প্রধান সূচি

শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম

পড় তোমার প্রভুর নামে। পবিত্র আল-কোরআনের প্রথম নাজিল করা বাণী নামাজ কায়েমের কথা নয়, জাকাত আদায়ের তাগিদ নয়, ইমান আনার নির্দেশ নয়, সিয়াম সাধনার বাণী নয়, হজব্রত পালনের উক্তি নয়, পর্দার হুকুম নয়, জিহাদের ঘোষণা নয়, তাকওয়া অর্জনের উপদেশ নয়, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধও নয়। ইসলামের জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রথমে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল- কোরআন যেখানে জ্ঞান অর্জনের চর্চার কথা বলা হয়েছে, সেখানে দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করা যায় পৃথিবীতে সবচেয়ে কম লেখাপড়া করে আজ মুসলমানরা। কোরআন ও হাদিস অধ্যয়ন থেকে আমরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছি। কেন মুসলমানরা জ্ঞান অর্জন করে না, তা আমাদের ভাবতে হবে। ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। সব মানুষের সঙ্গে সুখ, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কায়েম হোক সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশে। শোষণ ও নির্যাতন চিরতরে দূরীভূত হোক- এটা ইসলামের শিক্ষা।

আজ সারা বিশ্বে একতরফাভাবে মিথ্যা অপবাদ ও গালি দেওয়া হচ্ছে ফাঁদ পেতে বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে দেখা বা সাক্ষাৎ হলে প্রথমেই শুভেচ্ছা বিনিময় করেন সালামের মাধ্যমে অর্থাৎ একে অপরের শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করে। মোয়াজ্জিনের সুমধুর, সুললিত লালিত্যময়, জলদ গম্ভীর আজানের ধ্বনি শুনে মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার পর তা শেষ করে ডানে ও বামে সালাম (শান্তি) প্রতিষ্ঠা ঘোষণার মাধ্যমে। মোনাজাতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে প্রথমে দুনিয়া ও পরে আখিরাতের মুক্তির মাধ্যমে। শুধু জীবিত মানুষদেরই জন্য নয়, মৃত ব্যক্তিদের জন্য কবরস্থান জিয়ারত করতে গিয়েও মৃত ব্যক্তিদের প্রথমে সালাম দেওয়া হয়। কি গভীর শিক্ষা ইসলামের।

মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিষ্ঠা করাই হলো ইমানদার বা নবী (সা.)-এর অনুসারীদের পবিত্র কাজ। মানুষ কেন নিজেকে ধ্বংস করবে, সমাজের ক্ষতি করবে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে। মানুষের জন্মের পূর্ব থেকেই পিতাণ্ডমাতাই আর্থিক ব্যয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য তার ওপর বর্তায়। এই ঋণ তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শোধ করতে হবে। নিজেকে ধ্বংস করে নয়। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদর। ১,০০০ জন সশস্ত্র যোদ্ধার বিপক্ষে অস্ত্রহীন, ক্ষুধা ও দরিদ্রতায় জর্জরিত রোজাদার মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি, যাকে অসম যুদ্ধ বলা যায়। মক্কা থেকে কোরাইশরা তথা ইসলামবিরোধী শক্তি ৩২০ কিমি উত্তরে যুদ্ধ করার জন্য বদর প্রান্তরে আর অন্যদিকে মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে মদিনা থেকে ১২২ কিমি দক্ষিণে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করার জন্য বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয়। আবু জেহেলের বাহিনী ইসলামি শক্তিকে নির্মূল করার জন্য বেশি পথ অতিক্রম করে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলাম কাউকে প্রথমে আঘাত করে না, প্রত্যাঘাত করে, বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ করে। বদরের রাত এক সাহাবি রেকি করছেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান ও গতিবিধি জানার জন্য, এটা যুদ্ধের কৌশল। সেই সাহাবি ফিরে এসে মহানবী (সা.)-কে বলছেন, ‘হুজুর (সা.), আমি আবু জেহেলকে একা এবং সঙ্গী ছাড়া ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছিলাম। কিন্তু ইস্! কেন যে তাকে হত্যা করলাম না। এই সুযোগ আর হয়তো জীবনে পাবো না। নবী (সা.) বলেন, তুমি যদি নিরস্ত্র, একাকী ঘুমন্ত আবু জেহেলকে হত্যা করতে, তাহলে তুমি জাহান্নামী হতে। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলাম কখনো চোরাগুপ্তা, আকস্মিক, পেছন থেকে কাপুরোচিত হত্যা পছন্দ করে না। তাহলে কার স্বার্থে পৃথিবীতে জিহাদের নামে সন্ত্রাস হচ্ছে। সেটা আমাদের ভাবতে হবে। ইসলামকে পরোক্ষভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে। বিদেশি এক সাংবাদিক কথার ফাঁদে বা জালে জোড়ানোর জন্য আমেরিকার এক মুসলমানকে প্রশ্ন করেন, লাদেন কি মুসলমান? আমেরিকান বললেন, হ্যাঁ। দ্বিতীয় প্রশ্ন, লাদেন তো সন্ত্রাসী, তাহলে আপনার উত্তরমতে, মুসলমানরা সন্ত্রাসী।

৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় ছিল সমগ্র আরব বিজয়ের সমতুল্য। পৃথিবীতে কোনো দেশ বিনা রক্তপাতে জয় হয়নি। সিজার, আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ানের দেশজয়, নিরীহ জনসাধারণের সঙ্গে রক্তপাতের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কিন্তু নবী (সা.) বিনা প্রতিবন্ধকতায় বা বিনা বাধায় মক্কা বিজয় করেন। মক্কার দক্ষিণ ফটকে কিছু কোরাইশ বিক্ষিপ্তভাবে বাধা দিলে ২৩-২৪ জন কোরাইশ নিহত হন এবং মুসলমানদের পক্ষে বানু খোজা গোত্রের দুই ব্যক্তি প্রাণ হারায়। মক্কা বিজয়ের আগে মহানবী (সা.) কয়েক শ্রেণির লোককে নিরাপত্তার ঘোষণা দেন। মক্কা বিজয় কোনোপ্রকার লুটতরাজ, গৃহ লুণ্ঠিত, শ্লীলতাহানি, অত্যাচার, নিপীড়ন বা নির্যাতন হয়নি। মানবতার নবী (সা.)-এর মহানুভবতা সত্যি প্রশংসনীয়। Plain Muth Statistics (১৯৩৪-৮৪)-এর সূত্র মতে, ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে মুসলমান বৃদ্ধির হার ২৩৫ শতাংশ আর খ্রিস্টান বৃদ্ধির হার মাত্র ৪৭ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে পাঠকরা কি বলতে পারবেন পৃথিবীতে কোথাও ধর্মীয় যুদ্ধ হয়েছে।

১৪০০ বছর ধরে আরব বিশ্বে এবং প্রায় ১০০০ বছর ভারতে মুসলমানরা শাসন করেছে। পরে আরবে ব্রিটিশ ও ফ্রান্সরা আগমন করে। আরব বিশ্বে বংশ পরম্পরায় দেড় কোটি কপটিক খ্রিস্টান কি বলতে পারবেন, মুসলমানরা সন্ত্রাসী। ভারতে ৮০ শতাংশ অমুসলমানরা সাক্ষী দেয় মুসলমানরা তরবারি দিয়ে তাদের ধর্ম প্রচার করেননি বা তাদের ওপর আক্রমণ করেননি। ভারতের বৃক্ষ, পাতা, পল্লব, দেওয়ানি খাস, আম ও তাজমহল বানিয়ে ভারতকে মুসলমানরা সাজিয়েছে। মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধীর হত্যার সঙ্গে মুসলমানরা জড়িত নয়। জেরুজালেমকে নিয়ে মুসলিম মহাবীর সালাউদ্দিন আইয়ুবির সঙ্গে ফ্রান্সের সৈন্য বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে কয়েকবার। যাকে ক্রুসেড বলে। মুসলমানরা সবশেষে জিতলেও প্রতিপক্ষের সঙ্গে কোনো অমানবিক আচরণ করেননি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বালাফোরের সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পর ইসলামবিরোধী শক্তি ১৯৭৯ সালে ইরানের সফল অভ্যুত্থানের পর ইরাক দিয়ে ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধ বাধিয়ে দীর্ঘদিনের গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেন। ইসলামি দেশগুলোকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা আর অন্যদিকে তলে তলে অস্ত্র বিক্রি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেল সম্পদ হস্তগত করার জন্য অনেক কূটকৌশল কাজে লাগিয়েছে। সারা বিশ্বে আজ সন্ত্রাসী হামলার বিস্তার ঘটছে। আফ্রিকা মহাদেশের ২৯টি দেশে যুদ্ধ, ২৬৭টি বিদ্রোহী দল নানা দাবিতে লড়াই করছে। ইউরোপের ১০টি দেশে ৮০টি বেসামরিক বাহিনী আছে। এশিয়ার ১৬টি দেশে সক্রিয় ১৬৪ বিদ্রোহী বেসামরিক দল। জানুয়ারি ১৬ থেকে জুন ১৬ এ সময়ের মধ্যে ৬৭১টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে পৃথিবীতে। ইরাকে এক দিনে ২৬০ জন লোকের শির- েদ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও পহেলা জুলাই ১৬ হোটেল আর্টিজনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। মানুষ হত্যার পরিমাণ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে কেউ জীবনের বদলে জীবন অথবা অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করে। আর যে, ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সব মানুষের জীবন রক্ষা করে।’ মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার হাতে আমার জীবন তার শপথ করে বলছি একজন মুমিনকে হত্যা করা অবশ্যই আল্লাহর নিকট দুনিয়া লয় হয়ে যাওয়ার চাইতেও অধিক ভয়ংকর।’ নবী (সা.) মক্কা বিজয়ের আগের রাত্রে নিরস্ত্র অবস্থায় ধরা পড়ার পরেও শীর্ষ কাফের নেতা আবু সুফিয়ানকে হত্যা করেননি। বরং তিনি তাকে মুসলিম হওয়ার সুযোগ

দেন। মক্কা বিজয়ের পরের দিন প্রদত্ত ভাষণে তিনি সব কাফের-মুশরিকক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং রক্তপাতকে স্থায়ীভাবে হারাম করে দেন। ফলে সবাই ইসলাম কবুল করে ধন্য হন।

আজ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের পাশাপাশি, নারীর মর্যাদা, মানবিকতা, সহমর্মিতা, দানশীলতা, পরার্থপরতা, ন্যায়বিচার ন্যায়প্রতিষ্ঠা, সহযোগিতা, দাসপ্রথা উচ্ছেদ, সাদা-কালোর মৈত্রী স্থাপন করে বিদায় হজের ভাষণের বাণীগুলো কীভাবে সর্বত্র বাস্তবায়ন করা যায় তা জানাতে হবে। নবী, সাহাবি, খলিফাদের, ইসলামি মনীষী বা শাসকদের জীবনে ঘটে যাওয়া এ রকম শত শত ইতিহাস আমাদের লেখনীর মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে। মানুষ হত্যার মোহে যারা নিমজ্জিত এ রকম ভ্রান্ত ধারণাবাদীদের ইসলামের সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য আলেম সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সফলতা।