পাবনার ঘি

‘পদ্মার ইলিশ আর পাবনার ঘি/ জামাইয়ের পাতে দিলে আর লাগে কি?’ ঘি নিয়ে এ প্রবাদ শুধু পাবনাই নয়, দেশের অনেক এলাকাতেই প্রচলিত। দেশের বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, বিদেশেও পাবনার ঘিয়ের কদর রয়েছে। এ জন্য ঘি নিয়ে পাবনাবাসীর গর্বের শেষ নেই।
ঘি নিয়ে পাবনাবাসীর গর্ব করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, আটঘরিয়া ও পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় উৎপাদিত গরুর দুধের কারণে। এ উপজেলাগুলো এখন দেশের সেরা দুগ্ধ উৎপাদনকারী এলাকা। শুধু তা-ই নয়, এ এলাকার দুধ স্বাদে ও মানেও দেশসেরা বলে এলাকাবাসী মনে করেন। মিল্ক ভিটা, প্রাণ দুধ, আড়ং দুধ, আকিজ ডেইরি অ্যান্ড ফুডসহ দেশের প্রধান দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো এ এলাকা থেকে দুধ সংগ্রহ করে দেশে দুধের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে থাকে। ঘি উৎপাদনে পাবনার প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠার পেছনে দুধের এমন সহজলভ্যতাই মূল কারণ বলে এলাকার ঘি উৎপাদনকারীরা মনে করেন।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঘি তৈরির মূল উপাদান হলো ননি। খাঁটি ননি সঠিক নিয়মে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় উৎকৃষ্ট ঘি। ঘি তৈরির কারিগরেরা জানান, পাবনার দুধ উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে রয়েছে প্রচুর ছানা তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় ছানা তৈরির পাশাপাশি ননিও তৈরি হয়। আবার অনেক খামারি নিজেদের খামারে উৎপাদিত দুধ কোনো কারণে বিক্রি করতে না পারলে তা থেকে ননি তৈরি করে থাকেন। এ ছাড়া এলাকার দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোও দুধের উদ্বৃত্ত ননি তুলে রাখে। ফলে পাবনার দুধ উৎপাদনকারী এলাকায় হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় পর্যাপ্ত ননি। ঘি তৈরির কারিগরেরা সেই ননি সংগ্রহ করে জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন ঘি। সাধারণত দুই কেজি ননি জ্বাল দিয়ে এক কেজি ঘি পাওয়া যায়।
বেড়া পৌর এলাকার পরিমল ঘোষের ছানা তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে দুধ থেকে ননি বের করা হচ্ছে। তিনি জানান, তাঁর কারখানায় প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ কেজি ননি তৈরি হয়। এই ননি ঘি তৈরির কারখানায় ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার অর্ধশতাধিক ছানা তৈরির কারখানায় প্রতিদিন ২৫ মণেরও বেশি ননি উৎপন্ন হয়। উৎপাদিত ননির বেশির ভাগই চলে যায় ঘি তৈরির কারখানায়।
পাবনায় ঘি তৈরিতে এগিয়ে রয়েছে বেড়া, সাঁথিয়া ও ফরিদপুর উপজেলা। এর মধ্যে বেড়ার ডাকবাংলা, পেঁচাকোলা, হাটুরিয়া; সাঁথিয়ার সোনাতলা, সেলন্দা, ডেমড়া; ফরিদপুরের গোপালনগর এলাকাগুলো ঘি তৈরির জন্য বেশ বিখ্যাত। এসব এলাকার বাড়িতে ঘি তৈরির পাশাপাশি বেশ কিছু ছোট-বড় কারখানাও গড়ে উঠেছে।
বেড়া পৌর এলাকার কুটিশ্বর ঘোষ নিজ বাড়িতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি ঘি তৈরি করেন। তিনি বলেন, ‘ক্রিম (ননি) জ্বাল দিয়ে ঘি তৈরির কাজটি সহজ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ জন্য দক্ষতা প্রয়োজন। দক্ষ কারিগরেরাই ভালো ঘি তৈরি করতে পারেন। আমাদের তৈরি করা ঘিয়ের সিংহভাগই বেড়ার বাইরে চলে যায়।’
জেলার ঘি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় কারখানাটি অবস্থিত ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগরে। কারখানার অংশীদার ও প্রধান কারিগর গোপাল ঘোষ জানান, প্রতিদিন এ কারখানায় চার থেকে পাঁচ মণ ঘি তৈরি হয়। উৎপাদিত ঘিয়ের প্রায় পুরোটাই ঢাকায় চলে যায় এবং সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বোতলজাত হয়ে বিক্রি হয়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নিউইয়র্ক, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তাঁদের ঘি রপ্তানি হয় বলে তিনি জানান।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author