প্রধান সূচি

গুমানী নদীর নিরব ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি-আবাদি জমি-সামাজিক প্রতিষ্ঠান

ইকবাল কবীর রনজু, পাবনা
পাবনার চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা, হান্ডিয়াল, নিমাইচড়া ও বিলচলন ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গুমানী নদীর নিরব ভাঙনে বিলীন হচ্ছে শত শত মানুষের বসত ভিটা। কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঈদগাহ মাঠসহ অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বিলীন হচ্ছে গুমানী নদী গর্ভে। বছরের পর বছর ভাঙন অব্যাহত থাকায় বসত ভিটা হারিয়ে হারিয়ে অনেকেই অন্যত্র গিয়ে নতুন বাড়ি ঘর নির্মাণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অভাবী মানুষেরা ভিটে মাটি হারিয়ে পরেন চরম বেকায়দায়। ভাঙন কবলিত এলাকা গুলোতে খুব ধীর গতিতে বছরে ৫ থেকে ৭ ফিট করে ভাঙতে ভাঙতে একসময় জমি অথবা বসত বাড়ির সবটুকু চলে যায় নদী গর্ভে। বর্ষাকালে ধীর গতিতে ভাঙন হওয়ায় তা চোখে পরে না কারো। এ এলাকার নদী ভাঙন রোধে ছাইকোলা পয়েন্টে আনুমানিক ৫০০ মিটার নদী পাড় ব্লক দিয়ে সংরক্ষণ করলেও ভাঙন কবলিত বাঁকি প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকার ভাঙন রোধে কখনও কাউকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল হামিদ রচিত চলনবিলের ইতিকথা গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, জলপাইগুড়ির পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া আত্রাই ও গুর নদী রাজশাহীতে এসে কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পরে। এর একটি শাখা কয়রাবাড়ি, নন্দনালী, ও আত্রাই হয়ে আত্রাই ঘাটের এক মাইল নি¤œ হতে “গুড়” নামে সিংড়া, একান্ন বিঘা,যোগেন্দ্রনগর ও কালাকান্দরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁচকৈড় ত্রীমোহনায় নন্দ কুজার সাথে মিশেছে। এদের মিলিত ¯্রােত গুমানী নামে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে চাটমোহরের মথুরাপুর এলাকায় এসে বড়াল নদীর সাথে মিশে ভাটিতে গিয়ে যমুনায় পরেছে।
বিলচলন ইউনিয়নের নটাবাড়িয়া গ্রামের স্কুল শিক্ষক মোকতার হোসেন জানান, নটাবাড়িয়া গ্রামের নদী সংলগ্ন প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নিরব ভাঙন চলে আসছে। গত ২০ থেকে পঁচিশ বছরে নটাবাড়িয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অনেক বসত ভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। কিছু আবাদী জমিও গ্রাস করেছে গুমানী নদী। করকোলা গ্রামের সাগর মাহমুদ জানান, বওশা ব্রীজ থেকে ভাটির দিকে প্রায় ৫শ মিটার এলাকা ভাঙন কবলিত। রাস্তা ভেঙে বিলীন হচ্ছে গুমানী নদী গর্ভে। ইতিমধ্যে করকোলা কবরস্থান এবং ঈদগাহ মাঠও নদীতে বিলীন হয়েছে। গ্রামের মানুষ চাঁদা হারি তুলে জায়গা কিনে নতুন কবরস্থান তৈরী করেছেন। চরসেন গ্রামের রাকিব হোসেন জানান, এ গ্রামের প্রায় ৫শ মিটার এলাকা ভাঙন কবলিত। গত বিশ বছরে ভাঙন কবলিত অংশের প্রায় ৫০ পরিবার অন্যত্র বাড়ি ঘর নির্মাণ করেছেন। বেশ কিছু আবাদী জমি ও গ্রাস করেছে গুমানী নদী। বিন্যাবাড়ি গ্রামের রফিকুল ইসলাম জানান, বিন্যাবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু বাড়ি ঘর গুমানী নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। ধানকুনিয়া হাট, ধানকুনিয়া কবরস্থানসহ অনেক মানুষের বসত ভিটা কালক্রমে গুমানী নদী গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। বরদানগর গ্রামের রতন হোসেন জানান, বরদানগর বাজার ও ঈদমাঠ ক্রমশই নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে। এ গ্রামের প্রায় শতাধিক বসত ভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। এছাড়া গৌড়নগর, লাঙ্গল মোড়া, চরনবীন, কুকরাগাড়ীসহ নদীপাড়ের বেশ কিছু গ্রামের মানুষের বসত ভিটা ও আবাদী জমি নদীতে ভেঙে গেছে। ছাইকোলা ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক হাসিনুর রহমান জানান, ছাইকোলা পয়েন্টে কিছু এলাকা ব্লক দিয়ে সংরক্ষণ করা হলেও অন্য কোথাও সংরক্ষণে পদক্ষেপ না নেওয়ায় দীর্ঘ দিনে চাটমোহরের গুমানী পাড়ের শত সহ¯্র মানুষের বসত বাড়ি চলে গেছে নদীর পেটে। চাটমোহর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাষক ফিরোজা পারভীন জানান, চাটমোহর অংশে গুমানীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। এ ১২ কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও এপার আবার কোথাও অন্য পাড় ভাঙছে। কোন কোন অংশে নদী পাড়ে চর জাগছে। রাস্তা, বাড়ির, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জায়গা নদীতে বিলীন হওয়ায় এ এলাকার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভাঙন কবলিত এলাকা চিহ্নিত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে ভাঙন রোধ করা যেতে পারে।
এ ব্যাপারে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সৈকত ইসলাম জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনে এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের অবহিত করব।