গৌরী প্রসন্ন মজুমদার তার গানেই বেঁচে থাকবেন

আলোকচিত্রী হিসেবে আমি কতটা সফল, তার হিসেব না করলেও একথা সত্য দেশ-বিদেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী আমার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। আমি তাদের ফিল্মে বন্দি করেছি। আর তা করতে গিয়ে অনেকের সাথেই আমার ব্যক্তিগত এমন মধুর সম্পর্ক হয়েছে, যা বলার  অপেক্ষ রাখে না। ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার ’ আমার স্বাপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে সাত সমুদ্দুর তের নদীর পাবে’-এই বিখ্যাত কালজয়ী গানগুলো যার, তিনি গৌরী প্রসন্ন মজুমদার । তারঁ অনেক বিখ্যাত গান রয়েছে। প্রেম-ভালোবাসা আর বিরহরে কথা তাঁর গানে কতটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে তা সকলেই জানেন। তিনি খ্যাতিমান কবি আর গীতিকার। কিন্তু আমার কাছে তিনি একজন প্রকৃত বন্ধু, একজন বড় ভাই। তাঁকে নিয়ে আমার বিশাল স্মৃতির এ্যালবাম না থাকলেও তাঁর সান্নিধ্য আমাকে অভিভূত করেছে। হ্যাঁ, বলতে  পারেন আমি তার ভক্ত হয়ে গেছি। তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা ১৯৭২ সালে কলকাতায়। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের নতুন পতাকা কিছুদিন আগে অভিষিক্ত হয়েছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত  সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন ব্যস্ত নতুন করে সাজতে। সাংস্কৃতিক  অঙ্গনও ব্যস্ত। নতুন অভিজ্ঞতা আর সাংস্কৃতিক বিনিময় করতে প্রথম যে প্রতিনিধি দল ভারতে গিয়েছিল, তাতে গীতিকার ফজল-এ-খোদা, কন্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার এর মতো আমিও একজন সদস্য ছিলাম। কলকাতা যাবার দু’তিন দিন পর লক্ষ্য করলাম আমাদের দেখাশোনার জন্যে লম্বাকৃতির পাতলা ছিপছিপে এক ভদ্রলোক  আছেন। তাঁর ইশারায় আমাদের দেখভাল চলছে। সবাই তাকে গৌরীদা বলে ডাকছে। আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল যে ক’দিন কলকাতায় ছিল, তারমধ্যে  প্রায়ই আমরা বালিগঞ্জের একটি বাসায় গান-বাজনা করতে বসতাম। সেখানে বসতেন নীতা সেন, আব্দুল জব্বার, ফজল-এ-খোদা, শহিদুল ইসলাম আর চলচ্চিত্রের নায়ক অসিত বরণসহ অনেক নামী-দামী গুণীজন। ওখানে শুধু গান গাওয়াই হতো না, নতুন গানে সুরও দেয়া হতো। গানে নতুন সুর দেয়া শেষে  গৌরীদা বলতেন-কেমন হলো, কেমন লাগছে? গৌরীদা’র  লেখা ‘একটি মুজিবরের কন্ঠে ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রনি’- জনপ্রিয় এ গানটি অংশুমান রায় গেয়েছেন। আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি  একদিন বললে প্রসঙ্গে তিনি একদিন  বললেন, গানটি এতো হিট করবে জানলে  হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা সলিল চৌধুরীকে দিয়ে গাওয়াতাম। এরই মাঝে একদিন আমাকে দেখিয়ে ফজল-এ-খোদাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলেটি কে? উত্তরে ফজল-এ-খোদা বললেন, কেন জানেন না,  ওতো আমাদের বেতারের ফটোগ্রাফার। সেই যে পরিচয় হলো, তারপর থেকে তিনি আর আমাকে ছাড়েন না। আমাকে নিয়ে তিনি প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। পরিচয় করিয়ে দিতেন বিভিন্ন লোকজনের সাথে। সদর রাস্তার চেয়ে অলিগলি দিয়ে চলতে তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। পথে মহিলারা সবাই যেন তার মাসি-পিসি। খুব সুন্দর করে গৌরীদা তাদের ডাকতেন। আমাকে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলতেন, ও না খুব ভালো ছবি তোলে-বাংলাদেশের ছেলে। আমরা কলকাতায় থাকাকালীন গৌরীদা আমাদের আব্দুল জব্বারকে দিয়ে একটি গান রেকর্ড করিয়েছিলেন। আমাদের উপস্থিতিতেই তিনি সলিল চৌধুরী ও বিপুলকে দিয়ে গান রেকর্ড করান। রেকর্ডিং-এর  ছবিগুলো তিনি আমাকে দিয়ে তুলিয়েছিলেন। আমি আমাকে দিয়ে তুলিয়েছিলেন। আমি ওই ছবিগুলো তুলে, রেকর্ডিং স্টুডিওতে দিয়েছিলাম। গৌরীদা কেন যেন আমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। প্রতিদিন সকালে এসেই সবার অলক্ষ্যে আমার পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দিতেন। বলতেন-কলকাতা শহর, এখানে অনেক খরচ। কিন্তু ওই টাকা খরচ করার তেমন সুযোগ আমাকে তিনি দিতেন না। সারাক্ষণ তিনি আমাকে সাথে রাখতেন। যখন যা খরচ লাগতো তিনিই করতেন । সন্ধ্যা হলেই বালিগঞ্জের সেই বাসায় ফিরে গাওয়া, গান গাওয়া, নতুন গানের সুর দেয়ার মধ্যদিয়ে হাসি-তামাশা করা এভাবেই কেমন করে ১৫ দিন কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠলো। বাংলাদেশে ফিরতে হবে। বালিগঞ্জ থেকে গৌরীদা আমাকে চুপি চুপি ডেকে নিয়ে বাজারে  আসলেন। বললেন, তোর  ছেলে-মেয়ে ক’টি? এক ছেলে দু’ মেয়ে। ওদের বয়স কত, গায়ের রং কেমন ইত্যাদিও জানলেন। তারপর আমার ছেলে-মেয়ের জন্যে দু’  সেট করে কাপড় কিনে দিলেন। সাথে আমার স্ত্রীর জন্যেও কাপড় কিনলেন। তারপর গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মা বেঁেচ আছেন? হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেয়ার পর তিনি চওড়া পাড়ের ধুতি, ভাল তেল ও বাবা জর্দা কিনে মাকে দেবার অনুরোধ করলেন। পরদিন গাড়িতে উঠার আগে হঠাৎ করে অনেকগুলো টাকা গুঁেজ দিলেন। আমি অবাক, ভদ্রলোক এভাবে আমাকে কেন ঋণী করছেন? ঢাকায় আসার পর যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। মাঝে মধ্যে গৌরীদার কথা মনে হয়। কিন্তু চিঠিপত্র লেখা হয় না। কিছুদিন পর হঠাৎ দেখি কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় গৌরীদাকে নিয়ে আমার মহাখালীস্থ ওয়ারলেস গেটের স্টুডিও প্রতিচ্ছবিতে এসে হাজির। আমাকে গৌরীদা বুকে জড়িয়ে ধরলেন- বললেন, চল তোর বাসায় যাবে। বাসায় আসতে আসতে গৌরীদা বললেন, ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সাথে এসেছি। আমাদের থাকার জায়গা হোটেল পূর্বানীতে। তোকে খুঁজছি আসা আব্দি। রথীনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের রেডিওর ক্যামেরাম্যানকে চেনো? সে জানালো- খুব ভালো চিনি। তিনিই তো আমার বিয়ের সব ছবি তুলেছেন। তারপর এই তো চলে এলাম। সাদামাটা বাসা। ঘরে ঢুকলেন তিনি। তারপর বললেন, হোটেলে পুলিশী পাহারা  একদম  ভালো লাগে না। তুই তো জানিস আমি কলকাতায় সবার বাড়িতে বাড়িতে যেতাম, কথা বলতাম। আর এখানে  এমন বন্দি জীবন ভালো লাগে না। আমার মাকে দেখে গৌরীদা বললেন, মা আমার কাছে বসেন। আপনার ছেলে খুব ভালো। বিশেষ কোন আয়োজন নয়, সাদামাটা রান্না খেয়েই মনে হলো তিনি তৃপ্ত। অবশ্য রাতের খাবারের পর দই- মিষ্টিরও আয়োজন ছিল। তারপর বসলাম, হালকা-পাতলা আড্ডায়। কথা প্রসঙ্গে আমি বললাম, জানেন দাদা, এবার ঈদে আমার কোন খরচ হয়নি।  অবাক হয়ে গৌরীদা প্রশ্ন করলেন, কেন তোর কাছে বুঝি টাকা ছিল না? এ্যাই- আমার কাছে একটা পোস্টকার্ড পাঠালেই তো হতো। ও বুঝেছি, আমাকে  তোর  আপন মনে হয় না। তারপর মাকে বললেন, মা আপনার ছেলে আমাকে পর ভাবে। মা বললেন, না বাবা। গৌরীদা বললেন, মা আমার বাড়ি এ দেশেই। এদেশের মানুষকে আমার খুব ভালো লাগে। আমি বললাম, দাদা আপনি অযথাই রাগ করছেন,  আমাকে ভুল বুঝছেন। আসল ঘটনা হচ্ছে, আপনি কলকাতায় আমার পরিবারের জন্য যে দ’  সেট করে জামা-কাপড় কিনে দিয়েছিলেন, তার একসেট সবাই ব্যবহার করেছে আর একসেট তুলে রাখা হয়েছিল। তুলে রাখা সেট দিয়েই এবার আমরা ঈদ করেছি। আমার কথা শোনার পর গৌরীদা আবেগে  কেঁদে ফেললেন। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, আমার দেয়া কাপড় পরে তোরা পুণ্যের কাজ করেছিস! লুথু! তুই আমাকে বড় ভাগ্যবান করে দিলি। তারপর মাকে আর আমার স্ত্রীকে আদাব জানিয়ে চলে এলেন আমার স্টুডিওতে। সেখানে গৌরীদা, আমি ও রথীন বেশ কিছু ছবি তুলি।   কথা বলি। তারপর আবার বি-দা-য়। গৌরীদা কলকাতা ফিরে গেলেন।  ওখান থেকে কেউ এলে আমি তার কথা জানতে চাইতাম। আমাদের কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী একবার কলকাতায় যাবার আগে আমাকে বললেন, লুথু-গৌরীদাকে একটা চিঠি লিখে দাও তো। আমি কলকাতায় গিয়ে তার সাথে দেখা করবো। আমি  উৎসাহ নিয়ে চিঠি লিখলাম। পরে মাহমুদুন্নবী ফিরে এসে জানালেন, তোমার চিঠি পেয়ে গৌরীদা খুব খুশি হয়েছেন। আমাকে খুব আদর করেছেন, সময় করে এলে আপনার মিষ্টি গলার গান রেকর্ড  করবো। মাহমুদুন্নবীর গান গৌরীদা রেকর্ড করতে পেরেছিলেন কিনা জানি না। তবে কিছুদিন পর বাজ পড়ার মতোই আমার কাছে খবর এলো, গৌরীদা নেই। তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। আমি তারঁ আত্মার শান্তি কামনা করি।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author