প্রধান সূচি

ছোট গল্প বৈশাখী মেলা

ফিরোজা পারভীন
শহরের পরিবেশে থাকতে থাকতে মজিদ সাহেবের ছোট ছেলেটা অস্থির হয়ে উঠেছে। করোনা কালীন সময়ে তার অনেক বন্ধুই গ্রামে বেড়াতে গেছে। তাদের সাথে সবুজ গ্রাম, গ্রামের পরিবেশ,প্রকৃতি সম্পর্কে মাঝে মাঝেই শান্ত’র কথা হয়। তাই আজ তার ছোট্ট মনে অনেক প্রশ্ন। বিকেলে মায়ের কাছে গ্রামের অনেক গল্প শুনেছে। বৈশাখী মেলার গল্প শুনেছে। শহরে, গ্রামে বৈশাখী মেলায় বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান হয়। এবার শান্ত গ্রামের বৈশাখী মেলায় যেতে চায়।
সন্ধ্যায় মজিদ সাহেব বাড়ি ফিরলে শান্ত বাবাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। মজিদ সাহেব তার ব্যস্ততার কথা জানালেও শান্ত বায়না করতেই থাকে। শান্তকে বোঝাতে গিয়ে এক পর্যায়ে মজিদ সাহেবের মনেও অনেক পুরোনো স্মৃতি ভেসে ওঠে। দীর্ঘ দিন খোলা সবুজ মাঠে নিঃশ্বাস নেওয়া হয়নি পরিবারের সবারই। বড়রাও ভেতরে ভেতরে হাঁপিয়ে উঠেছে। কিন্তু কর্মব্যস্ততায় সময় হয়ে ওঠেনি। করোনার বিধিনিষেধ এখন কিছুটা কমে এসেছে। তাই সবাই মিলে ঠিক করল সামনের শুক্রবার গ্রামে বৈশাখী মেলা দেখতে যাবে। যাবে। সপ্তাহ দুই গ্রামে কাটিয়ে তবেই ফিরবে।
ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে মজিদ সাহেব সপরিবারে রওনা হলেন তার গ্রামের পথে। প্রায় চার ঘণ্টা পর গ্রামে পৌছিলেন। পরিবারের সবাই মিলে অনেক দিন পর গ্রামে যাচ্ছেন। যতই নদী, বটগাছ, ধানক্ষেত দেখছেন ততই যেন পুরোনো সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। শান্ত’র কাছে প্রায় সবই নতুন লাগছে। শেষবার অনেক ছোটবেলায় এসেছিল। তাই তেমন কিছু মনে নেই তার।
গ্রামে গিয়ে দাদা-দাদি, চাঁচা-চাঁচি, চাচাতো ভাই-বোনদের দেখে শান্ত ভীষণ খুশি। এরপর চলে গ্রাম ঘুরে দেখা, গল্প আর খাওয়া দাওয়া। প্রতিদিন ওরা নদীতে গোসল করে, বিকেলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। রাতে উঠোনে সবাই গোল হয়ে বসে গল্প করে। দেখতে দেখতে বৈশাখী মেলার দিন চলে এলো।
নদীর পাড়ের বড় বট গাছটার নিচে মেলা বসেছে। মেলায় বিভিন্ন রকমের জিনিস পাওয়া যায়। হাত পাখা, মাটির পুতুল, সখের হাঁড়ি, রঙিন ঘুড়ি, বাঁশের তৈরি বিভিন্ন খেলনা ও ব্যবহারের জিনিষ পত্র। খাবারের মধ্যে রয়েছে জিলাপি, খুরমা, খাগরাই, চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া, ডাব, বেলের শরবতসহ আরও অনেক কিছু। নতুন বছরের প্রথম দিনে নতুন জামা পরে পান্তা ইলিশ খেয়ে ওরা মেলায় গেল।
রঙিন ঘুড়ি শান্ত’র অনেক পছন্দ হয়েছে। মেলায় লাইট লাগানো ঘুড়িও পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো রাতের আকাশে ওড়ালে আলো জ্বলে। মহাকাশের শত সহশ্র নক্ষত্র যেমন রাতের আকাশকে আলোকিত কওে তেমনি এই ঘুড়ি গুলোকেও এক একটি নক্ষত্র মনে হয়। শান্ত কিছু মাটির পুতুল কিনেছে- বর কনে, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ ও কিনেছে। পুতুলগুলো ওর বেশ পছন্দ হয়েছে। এরপর ওরা গরম গরম জিলাপি খেল। মেলায় এত ভিড়ের মধ্যে গরম গরম জিলাপি খাওয়ার মজাই আলাদা। শান্তরা সবাই মিলে নাগরদোলায় উঠল। নাগরদোলা ভীষণ মজার! কেউবা ভয়ে চিৎকার করে, কেউবা হাসতে হাসতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম শান্ত’র প্রথমে একটু ভয় ভয় করছিল। কিন্তু একটু পরেই তা ঠিক হয়ে গেল। মজিদ সাহেবের অনেক বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে মেলায়। সবার সাথে দেখা হওয়ায় মজিদ সাহেব ভীষণ খুশি। এরপর ওরা মেলা থেকে বাড়ির বাকিদের জন্য কিছু জিনিস কিনল। শান্ত ওর মায়ের জন্য একটা হাতপাখা কিনেছে-তালপাতার সাথে নকশা করে কাপড় লাগানো।
মেলাতে তো অনেক ধরনের পাখা পাওয়া যায়। মাটির তৈরি রিকশা, টমটম, মাটির চাকা লাগানো গাড়ির টপ টপ শব্দে এগিয়ে যাওয়া দেখে শান্ত যতটা না অবাক হয়েছে তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছে পুতুলের জন্য তৈরি করা ছোট ছোট জামা কাপড় দেখে। মানুষ দা, বটি, ছুড়ি, কাচি বানিয়ে বিক্রি করছে। কাঠের ফুলদানি, ডাল ঘুটনী, আম কাটা বাঁকা চাকু, ছোট ছোট চেয়ার টেবিল, খেলনা, শখের হাড়ি দেখে শান্ত বেশ অবাকই হয়।
মেলার একপাশে চোখে পরে চুড়ি-মালাসহ মেয়েদের সাজ সরঞ্জামের দোকানপাট। একটু এগিয়ে যেতেই দেখে অনেকেই তালের রস খাচ্ছে। শান্ত স্কুলে যাওয়ার পথে দু একটা তাল গাছ দেখেছে, তালের পিঠা খেয়েছে। কিন্তু তাল গাছের ফুলের লাঠি থেকে কিভাবে মিষ্টি রস বের হয় এখন তার সেটা জানতে আগ্রহ হয়। ওরা তালের রস খায়। ফিরে আসবে এমন সময় চোখ পরে অনেকগুলো ছেলেমেয়ের ওপর। এগিয়ে গিয়ে দেখে ওরা একজন একজন করে বন্দুক নিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা বেলুন ফোটাচ্ছে। ঠিক মতো লাগাতে পারলেই হই চই বেধে যাচ্ছে। এই খেলাটা শান্তর পছন্দ হয়েছে। ওদের হাতে সময় কম। তাছাড়া অনেকক্ষণ হলো এসেছে। গরমে বেশ ঘেমে গেছে, সেদিকে যেন খেয়ালই নেই কারো। শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন। অগত্যা মজিদ সাহেব তাকে বন্দুক দিয়ে বেলুন ফোটাতে সাহায্য করলেন। অবশেষে তারা মেলা আঙ্গিনা থেকে বেড়িয়ে পরল। যেতে যেতে দেখে ঘোড়ার পিঠে বসা একজন লোকের হাতে অনেকগুলো চাকতি ফুল। বিভিন্ন রং দিয়ে সাজানো ফুলগুলো বাতাসে খুব জোড়ে ঘুরছে। মোটা শোলা এবং তালপাতার তৈরি পেঁচা, ফেচকে পাখি ক্যাজব্যাজ করে ডাকছে। বাচ্চাদের ঝুনঝুনিও বাজছে। কলসের মতো বড় মাপের কাগজ ফুল বাতাসে দুলছে।
মেলা থেকে ফিরে গোসল করে বিশ্রাম নিলো ওরা। কিন্তু শান্ত’র মনের মধ্যে শুধু মেলা আর মেলা। রাতে তার ভালো ঘুম হলো না। সকাল হতেই কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে পড়ল। যাচ্ছে আর বার বার পেছনে তাকাচ্ছে, তাকে বাড়ির কেউ দেখছে কি না ? একসময় শান্ত মেলার জায়গাটাতে পৌঁছে গেল। কিন্তু সেখানে কোনো দোকানপাট দেখতে পেল না। অবাক কান্ড! দোকানগুলো তো এখানেই ছিল। বট গাছটার পেছন দিকে গিয়ে দেখল কিছু ছেলেমেয়ে কি যেন কুড়াচ্ছে। শান্ত এগিয়ে গেল তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তোমরা এখানে কি করছো?” একটা মেয়ে বলল, “কাল বেশ রাতে মেলা শেষ হয়েছে। আজ আর মেলা হবে না। কাল রাতে আকাশে অনেক মেঘ ছিল। রাতে যাওয়ার সময় অনেকেই অনেক কিছু ভুল করে ফেলে গেছে। তাছাড়া প্রতি বছর মেলার পরের ভোর বেলা আমরা বিভিন্ন জিনিস কুড়াতে আসি। তুমিও এসো আমাদের সাথে।” এক পা-দু পা করে এগিয়ে শান্ত মিশে গেল গ্রামের ঐ ছেলে মেয়ে দের সাথে।

লেখিকা-

প্রভাষক, চরনবীন হামিদা মমতাজ টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ

ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান,

চাটমোহর উপজেলা পরিষদ।