Main Menu

নকল যুবরাজ আসল সাকিব

ভারতে লুক অ্যালাইকের অভাব নেই। দেবানন্দ থেকে শুরু করে শাহরুখ খান, বলিউডের প্রায় সবারই নকলদের দেখা যায় দেশটির বিভিন্ন টি শোতে। তাই গতকাল বার্মিংহামে বাংলাদেশ দলের হোটেলের পোর্টিকোতে নকল যুবরাজ সিংকে দেখে বিষম খেতে হয়নি। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সময়ও এ ভারতীয়কে দেখা গিয়েছিল বার্মিংহামে। আসল যুবরাজের সঙ্গে নকলের ছবি টুইটারে ঝড়ও তুলেছিল সেদিন।

আসল যুবরাজ ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন কিছুদিন আগে। তাই ভারতীয় জার্সিতে নকল যুবরাজ যতই অবিকল আসলের মতো হন না কেন দেখতে, তার দিকে ঘুরে তাকানোর সময় নেই বাংলাদেশের। একে একে সবাই গিয়ে উঠেছেন টিম বাসে প্র্যাকটিসে যাওয়ার জন্য। তবে ক্রিকেটে কাকতালীয় ব্যাপার-স্যাপারের ওপর গোপন বিশ্বাস আছে অনেকের। ভারতীয় দল তখন ইংল্যান্ডকে বোলিং করছে এজবাস্টনে। অথচ নকল যুবরাজ কি না ঘুরঘুর করছেন হোটেলের সামনে! কোনো দুরভিসন্ধি থেকে নয় তো? মানে, উপস্থিতি দিয়ে ২ জুলাইয়ের ম্যাচে মাশরাফিদের স্বপ্নভঙ্গ অনিবার্য করার জন্যই কি তিনি দেখা দিয়ে গেলেন?

কয়েক মূহূর্তের ভাবনা মাত্র। ততক্ষণে যে হোটেলের নির্গমন পথ দিয়ে বেরিয়ে আসছেন সাকিব আল হাসান। ২০১৯ বিশ্বকাপে যাঁর নৈপুণ্য দেখে বারবারই ফিরিয়ে আনছে যুবরাজ সিংকে। ২০১১ সালে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল বাঁহাতি এ অলরাউন্ডারের। ৩৬২ রান আর ১৫ উইকেট নেওয়া যুবরাজই জিতেছিলেন ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরস্কার। ২০১৯ বিশ্বকাপে যে পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার এখন সাকিব। ৬ ম্যাচেই ব্যাটে যুবরাজকে ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের বাঁহাতি অলরাউন্ডার (৯৫.২০ গড়ে ৪৭৬ রান)। বোলিংয়ে রয়েছে ১০ উইকেট। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা তো মনে করেন, সাকিবের এবারের নৈপুণ্য ২০১১ বিশ্বকাপের যুবরাজ সিংহের চেয়েও বেশি দাপুটে, ‘সাকিব অন্য কোনো দলের হলে ওকে নিয়ে অনেক বেশি মাতামাতি হতো।’

পরশু বিকেলে বার্মিংহাম থেকে প্রায় এক ঘণ্টার ড্রাইভ দূরত্বে শেকসপিয়ারের ভিটেয় গিয়ে দেখা কলকাতা থেকে আগত এক ভারতীয় ক্রিকেট দর্শকের। তিনি যথারীতি সাকিবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘অসাধারণ।’ তিনি আশাবাদী যে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হারাবেই। কিন্তু ভারতের সঙ্গে পারবে না। ‘ল অব অ্যাভারেজ’ মেনে ২ জুলাই এজবাস্টনে ব্যাট হাসবে না সাকিবের!

ভারতীয় কেউ তো এমনটিই আশা করবেন। কিন্তু উন্থান-পতনের খেলা ক্রিকেটে সাকিবের দুর্দিনের বৃত্তে ঢুকে পড়ার আশঙ্কার কথা তো শোনা যায় নিখাদ বাংলাদেশিদের আড্ডায়ও। প্রতি ম্যাচেই কি সাকিব রান করে দিবেন নাকি, তেমনটি বিরলই ক্রিকেটে। সদ্যই বাংলাদেশ থেকে উড়ে আসা এক বিশিষ্টজনের বিস্ময়, ‘কিভাবে পারছে? অবিশ্বাস্য!’

অবিশ্বাস্য তো বাংলাদেশের পুরো ব্যাটিং ইউনিটই। সেই আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে ধরলে গত দশ ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতার গল্প একটাই—নিউজিল্যান্ড ম্যাচে। সেটিও ড্রেসিংরুম থেকে একটি ভুল বার্তার জের বলে জানা গেছে। তিনশ’র চিন্তায় ঘুমাতে ভুলে যাওয়া বাংলাদেশ দলের কাছে এখন সোয়া তিন শ, সাড়ে তিন শ রানও অসম্ভব নয়। ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার সাড়ে তিন শ’র বেশি রান তাড়া করতে নামা বাংলাদেশও গুঁড়িয়ে যায়নি। একটির পর একটি বড় জুটি হয়েছে। ব্যাটিংয়ের এই রংবদলই সেমির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখে বাংলাদেশের।

একটি মাস্টারস্ট্রোকেই এই রংবদল। মাস্টার নিজেই স্ট্রোকটা খেলেছেন। তিনি সাকিব আল হাসান। তিন নম্বরে প্রমোশনটা তিনি চেয়ে নিয়েছেন। উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর টেনশনের যে স্রোত বয়ে যায় ড্রেসিংরুমে, সেটির নিরেট বাঁধ হয়ে উঠেছে সাকিবের ব্যাট। কখনো তামিম ইকবাল, কখনো বা সৌম্য সরকারের সঙ্গে জুটি গড়ে উইকেট হারানোর চাপ সরিয়ে দিচ্ছেন দলের বাকি ব্যাটসম্যানদের ওপর থেকে। এরপর মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে স্থিতি দিচ্ছেন দলের ইনিংসকে। তাতে বড় ইনিংসের জীবনীশক্তি মিলছে বাংলাদেশ দলের। তাতে তিন নম্বরে সাকিবের উঠে আসাকে এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা কৌশলগত পরিবর্তন।

এগুলো কেতাবি আলোচনা। বিশ্বকাপের মতো আসরে প্রতিটি ম্যাচেই ‘একক চরিত্র’ হয়ে ওঠা তার চেয়েও বেশি কিছু। এবার তিনটি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। তিনটিতেই তিনি ম্যাচসেরা। ভারতের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্বভাবতই তাঁর কাছে অনেক আশা বাংলাদেশের। মাশরাফি বিন মর্তুজার অবশ্য বাড়তি কোনো চাওয়া নেই, ‘টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ওর (সাকিব) সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছি। কয়েকটি কথাতেই বুঝে গেছি ওকে বলার কিছু নেই। ও জানে কী করতে হবে।’ সেই আলোচনায় আর দশজনের সঙ্গে সাকিবের মানসিকতার পার্থক্যও নতুন করে জেনেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘সাকিবের ভাবনার জগিট ডিফারেন্ট। এত কষ্ট করে নিজেকে তৈরি করেছে ভালো কিছুর জন্যই। তবে আমি জানি, মাঠে ভালো ফল না পেলেও হতোদ্যম হয়ে পড়ার মানুষ ও না। কষ্টের সুফল একদিন মিলবেই—এই বিশ্বাস ওর আছে।’ ডেপুটির মনোজগতের খোঁজ জানা বাংলাদেশ অধিনায়কও খানিকটা বিস্মিত, ‘অসাধারণ, এর বেশি কিছু বলার নেই। ’

আইপিএল থেকে ঝরঝরে হয়ে ফেরা যে সাকিবকে দেখে আগাম ম্যান টুর্নামেন্টকে বাছাই করেছিলেন তাঁরাও। যেমন ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ,‘সত্যিই এতটা ভাবিনি। তবে এখন মনে হচ্ছে আরো কিছু দেখা বাকি আছে।’

বাংলাদেশেরও রাউন্ড রবিন লিগের দুটি ম্যাচ বাকি আছে। সেমির ভাগ্য পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে নেই। বিশ্বকাপের শেষ বাঁকে দাঁড়িয়ে মাশরাফির মনেও কষ্টের একটি কাঁটা খচখচ করছে, ‘সাকিব এত ভালো খেলছে। এর পরও আমরা সেমিতে উঠতে না পারলে ওর জন্য বেশি খারাপ লাগবে।’  লাগারই কথা।