Main Menu

বাংলাদেশ অধিনায়কদের

বিশ্বকাপ ধাঁধা

সেমিফাইনালে যেতে পারলে চার ম্যাচ বাকি। ফাইনাল পর্যন্ত গেলে পাঁচ ম্যাচ। নইলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ বাকি তিনটি। মাশরাফি বিন মর্তুজারও তা-ই। পারফরম্যান্সের ইতিহাস বদলানোর জন্য অধিনায়কের হাতে রয়েছে ওই তিন অথবা চার কিংবা পাঁচ ম্যাচ।

আর সে দায় শুধু নিজের নয়, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়কদেরই। আগের পাঁচ আসরে লাল-সবুজের নেতাদের বেশির ভাগই যে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারেননি! বরং বিশ্বকাপ আসতেই কারো কারো ব্যাট-বলে এমনভাবে জং ধরে, যা বিস্ময়কর।

এবারের বিশ্বকাপের পাঁচ ম্যাচে মাশরাফির বোলিং তেমনই অবাক করা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ছয় ওভারে ৪৯ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ওভারে ৩২ রান দিয়েও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ ওভারে ৬৮ রান দিলেও জনি বেয়ারস্টোকে আউট করে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম শিকার করেছেন। সেটিই এখন পর্যন্ত তাঁর একমাত্র। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আট ওভারে ৩৭ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আট ওভারে ৫৬ রান দিলেও কোনো উইকেট পাননি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তাই মাশরাফি সাকল্যে ৩৭ ওভারে বোলিং করে ২৪২ রান দিয়ে পেয়েছেন এক উইকেট। গড় ২৪২, স্ট্রাইক রেট ২২২! উইকেট না পেলে বোলিংয়ে কৃপণতা তো দেখাবেন! ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে ম্যাচ ছাড়া সে জায়গায়ও ব্যর্থ অধিনায়ক। সে কারণেই তাঁর ইকোনমি ৬.৫৪। মাশরাফির এমন পারফরম্যান্স প্রত্যাশার সমানুপাতিক নয় কিছুতেই। শুধু মাশরাফিই কেন, বিশ্বকাপের সঙ্গে বাংলাদেশ অধিনায়কদেরই তো যুগ যুগান্তরের বৈরিতা। সেই ১৯৯৯ আসরের প্রথম অংশগ্রহণের কথা ভাবুন। নেতৃত্ব থাকায় আমিনুল ইসলামের গর্বটাও কম থাকার কথা নয়। সে আসরে পাঁচ ম্যাচ খেলে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রত্যাশিত এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে ভীষণই অপ্রত্যাশিত জয় পায় বাংলাদেশ। সামগ্রিক দলীয় পারফরম্যান্স এমন আলো ছড়ানো অথচ অধিনায়কের ব্যাটে রাজ্যের অন্ধকার। বিশ্বকাপের পাঁচ ম্যাচ মিলিয়ে আমিনুলের ব্যাটে মোট রান যে মাত্র ৪৫! গড় ৯। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম খেলায় যে ১৫ রান করেন, সে স্কোর আর টপকে যেতে পারেননি বাকি টুর্নামেন্টে। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ০, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৩ এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ খেলায় আবার আউট হন ১৫ রান করে।

২০০৩ বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলা ভেসে যায় বৃষ্টিতে; বাকি পাঁচ ম্যাচের পাঁচটিতেই হার। হার এমনকি কানাডা-কেনিয়ার মতো দলের কাছেও। অধিনায়ক খালেদ মাসুদ দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান করেন বটে। কিন্তু যখন জানবেন, ছয় ম্যাচ মিলিয়ে সে সর্বোচ্চ রান ৯৯, তা মোটেও মধুর স্মৃতি নয়। উইকেটকিপিংটাও তাঁরা মানদণ্ডে হয়নি; দলের ফলও যাচ্ছেতাই। সব মিলিয়ে গর্ব নিয়ে স্মৃতির ধুলো ঝাড়ার উপায় নেই মাসুদের।

২০০৭ বিশ্বকাপে হাবিবুল বাশারের অবস্থা ১৯৯৯ আসরের আমিনুলের মতো। দল ভালো করছে কিন্তু তাতে অধিনায়কের ব্যাটের অবদান যিকঞ্চিত্। ৯ ম্যাচের আট ইনিংসে হাবিবুলের মোট রান ছিল ১০৫। সর্বোচ্চ ৩২, গড় ১৩.১২, স্ট্রাইকরেট ৪৫.৮৫। ভারত (১), শ্রীলঙ্কা (১৮), অস্ট্রেলিয়া (২৪), নিউজিল্যান্ড (৯), দক্ষিণ আফ্রিকা (৫), ইংল্যান্ড (৪), আয়ারল্যান্ড (৩২) কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ (১২)—টুর্নামেন্টে হাবিবুলের ব্যাটে মেঘ সরিয়ে রোদের উঁকি আর দিলই না। বিশ্বকাপের পর পর ভারতের বিপক্ষে সিরিজেই ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ারও বড় ভূমিকা তাতে।

২০১১ বিশ্বকাপ অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে ব্যতিক্রমের ব্র্যাকেটবন্দি করতে হবে। ছয় ম্যাচে ২৩.৬৬ গড়ে দলের পক্ষে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৪২ রান করেছেন। একমাত্র ফিফটি প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে। সঙ্গে বাঁহাতি স্পিনে দলের পক্ষে নেন সর্বোচ্চ আট উইকেট। ৪৬.২ ওভার বোলিংয়ে ২৭.৮৭ গড় এবং ৪.৮১ ইকোনমিতে সাকিবের সে অর্জন।

সর্বশেষ বিশ্বকাপে অধিনায়ক মাশরাফি খুব যে ভালো করেছেন, তা বলা যাবে না। আবার খুব খারাপও তো করেননি। দলের ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে খেলেছেন; ধীরগতির ওভাররেটের কারণে বহিষ্কারাদেশের আশঙ্কায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি কেবল। ৫ ম্যাচে ৪৭ ওভার বোলিংয়ে শিকার সাতটি; গড় ৩৫.৭১, ইকোনমি ৫.৩১। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ৯ ওভারে ২০ রান দিয়ে তিন শিকার তাঁর সেরা বোলিং।

এবারও মাশরাফি অধিনায়ক। দুই বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম ক্রিকেটার তিনি। টুর্নামেন্টে খুব খারাপও তো করছে না দল। এরই মধ্যে হারিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো পরাশক্তিদের। সেমিফাইনাল খেলার আশা একেবারে মিলিয়ে যায়নি। কিন্তু এমন দলীয় সাফল্যেও খচখচ করছে অধিনায়ক মাশরাফির ফর্ম হারিয়ে ফেলা। তাঁর পূর্বসূরি আমিনুল-হাবিবুলদের মতো।

বাকি ম্যাচগুলোয় তা বদলে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মাশরাফির। আজ আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বৈরথ দিয়ে যার শুরু। প্রেরণার জন্য তাঁর কানে একটি পরিসংখ্যান আওড়ানো যেতে পারে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোনো অধিনায়ক কখনোই ম্যান অব দ্য ম্যাচ হননি!

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বাকি তিন অথবা চার কিংবা পাঁচ ম্যাচের মধ্যে তা কি পারবেন মাশরাফি?

বিশ্বকাপে হাসছে সাকিবের ব্যাট। সঙ্গে সৌম্যর ব্যাটও হেসে উঠলে বাংলাদেশের আর চিন্তা কী! আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগের অনুশীলনে নির্ভার সাকিব-সৌম্যকে দেখে নির্ভরতা পেতেই পারে দল।