

পুরোহিত বলেন, এখানে আখেরি প্রল নামে পরিচিত প্রধান গেট দিয়ে আমাদের সীমানা শুরু ও শেষ হয়। এটি আমাদেরকে শহর থেকে আলাদা করেছে। বিয়ে বা মৃত্যুর সময়ে আমরা সবাই একত্রিত হই। কয়েক বছর আগে আমার মায়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, তখন আমার প্রতিবেশীরাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। এই সাদৃশ্যের জন্যই আমি এখানে বসবাস করতে পছন্দ করি। শতাব্দী ধরে আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

কেল্লাগুলো ইতিহাস তুলে ধরতে প্রাচীন একটি ভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। যেখানে ১৫ শতক থেকে বর্তমান পর্যন্ত কেল্লাগুলোর প্রতিদিনের জীবনযাত্রা সংরক্ষিত আছে। মিসাপেন কয়েন, প্রাচীন মানচিত্র, ফেইডিং সেপিয়ার ছবি, রান্নার পাত্র, অলঙ্কারের পাগড়ি ও পূর্বের নানা জিনিসের অংশবিশেষ এই জাদুঘরে রয়েছে।

জাদুঘরের ব্যবস্থাপক রাকেশ ভায়াস তার পুরো জীবন কেল্লার ভেতরে কাটিয়েছেন। জাদুঘরটি উত্তরাধীকার সূত্রে তিনি পেয়েছেন।

রাকেশ ভায়াস বলেন, জাদুঘরটি কেল্লার গর্বিত ইতিহাসের সাক্ষী। তবে প্রাচীন এই ভবন জাদুঘরে রূপান্তর করা সহজ ছিল না। এর জন্য সরকার বা অন্য কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি।

আধুনিকতার ছোয়া লাগলেও এখানকার বাসিন্দারা মনে করেন কয়েক’শ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য এত তাড়াতাড়ি হারাবে না। টিকে থাকবে আরও বহুদিন। যেমনটা জানান গোপা প্রকাশ।

তার মতে, অবশ্যই জীবন বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা আশা করি আমাদের সন্তানরা এবং তাদের সন্তানরাও পূর্বপুরুষদের মতো এখানে থাকতে পারবে। আর তার জন্য তাদেরকে কারো কোনো অর্থ দিতে হবে না।