অন্তত যে কয়জন বীরাঙ্গনাকে এখন পাওয়া যাচ্ছে সেই কয়জনকে মৃত্যুর আগেই রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদা দেবার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, এই ডিসেম্বরেই বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদানের আহবান জানান।
            শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘শেষ হোক বীরঙ্গনাদের বেদনার দিন- বীরাঙ্গনাও মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র ও রাইজিং পথ অব ওয়ার হিরোইনস এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
            মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ফ ম মোজাম্মেল হক বলেন, বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বিভিন্ন দেশে যে ভাবে দেওয়া হয় সেভাবেই আমাদের দেশের বীরঙ্গনাদের সম্মানিত করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। গেজেট প্রকাশ করার মতো উল্লেখযোগ্য নাম এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি জেলায় জেলায় নারীদের দিয়ে কমিটি করে বীরঙ্গনাদের খুঁজে বের করা হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয় তাদের জন্য আরো বেশি কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বঙ্গবন্ধু যেহেতু বীরাঙ্গনা নামটি দিয়েছিল সেহেতু বীরাঙ্গনা নামটি রেখেই বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা নামে তাদের স্বীকৃতি দেবার জন্য কাজ করছে সরকার।
তিনি বলেন, পাঠ্যপুস্তকে শুধু মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা থাকলেই হবে না। রাজাকার-আলবদরদের অন্যায় অপকর্মগুলোর ভয়াবহ চিত্রও লেখা থাকবে। আমরা বিসিএস এ ১০০ নম্বর মুক্তিযুদ্ধের উপর পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানা কেউ সরকারি চাকরি করতে পারবে না।
            বরেণ্য কলামিস্ট ও ভাষা সৈনিক আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, ইংল্যান্ডে ব্ল্যাক বললে ৫০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়। সেখানে বলতে হয় ‘নন হোয়াইট’। আমাদের দেশেও বীরাঙ্গনাদের অসম্মান করে যেসব কথা বলা হয় এ ধরনের অপরাধের আইনি পদক্ষেপ নেয়া হোক। তিনি বলেন, এদের দেখুন এরা যে ত্যাগ করেছে তার সরকারি, সামাজিক, পারিবারিক কোন স্বীকৃতিই মেলেনি। শুধু বীরাঙ্গনা নিজে নয় তার সন্তানকে পর্যন্ত এর জন্য এই দেশের কাছ থেকে মানুষের কাছ থেকে নিঃগৃহীত হতে হয়েছে। এই কারণে কেউই বীরাঙ্গনা পরিচয় দিতে চায় না।
            তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, বিজয় দিবসের দিন আমরা কলকাতায় ছিলাম। সেখান থেকেই খবর পাই যশোর স্বাধীন হয়েছে। তখন আমরা দুইটি গাড়িতে যশোরে প্রবেশ করি। তখন যে দৃশ্য দেখি তা কোনো দিন ভুলতে পারিনি। দেখি, পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া ব্যারাক থেকে ১৯ জন মেয়েকে উদ্ধার করে এনেছে। এ সময় তাদের গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। শুধু ধর্ষণই নয় এই নারীদের উপর ভয়ঙ্কর র্নিযাতন করা হয়েছে। পাকিস্তানি আর্মিরা এদের ইসলামের নামে ধর্ষণ করেছে। আর শিখ সৈনিকরা যাদের ধর্মে নিজেদের পাগড়ি খোলা ধর্মীয় অপরাধ তারা তাদের মাথার পাগড়ি খুলে এই মেয়েদের গা ঢেকে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, সরকারের বৃহত্ পরিকল্পনার বাইরে এসে এখন যে কয়জন বীরাঙ্গনাকে পাওয়া গেছে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হোক, না হলে যে কয়জন বেঁচে আছে, তারাও মারা যাবে। বীরাঙ্গনাদের পুর্নবাসনের জন্য বীরাঙ্গনা ট্যাক্স চালু করা হোক। তাদের চাকরি দেয়া হোক এবং তাদের সন্তানদের জন্য চাকরির কোটার ব্যবস্থা করা হোক। বীরাঙ্গনা প্রজেক্ট করা হোক যেখান থেকে তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। মৃত্যুর পর তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা সম্মান দিয়ে সম্মানিত করা হোক। তিনি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে এসে মৃত্যুর অন্তত আগের কয়টা দিন বীরাঙ্গনাদের সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সহায়তা করার আহ্বান জানান।
            সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, বঙ্গবন্ধুই প্রথম তাদের স্বীকৃতি দেন। তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করেন। তার মৃত্যুর পর তাদের আশ্রয় ভেঙে দেয়া হয়। আমরা যদি এখন বঙ্গবন্ধু আদর্শ যদি প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে বীরাঙ্গনাদের সম্মান করার বোধ জাগ্রত করতে হবে।
            অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ থেকে আসা বীরাঙ্গনা রাহেলা বেগম, রাজু বালা, হাজেরা বেগম ও বীরাঙ্গনার সন্তান ও যুদ্ধশিশু সুধীর বক্তব্য রাখেন।
            অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক আবেদ খান, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলা টিভির কর্ণধার সৈয়দ সামাদুল হক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ড. এম হাসান, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা, রাইজিং পথ অব ওয়ার হিরোইনস পরিচালক শাহমিকা আগুন, সাংবাদিক মাসুদ পারভেজ, আবু তোরাব মানিক, শামসুন নাহার করিম প্রমুখ।
Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author