প্রধান সূচি

‘বেতন আলোচনা সাপেক্ষ’

আলাউদ্দিন আহমেদ

দেশে শিক্ষিত বেকার তরুণের সংখ্যার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। গুগল দাদা অথবা অনলাইনের অন্য কোন সুত্র থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখার তথ্যমতে এই সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। আঠারো কোটি জনসংখ্যার দেশে লেখাপড়া জানা বেকারের সংখ্যা তিন কোটি, একেবারে কম নয় সংখ্যাটি।

স্বাভাবিকভাবে সরকারি চাকুরিজীবীদের বিভিন্ন আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা থাকায় বেকারদের ঝোঁক থাকে সরকারি চাকুরির দিকেই। কালেভদ্রে সরকারি চাকুরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। লাখো তরুণ আবেদন করেন, ভাগ্যে চাকুরি জোটে অতি নগণ্য সংখ্যকের। এরপর বাকী থাকে বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানী, ব্যাংক, শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকুরির সুযোগ। সেইদিকে চেয়ে থাকে বহু সংখ্যক চাকুরিপ্রার্থী অসহায় তরুণ যাদের ভবিষ্যত জীবনের স্বপ্ন নাড়া দেয় সবসময়। কিন্তু বাস্তবতা এমনই নির্মম যে সেইদিকেও পরিচ্ছন্ন কোন ব্যবস্থা নেই।
বেসরকারি পর্যায়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির নানান কিছু চাওয়ার পর জুড়ে দেয়া হয়, ‘বেতন আলোচনা সাপেক্ষ’। এটা কেন-? আপনার পদের বিপরীতে সব যোগ্যতা পূরণ করে একজন মেধাবি শিক্ষিত তরুণ-তরুণি আবেদন করবেন; অথচ আপনি বেতনটি উল্লেখ করবেন না, এটা কোন ধরনের নিয়ম-? এই অপকৌশলের কারন একটাই সেটা হচ্ছে অসংখ্য বেকারের এই দেশে অতি কম পারিশ্রমিকে মানুষ পাওয়া যায়। এভাবে সহজেই তাদের শ্রম শোষণ করা যায়। একজন না করলে আর একজন রেডি হয়ে আছে। সুতরাং সমস্যা তো ওই শিল্পপতি অথবা সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তৃপক্ষের না। এ যেন বেকারদের নিয়ে স্বাধীন দেশে এক ধরনের উপহাস-!

একটি তথ্যে দেখা যায়, দেশে এখন সরকারি চাকুরিজীবীর সংখ্যা ষোল লাখ। এদের সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে আছে। নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতির আলোকেই তারা চাকুরি করেন। কিন্তু এর বাইরে লাখ লাখ বেসরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বাস্তবে কি কোন নীতিমালা আছে? তাদের কর্মঘন্টা কত. পরিশ্রম অনুযায়ী বেতন কত. অবসরের পর তাদের আর্থিক নিরাপত্তা কি-? মৌলিক এই সমস্যাগুলো যে সমাধান করা যায়না তাতো নয়। কিন্তু কেন তা করা হয়না-?
বড় বড় শিল্প গ্রুপ, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সুসম্পর্কের কারনেই বোধ করি পার্লামেন্টে এ ব্যাপারে সঠিক একটি নীতিমালা তৈরির জন্য কেউ কোন কথা বলেননা। যখনই বেকার তরুণদের সাথে কথা বলবেন তখনই তারা হতাশার সুরেই এ ধরনের জবাব দেবেন। যারা বেসরকারি চাকুরিজীবী তাদের মধ্যে মুষ্টিমেয় ভাল দু’একটি কোম্পানী বাদে সকলেই তাদের অমানসিক পরিশ্রমের বিপরীতে বেতনের হতাশাজনক অংকই প্রকাশ করেন। এর উপর যখন-তখন ছাঁটাইয়ের বিষয়টি তো আছেই।

যন্ত্রনাময় এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি সেক্টরে চাকুরির যুক্তিসঙ্গত বেতন কাঠামো প্রনয়ন, নিয়মনীতি. কর্মসময় নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে সম্মানীত সংসদ সদস্যদের ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ শ্রমের অপচয়ে অনেক মেধাবির মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে। চাকুরিদাতা ও প্রার্থীর মধ্যে যুক্তিসঙ্গত নিয়মনীতি প্রনয়ন ও তা কার্যকর করা অসম্ভব কিছু নয়। সরকার উদ্যোগ নিলে হয়না এমন কিছু নেই।
সুতরাং আমরা আর বেকারদের নিয়ে রসিকতা দেখতে চাইনা। বেতন যা দিবেন তা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করুন। চাকুরিপ্রার্থী মনে করলে আবেদন করবেন, বেতন পছন্দ না হলে করবেননা। কিন্তু দয়া করে ‘বেতন আলোচনা সাপেক্ষ’ আর লিখবেন না। আপনি শিল্পপতি. গ্রুপের মালিক. ধনাঢ্য তাতে আমাদের কোন ঈর্ষা নেই। কিন্তু বেকাররাও এদেশের নাগরিক, দেশের ভবিষ্যত। এটুকু অন্তত: মূল্য দেয়ার চেষ্টা করুণ। (লেখকঃ সিনিয়র সংবাদকর্মী, সাবেক ছাত্রনেতা: জেলা-পাবনা)। ১১.৬.২১ঃ মোবাইল: ০১৭১১-৩১৭৯৩৮