আন্দোলনে শতবছর সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সমবায়

মহানন্দ অধিকারী মিন্টু, খুলনা প্রতিনিধি ॥
সমবায়ের তীর্থস্থান হিসাবে খ্যাত খুলনার পাইকগাছা। এখানে রয়েছে সমবায় আন্দোলনে শতবছরের ইতিহাস। বর্তমানে উপজেলায় ১টি সমবায় ব্যাংকসহ ৩৭৩ টি সমবায় সমিতি। যার সমবায়ীর সংখ্যা ২০ হাজার ৬৮৫ জন। সংগঠনের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে এ অঞ্চলের অর্ধেক জনগোষ্ঠি।
নারীর ক্ষমতায়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, স্বনির্ভরতা অর্জন ও আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সমবায় সংগঠনগুলো। সমবায়ীরা মনে করেন-সমবায় হতে পারে দারিদ্র বিমোচনের মূল চাবিকাঠি। ৫ নভেম্বর সারাদেশে পালিত হলো ৪৫তম জাতীয় সমবায় দিবস। ১৯০৪ সালে কো-অপারেটিভ ব্যাংকের মাধ্যমে সুন্দরবন সংলগ্ন পাইকগাছায় সর্বপ্রথম শুরু হয় সমবায় কার্যক্রম। এরপর ১৯০৯ সালে জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পিসি রায়) তার জন্মস্থান উপজেলার রাড়–লীতে প্রতিষ্ঠা করেন রাড়–লী কো-অপারেটিভ ব্যাংক। সেই থেকে শুরু হয় সমবায় আন্দোলনে। বর্তমানে উপজেলায় এমন কোনো পাড়া মহল্লা নেই যেখানে সমবায় সংগঠন নেই। সমবায়ীদের শেয়ার ও সঞ্চয় আমানতের পরিমাণ ১০ কোটির অধিক। মোট জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠি সমবায়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যার মধ্যে ৪০ ভাগই হচ্ছে নারী। সমবায়ের মাধ্যমে সঞ্চয় গচ্ছিত করে আর্তনির্ভরশীল হয়েছে তারা। সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসাসহ অনেকে কিনছে ভ্যান, নসিমন, করিমন, মোটরসাইকেল, মাহেন্দ্রসহ বিভিন্ন যানবাহন। বেকার যুবকের সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। কৃষি, মৎস্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ। সমবায়ের নানামুখী এসব পদক্ষেপের কারনে প্রতিনিয়ত কমছে বেকারত্বের সংখ্যা। হ্রাস পেয়েছে সামাজিক অপরাধের প্রবনতা।
সমবায়ে ইতিবাচক ভূমিকায় প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে ধনী, গরীব, মধ্যবিত্তসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুবাদে ইতোপূর্বে এ উপজেলা থেকে দু’টি প্রতিষ্ঠান ও দু’ব্যক্তি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। সমবায়ী হিসাবে ২০০০ সালে ষোলআনা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি প্রয়াত মেয়র আলহাজ্ব মাহাবুবুর রহমান এবং ২০০৩ সালে ফসিয়ার রহমান কৃষি ও জনকল্যাণ সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব ফসিয়ার রহমান এবং প্রতিষ্ঠান হিসাবে ১৯৯৫ সালে ষোলআনা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ও ২০১১ সালে ফসিয়ার রহমান কৃষি ও জনকল্যান সমবায় সমিতি এ পুরস্কার অর্জন করেন। এ দু’টি সংগঠনের পাশাপাশি খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমাবায় সমিতি, জিরবুনিয়া সমবায় সমিতি, জোনাকি গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি ও সলুয়া পল্লী দুগ্ধ সমবায় সমিতিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন সুনাম অর্জন করেছে। ২০১৪ সালে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জাতীয় সমবায় মেলায় স্থান করে নেয় কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সমবায় বিভাগের প্রাক্তন সচিব মিহির কান্তি মজুমদারের প্রচেষ্ঠায় ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সলুয়া পল্লী দুগ্ধ সমবায় সমিতি। সংগঠনের ১২৫ দলিত সম্প্রদায়কে বিনাসুদে প্রদান করা হয় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণ। ঋণের টাকায় সংগঠনের সদস্যরা শুরু করেন গাভী পালন। বর্তমানে প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার লিটার দুধ। উৎপাদিত দুধ সরবরাহ করা হয় মিল্কভিটাসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে। এভাবেই এলাকার প্রতিটি পাড়া মহল্লায় গড়ে ওঠা সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সামাজিক নিরাপত্তায়। উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মুকুন্দ বিশ্বাস জানান, এলাকার সমবায় সমিতিগুলো এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, এখানে তেমন কোনো ক্রেডিট নির্ভর এনজিও’র কার্যক্রম নাই। সমবায়ের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যাতে সমবায়ের কাছে দারিদ্রতা পরাজিত হবে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাহিদ-উল-মোস্তাক মন্তব্য করেন।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author