প্রধান সূচি

বগুড়ায় সৎ বাবা শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিল শিশু সামিউলকে

বগুড়া: বগুড়ার শাজাহানপুরে সৎ বাবার হাতেই খুন হয় ১০ বছর বয়সী মাদ্রাসা ছাত্র সামিউল ইসলাম সাব্বির। স্ত্রীর দেওয়া তালাকের প্রতিশোধ নিতেই শিশু সামিউলের গলায় সুতার রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার ৬ ঘন্টার মাঝেই হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে বগুড়া জেলা পুলিশ।
এই ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে শাজাহানপুর থানা পুলিশ অভিযুক্ত সৎ বাবা ফজলুল হক ও তার সহযোগী অনিতা রানী (৩৫) কে গ্রেফতার করেছে। ফজলুল খরনা ইউনিয়নের কমলাচাপড় এবং অনিতা চেলোগ্রামের বাসিন্দা। তারা একসাথে দিনমজুরের কাজ করতেন।
বুধবার সকালে বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বিপিএম। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, নিহত সামিউল সাজাপুর পূর্বপাড়া তালিমুল কুরআন হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আসামী ফজলুল শিশু সামিউলের মাদ্রাসার যায়। ফজলুল প্রায়ই মাদ্রাসায় এসে সামিউলের খোঁজ খবর নিতেন। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষক আবু মুছাকে জানান সামিউলকে নিয়ে যাবেন। তবে মাদ্রাসার নিয়ম অনুযায়ী মায়ের অনুমতি ছাড়া ছাত্রদের কারো কাছে ছেড়ে দেওয়া নিষেধ থাকায় মাদ্রাসার শিক্ষক অসম্মতি জানান। এসময় ফজলুল তার পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী অনিতা রানীকে শিশু সামিউলের মা পরিচয় দিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলিয়ে দেয়। এরপর সামিউলকে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে ফজলুল শাজাহানপুরের মানিকদিপা লাউ ক্ষেতে নিয়ে যায় ও সেখানে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
পুলিশ সুপার আরও জানায়, এর আগে সামিউলের মা সালেহা বেগম তারা বাবা জাহাঙ্গীর কে তালাক দিয়ে শাজাহানপুরে খরনা ইউনিয়নের ফজলুল হক কে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকেই সৎ বাবা ফজলুল সামিউলকে মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি প্রায়ই শিশুটিকে সালেহার মা ও বোনের কাছে রেখে আসার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। এমনকি  ফজলুল হক রাতের বেলাই সামিউলকে ঘরের বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিতেন এবং খাবার না দিয়ে তাকে অনাহারে রাখতেন। এর আগে ঈদে সামিউল তার মায়ের সাথে বেড়াতে যেতে চাইলে ফজলুল তাদের মারধর করে সালেহার বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। সালেহা তার সন্তানের কষ্ট দেখে মে মাসের ১১ তারিখে ফজলুলকে তালাক দেয়। ঈদের পর ১৪ই মে মাদ্রাসায় পুনরায় পাঠদান শুরু হলে সালেহা শিশু সামিউলকে সেখানে রেখে আসেন। তবে সৎ সন্তানের জন্য স্ত্রী তালাক দেওয়ায় ফজলুল ক্ষোভে সামিউলকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং তা ঘটায়।
এদিকে উক্ত ঘটনার সংবাদ প্রাপ্তির ৬ ঘন্টার মাঝেই জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী ও শরাফত ইসলামের তত্ত্বাবধানে এবং শাজাহানপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে জড়িতদের বগুড়া জেলা পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও হত্যার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এসপি সুদীপ চক্রবত্তীর্ জানান, ফজলুল একাই শিশু সামিউলকে হত্যা করেছে। আর গ্রেফতারকৃত অনিতা ফজলুলকে হত্যাকান্ডে সহযোগিতা করায় তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও তিনি বলেন, শাহাজানপুরের সৎ বাবার হাতে ১০ বছরের এই শিশুর নৃশংস হত্যা সত্যিই সকলকে ব্যথিত করেছে। শিশু নির্যাতনের এমন চিত্র এখনো তৃণমূল থেকে শহরাঞ্চলের অনেক স্থানেই দেখা যায় তবে সংসার বাঁচানোর তাগিদে কেউ মুখ খোলেনা। তিনি বগুড়ার সর্বস্তরের মানুষকে উদ্বার্ত আহ্বান জানিয়েছেন কোথাও কোন শিশু নির্যাতন বা অপরাধের খবর পেলে পুলিশকে জানাতে। বগুড়ায় যেন আর কোন শিশুর এমন অকালে প্রাণ না যায় সেই বিষয়ে সকলকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এসপি সুদীপ। আর এক্ষেত্রে জেলা পুলিশ সর্বদা সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে মর্মে অঙ্গিকার করেন তিনি। এর আগে (১৭ মে) মঙ্গলবার সকালে শাজাহানপুর উপজেলার মানিকদ্বিপা উত্তরপাড়া বটতলা গ্রামের একটি সবজির ক্ষেত থেকে সামিউলের লাশ উদ্ধার করা হয়।