বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইকবাল স্বরণে

॥ আবদুল জব্বার ॥

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইকবাল আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি পাবনার প্রতীথষশা, সুনামধন্য ও সর্বমহলে সুখ্যাতি অর্জনকারী মরহুম ডাঃ এম ইসহাক সাহেবের জৈষ্ঠ্য পুত্র। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের পহেলা জানুয়ারি। ২০০৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল (ইনড়বা লিল্লাহি ওয়া ইনড়বা ইলাইহি রাজিউন) করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। তাঁর মৃত্যুতে সংসদ সদস্য হিসেবে মহান সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপিত হয় এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল স্কুল জীবনেই বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করেন এবং স্কুল জীবনেই তা প্রকাশ পায়। তাঁর নেতৃত্বে পাবনা জেলা স্কুল হকিতে তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান স্কুল চ্যাম্পিয়ন, স্কাউটিং, ফুটবলে অনেক সুনাম বয়ে এনেছিল। ১৯৬৪ সনে পাবনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে আই,এস,সি এবং ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি, ফার্ম ডিগ্রী অর্জন করেন। কলেজে পড়া অবস্থায় তাঁর নেতৃত্বে নেত্রকোনা কলেজ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় খেলাধুলায় বিশেষ নৈপূণ্য দেখানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ব্লু ব্লেজার প্রাপ্ত হন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল কলেজ জীবনেই ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। ১৯৬৬ সালে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। ১৯৬৯ সালে গণ আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনকে সুসংগঠিত করার কাজে সμিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে পাবনায় প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতাকার নক্শা প্রণয়ন ও বিতরণ করেন। তিনি সে সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রসমাজ ও জনতাকে সুসংগঠিত করেন এবং ২৬শে মার্চ সμিয় যুদ্ধে যোগদান ও ২৮ মার্চে সর্বপ্রথম পাবনাকে শত্র“মুক্ত করেন। তাঁরই প্রেরণায় ১৯৭১ সনে পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ডাঃ ইসহাক সাহেবের গোপালপুরস্থ বাসভবন হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু এবং যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র (পাকিস্তানী বাহিনী পুনরায় পাবনা দখলের পূর্ব পর্যন্ত)। জনাব ইকবাল ১৯৭১ এর মে মাসে উচ্চ সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের দেরাদুন মিলিটারী একাডেমী থেকে দক্ষতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষ করেন। তাঁর মেধা ও বিচক্ষণতার জন্য তদানিন্তন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতার নির্দেশে বৃহত্তর পাবনা জেলার মুজিব বাহিনী প্রধান এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর সুজানগর থানা স্বাধীন হয়। প্রশাসনের দিক দিয়েও তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পর পাবনায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিচক্ষনতা ও দক্ষতার সাথে প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তৎকালিন পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ যার বর্তমান নাম পাবনা ক্যাডেট কলেজ এ তিনি সে সময় ম্যালেশিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প সমাপনি অনুষ্ঠানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর নিজ স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র প্রদান করেন বৃহত্তর পাবনা জেলা মুজিববাহিনী প্রধান হিসেবে। এখানে আরও উল্লেখ করা যায় তাঁর নেতৃত্বগুণ ও বিচক্ষণতার জন্য বর্তমান মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ তাঁকে যুদ্ধকালীন সময়ে দুই মাসের জন্য বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব দেন। জনাব ইকবাল ১৯৭২-৮৭ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা শাখা জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এর সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ২০০১ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন এবং জাতীয় পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ইকবাল ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাবনা-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনাব মোঃ ইকবাল পাবনার জালালপুর মওলানা কছিম উদ্দীন হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, শ্রীকোল চোমরপুর হাই স্কুল কমিটির সভাপতি, পাবনা ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য, ঢাকাস্থ পাবনা সমিতির আজীবন সদস্য ও ঢাকাস্থ পাবনা পৌর-কমিটির মূল সংগঠক, জাতীয় যক্ষা নিরোধ কমিটির সদস্য, রেডক্রিসেন্ট এর আজীবন সদস্য ছিলেন। এছাড়াও ঢাকা মহামেডান ক্লাবের আজীবন সদস্য, ঢাকা ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সহসভাপতি, নবীন মেলা শিশু ও কিশোর জাতীয় সংগ্রামের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি ক্ষেতমজুর সমিতির ও কৃষি সমবায় সমিতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন এবং রাস্তাঘাট মেরামতসহ বহু জনহিতকর কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই পরিবারের অবদান ভুলবার নয়। তাঁর দুই সহোদর (মোঃ ইসমত ও মোঃ ইলিয়াস) সহ এই পরিবারের ৯ জন মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং এক ভাই (০১) সুজানগর থানা যুদ্ধে শহীদ (শহীদ দুলাল) হন। যুদ্ধকালীন সময়ে এই পরিবারের ৩টি বাড়ী পাকবাহিনী পুড়িয়ে দেয়। বর্তমানে এই পরিবারের দাবী পাবনাবাসীর কাছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক ভাবে তুলে ধরার এবং যার যা প্রাপ্য সম্মান তাকে দেয়া হোক। মরহুম মোঃ ইকবাল ব্যক্তি জীবনে সদালাপি, বিনয়ী এবং সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন। মরহুম মোঃ ইকবালের মৃত্যুর ০৫ (পাঁচ) বৎসর পূর্বেই তাঁর স্ত্রী ইন্তেকালৃ করেন। তাদের দুই পুত্র সন্তান। বড় ছেলে মোঃ আরিফ ইকবাল (টিংকু) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.বি.এ-র ছাত্র এবং ছোট ছেলে আফিফ ইকবাল (অংকুর) এ- লেভেলে অধ্যায়নরত।
পাবনা জেলা বিজয় দিবস উদযাপন পরিষদ ২০১৬ এর উদ্যোগে ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মুক্তমঞ্চে ৩ দিনব্যাপী বিজয় উৎসব পালন করছেন। সকল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স। ১৯ জানুয়ারি বিজয় উৎসবের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আল-নকীব চৌধুরী, প্রধান আলোচক ছিলেন, পাবনা ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা লায়ন বেবী ইসলাম।
১৯ জানুয়ারি বিজয় দিবস উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গণে অসামান্য অবদান রাখার জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয়। এদিন যাঁদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয় তাঁরা হলেন,বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইকবাল (মরণোত্তর) বীর মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ উদ্দিন খান বিশিষ্ট (শিল্পোদক্তা), জনাব নিলুফার কাদেরী (বিশিষ্ট সমাজসেবক) এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ তৌহিদ খান (মরাণোত্তর)।

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author