চলনবিলে কৃষি কাজে নারী-পুরুষ মজুরি বৈষম্য

আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
ঘর-বাহির সামাল দিয়েই একজন নারীকে এগিয়ে চলতে হয় প্রতিনিয়ত। তারপরও নারীকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় পদে পদে। ঘরের কাজে যেমন স্বীকৃতি নেই, তেমনি বাইরের কাজেও দেওয়া হচ্ছে কম মজুরি। মুখে সমাজে সমান অধিকার বললেও সমান অধিকার পাচ্ছেন না নারী। দেশে নারী শ্রমিকদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শুধু গার্মেন্টসে নারী শ্রমিকদের দেখে এ মন্তব্য নয়। নারী শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত। তাছাড়া আদিবাসী সব নারীই শ্রমিক। এই চরিত্র আবহমানকালের।
তেমনি কৃষিভান্ডারখ্যাত চলনবিল অঞ্চলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া এলাকায় দিন দিন কৃষি শ্রমিক হিসেবে নারী শ্রমিকরা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুধু কৃষি শ্রমিক হিসেবে নয়, গৃহস্থালী, রাস্তাতে মাটিকাটা ও গৃহ নির্মাণ কাজে যোগালদার সহ বিভিন্ন প্রকার কাজ কর্মে নারীদের অংশগ্রহণমূলক কাজের পরিধি বর্তমানে চোখে পড়ার মত তারা তাদের শ্রম দিয়ে দেশ তথা জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তারা তাদের শ্রম যথাযথভাবে প্রয়োগ করেও ন্যায্য মজুরী হতে বঞ্চিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সব ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশী কাজ করে পক্ষান্তরে মজুরী বৈষম্যের শিকারের সম্মূখীন হয়তারা। এতে তাদের কোন অভিযোগ নেই। তারা শুধু নিয়মিতভাবে কাজ চায় বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের মাঝে রয়েছে শুধু বুকভরা হাহাকার আর হতাশা। সব মিলিয়ে জীবনযুদ্ধে নারীদের নিবেদিত এক বলিষ্ট যোদ্ধার আমরণ-আপোসহীন সংগ্রামের চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে পুরা চলনবিল অঞ্চলে। এক সময়ে আবহমান বাংলার নারীদের নরম হাতে রঙ-বেঙের চুড়ি শোভা পেত, বর্তমান সময়ে সে হাতে চুড়ির বদলে তাদের নিত্যসঙ্গী হয়েছে কৃষিকাজের সরঞ্জাম কাঁচি, কোদাল, হাতুড়ি কিংবা নানা রকমের কৃষি সরঞ্জাম। কমলমতি নারীদের হাত দিয়ে তারা কৃষি ক্ষেতে অধিক ফসল ফলানোর জন্য তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম প্রয়োগ করছে যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংসারের যাবতীয় কাজ-কর্ম সেরে তারা পৌঁছে যায় তাদের আরেক কর্মস্থলে, তাদের ঠিকমত খাওয়ার ও বিশ্রামের সময় নেই। জীবন-জীবিকার তাগিদে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তারা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নারী শ্রমিকেরা অধিকাংশই কৃষি কাজের বিভিন্ন অঙ্গনে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ধানের চাতাল মিলের ধান শুকানোর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয়, রাস্তায় মাটিকাটার কাজে নিয়োজিত কাটাগাড়ী গ্রামে শেফালী বেগম, দেশীগ্রামের হাওয়া বেগম এর সাথে তারা বলেন, এত পরিশ্রমের পরেও নারীরা কর্মক্ষেত্রে মজুরী বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। একজন পুরুষ শ্রমিক প্রতিদিন-৩০০/- টাকা ৪০০/-টাকা হিসেবে পারিশ্রমিক পান, সেখানে নারী শ্রমিকগণ প্রতিদিন-১৫০/- টাকা ২০০/-টাকা পারিশ্রমিক পান। এ টাকা দিয়েই তারা তাদের সংসার চালান। তারা শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীরা বেঁচে আছে সমাজে অবহেলিত হয়ে, দারিদ্রতার কশাঘাতে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এদের সকল স্বপ্ন-সাধ। একই কাজ করে নারীরা পুরুষদের চেয়ে অর্ধেক মজুরী পাচ্ছে। এ নামমাত্র মজুরী, তাও কাজ না পাওয়ার ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস তাদের মধ্যে নেই। অনুসন্ধানে আরোও জানা যায়, এ সকল নারীদের মধ্যে বেশীর ভাগ নারী বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত, আবার কেউ কেউ আছে অধিক সন্তানের জননী অভাবের তাড়নায় তারা এ পেশাকে জীবনে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে বেঁচে নিয়েছে। সমাজের এ সকল অবহেলিত নারীদের নিয়ে অনেক দেশী-বিদেশী সংস্থা নারীদের অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠা করার কাজ করছে, এ নিয়ে সমাজের ভদ্রলোকদের এ ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা নেই। নারীরা শ্রমিকরা জানান নিতান্তই ক্ষুদার জ্বালা মেটানোর জন্যই তারা এ পেশাকে বেঁচে নিয়েছে । কাজ পাবে না এ ভয়ে তারা মালিকদের মজুরী বেশী দেওয়ার কথা বলতে সাহস পায় না। এ অঞ্চলের বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নারী শ্রমিকের বসবাস পাকা রাস্তা পার্শ্বে অথবা অন্যের বাড়ীতে ঘর তুলে বসবাস করে। তাদের দেখার মত একমাত্র আল¬াহ পাকছাড়া আর কেউ নেই এ দুনিয়াতে সমাজের সর্বস্তরের বিত্তশীল মানুষেরা যদি নারীদের পাশে এসে দাঁড়ায় তাহলে তাদের প্রতিটি পরিবারে অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বচ্ছলতা আসবে বলে মনে করেন অনেকেই।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author