Main Menu

ফল বাগান সৃজনে পাবনার চাষীদের ব্যাপক সাড়া

এটিএম ফজলুল করিম ::: পাবনা জেলায় কৃষকের মাঝে লিচু, কুল, পেয়ারা ও আম বাগান স্থাপনে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফসল আবাদের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকেরা ফল বাগানের দিকে ঝুকেছে বেশী। তারা ফসলের সাথে ফলের তুলনামূলক লাভ- ক্ষতির হিসাব কষে দেখেছে একই জমি হতে ফসলের তুলনায় ফল আবাদে লাভ বেশী এবং ফলের বাজার মূল্য ও চাহিদা বেশী থাকায় কৃষকেরা ফল বাগান তৈরিতে বেশী উৎসাহিত হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে তারা মাঠ র্পযায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে উদ্ভাবিত ভাল জাতের ফলের চারা সংগ্রহ করছে এবং সেই সাথে রোপিত চারার মাঠে সাথী ফসল হিসেবে পেঁয়াজ, রশুন সহ বিভিন্ন প্রকার শাক সবজী রোপন করেও ফসলের সম পরিমান অর্থ আয় করে লাভবান হচ্ছে। চাষীদের কৌশলী বুদ্ধির ফলে পাবনা জেলা এখন ঢাকা, চিটাগাং ও নারায়নগঞ্জ জেলায় ফল ও সবজী সরবরাহের ভান্ডার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার ভাড়ইমারী , সিলিমপুর, বক্তারপুর, মীর কামারী, আওতাপাড়া, বাঁেশর বাদা সহ দাশুরিয়া মূলাডুলি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মাঠের পর মাঠ ফল বাগান আর সবজী বাগান। চাষীরা তাদের উৎপাদিত ফল পেয়ারা, পেঁপে এবং সবজীর মধ্যে সীম, কপি, মূলা, গাজর, ধুনিয়ারপাতা, ইত্যাদি লাইন করা ট্রাকে ভর্তি করছে যেগুলো দেশের বড় বড় জেলার বাজারের চাহিদা পূরণ করছে। সবজী এবং ফল ভান্ডার হিসেবে খ্যাত ঈশ্বরদী উপজেলার ভাড়ইমারী গ্রামের চাষী গাজর জাহিদ জানান তার এলাকা হতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০টি বড় ট্রাকে করে প্রায় ১৫০ হতে ১৮০ টনের মতো সবজী ঢাকা, চিটাগাংসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। মূলাডুলির সীম চাষী আমিনুর রহমান জানান, মুলাডুলি বাজার হতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হতে ৫০টি ট্রাকে করে সীম ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রির উদেশ্যে পাঠানো হচ্ছে।
পাবনার চাষীরা ফল এবং সবজী চাষের মাধ্যমে স্বপ্নের মতো ভাগ্য বদলাতে সমর্থ হয়েছে। অবশ্য এর পিছনে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সহ অন্যান্য কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভাগের ভূমিকা যথেষ্ঠ গুরুত্ববহন করছে। এক্ষেত্রে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ বিভূতি ভূষন সরকারের ঘন ঘন মাঠ পরিদর্শন, কৃষকদের সাথে দলীয় বৈঠক, উঠান বৈঠক সহ কৃষি উন্নয়নে কৃষকদের মাঝে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে পাবনার কৃষিকে সমৃদ্ধ করার ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার উদ্যোগে জেলা উপজেলার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কৃষকদের মধ্যে ফল বাগান স্থাপনের আগ্রহ সৃষ্টি করা সহ অপ্রচলিত মসলা কালিজিরার আবাদ বৃদ্ধি, চরাঞ্চলে বাদাম, কালাই, মিষ্টি কুমড়া ও ভূট্টার আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরুৎসাহী কৃষকদের মধ্যে ফল বাগান স্থাপনের উৎসাহ যুঁগিয়ে তাদের লাভের পথ দেখিয়েছেন পাবনার এই উপ পরিচালক। এছাড়া তিনি শরিষা ও কালিজিরার মাঠে মৌ-চাষীদের উৎসাহ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে মৌ-বক্স স্থাপন করে ব্যাপক হারে পাবনায় মধু উৎপাদনে সমর্থ হয়েছেন তিনি। গত বৎসরে উৎপাদিত মধুর পরিমাণ ছিল ৭২ মেঃটন এবং প্রতি কেজি ২’শত টাকা হিসেবে মৌচাষীরা মধুর মূল্য পায় ১ কোটি ৪৪ লক্ষ টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে জেলার সদর উপজেলা, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, চাটমোহর সহ অন্যান্য উপজেলায় ৪২৪০ হেক্টরে লিচু, কূল পেয়ারা, আম, কাঠাল বাগান স্থাপন করা হয়েছে ১৪০৬৪ টি, ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে ৪৭৫০ হেক্টরে ১৫৫৩৬ টি, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৪৮৭০ হেক্টরে ১৬০২৩টি এবং ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৬০৭৭ হেক্টরে ১৯১০টি । এছাড়া কৃষক পর্যায়ে উদ্বুদ্ধকরনের মাধ্যমে চাষীপর্যায়ে ফলদ, বনজ ওষধি বৃক্ষের চারা রোপিত হয়েছে ২০১৩-১৪ সনে ৪০০২৬৭টি, ২০১৪-১৫ সনে ৪,৬৪,৬৪৩টি, ২০১৫-১৬ সনে ৩৯০৭৯৩টি এবং ২০১৬-১৭ সনে ৪৩৪০টি।
এছাড়া জেলার রাজস্ব খাতের অর্থে চাটমোহর ভাঙ্গুঁড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় “ফসল বৃদ্ধিকল্পে আধুনিক কলা কৌশল হস্তান্তর ” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে চাষীদের মধ্যে আম, লিচু, মাল্টা, নারিকেল, পেয়ারা ও লেবুর চারা বিতরন করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থ বছর হতে ২০১৬-১৭ অর্থ বছর পর্যন্ত মাল্টা ২৮২০ টি, লিচু ৮০৪৬টি, আম ১৩৬৫০টি, নারিকেল ৩১৮৮টি, পেয়ারা ২৭৬৫টি , লেবু ৮৯০টি এবং মিশ্র ফল বাগান স্থাপনের জন্য বিনামূল্যে আমের চারা ৩০০০টি এবং লিচুর চারা ৩০০০টি বিতরণ করা হয়। ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের ফলমেলা/২০১৬ তে পাবনায় ব্যাপক হারে চাষী পর্যায়ে ফল বাগান স্থাপন, পরিচর্যা এবং চাষীদের উদ্বুদ্ধকরনের অগ্রনায়ক হিসেবে জেলার উপ পরিচালক কৃষিবিদ বিভূতি ভূষন সরকারের নাম কৃষি মন্ত্রনালয়ের মূল্যায়নে উঠে আসে এবং পাবনাস্থ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ পাবনা জেলাকে ১ম স্থানে ভূষিত করা হয়।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কৃষিবিদ বিভূতি ভূষন সরকার নিরলস পরিশ্রম এবং অহনির্শ ব্যস্ত সময় পার করেছেন জেলার সকল উপজেলার কর্মকর্তাগনের সাথে কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়ন ভাবনায়। তার উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টার ফলস্বরুপ বেকার যুবকদের বেকারত্ব মোচনের প্রচেষ্টা খানিকটা হলেও সফল হয়েছে আর সেই সাথে তাদের উৎপাদনের দিগন্তও প্রসারিত হয়েছে বহুদূর।